বাংলা থিয়েটারে অর্ধশতাব্দী পথ হাঁটল সায়ক নাট্যদল

বর্তমানে নির্দেশনার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন মেঘনাদ ভট্টাচার্য

মাজের কঙ্কালসার প্রথা নাকি আবেগ, উষ্ণতা, হৃদয়ের টানে গড়ে ওঠা সম্পর্ক যা হয়তো নামহীন তবু সম্পর্কে থাকা মানুষগুলো মনের টানে স্বীকার করে নিতে চায় একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতা। তবে সেখানেও সামাজিক নীতির প্রশ্ন এসে পড়ে। আর এই সামাজিক নীতিনিষ্ঠ সমাজের প্রতিনিধি নিরঞ্জন মাস্টারকেই পাল্টা প্রশ্নের তীরে বিদ্ধ করে গগন ড্রাইভার, ‘দায়বদ্ধ’ নাটকের মুখ্য চরিত্র। নিরুত্তর হয়ে পড়ে সমাজের অভিভাবকরা। দায়বদ্ধ নাটক-এর গগন ড্রাইভারই শুধু নয়, সমাজের অসাড় নিয়মকে বারবারই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বিভিন্ন নাটকের বিভিন্ন চরিত্র। আর নাট্যমোদী কিছু মানুষ বারবার সৃষ্টি করেন এরকম বিভিন্ন প্রশ্নমুখী চরিত্র, যারা তীরের ফলায় সমাজের সামনে তুলে আনে প্রশ্ন। ১৯৭৩ সালের ২ ডিসেম্বর, এইরকমই কিছু নাট্যপ্রাণ যুবকের প্রচেষ্টায় পথ চলা শুরু করে সায়ক। বিনোদনের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বও বর্তায় নাটকের উপর, এই সত্যিকে উপলব্ধি করে আর অদম্য উৎসাহ ও সততাকে পাথেয় করে সায়ক নাট্যদল পথ চললো পঞ্চাশ বছর।

শুরু থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত সায়ক-এর নাটককার/নির্দেশক ছিলেন প্রয়াত শিশির কুমার বসু। এরপর থেকে এখনও পর্যন্ত নির্দেশনার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন মেঘনাদ ভট্টাচার্য। আর নাটককার হিসাবে সায়কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চন্দন সেন, ইন্দ্রাশিস লাহিড়ী এবং উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়ের নাম। ইন্দ্রাশিস লাহিড়ীর অকাল প্রয়াণের পর সায়কের জন্য কলম ধরেছেন উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়। এখনও পর্যন্ত ২৮টি পূর্ণাঙ্গ, ৯টি স্বল্পদৈর্ঘ্যের নাটকের প্রায় ৩,২০০টি অভিনয় কলকাতা, জেলা, বর্হিবঙ্গে এবং একাধিকবার বিদেশেও মঞ্চস্থ করেছে সায়ক। শুধু নাট্যপ্রযোজনা নয়, নাটক সংক্রান্ত আরও নানা কাজে ব্রতী সায়ক। যেমন, বিজন থিয়েটার প্রতিষ্ঠা ও পরিচালন, সায়ক নাট্যবক্তৃতামালা, শিশির কুমার বসু ও দীপঙ্কর সেনগুপ্ত স্মৃতি সম্মান, নির্বাচিত পূর্ণাঙ্গ বাংলা নাটকের নিয়মিত উৎসব, ছোটোদের জন্য প্রযোজনাভিত্তিক নাট্যপ্রশিক্ষণ শিবির ইত্যাদি‌।

পঞ্চাশ বছরের পথচলাটা কেমন ছিল? এই প্রসঙ্গে সায়কের নির্দেশক মেঘনাদ ভট্টাচার্য বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “পঞ্চাশ বছরের থিয়েটারের জার্নিটা সবসময় সুষম ছিল না, প্রচণ্ড লড়াই, কারণ থিয়েটার এমন একজন প্রেমিকা তার বিরাট চাহিদা। একবার থিয়েটার তৈরি হলে চলবে না, প্রতিদিন তার রসদ জোগাতে হবে। তবে আমাদের পয়সা নেই, তাই লড়াইটা সারাক্ষণ। মাঝেমধ্যে কিছু কিছু প্রযোজনা খুব সফল হয়, প্রচুর অর্থ আসে। তখন কিছুটা জীবনীশক্তি পাই। ‘দায়বদ্ধ’, ‘বাসভূমি’, ‘কর্ণাবতী’ প্রভৃতি নাটক ভীষণ মঞ্চসফল হয়েছে, আয়ও হয়েছে অনেক। সেই অতিরিক্ত অর্থ আমি থিয়েটারে ব্যয় করেছি‌। তখন শুরু করেছি সায়ক নাট্যপত্র প্রকাশ, সায়ক নাট্যপত্রিকা মেলা, শিশির বসু সম্মান, ব্যাক স্টেজ আর্টিস্টদের জন্য কাজ প্রভৃতি আমরা থিয়েটারের পয়সায় করেছি।”

মেঘনাদবাবু জানান, ছোটোদের থিয়েটার-এ আয় নেই, ব্যয় আছে। এই ব্যয়গুলো তাঁরা করেছেন থিয়েটারকে ভালোবেসে। “কিছু প্রযোজনা ভীষণ সফল হয়েছে, কিছু হয়নি। কিন্তু আমরা নাটক জমানোর জন্য থিয়েটার করি না, থিয়েটার করতে ভালো লাগে বলে থিয়েটার করি না, থিয়েটার করলে ভালো থাকি বলে থিয়েটার করি। থিয়েটারের মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকি। কারণ থিয়েটার করার আগের আমি আর থিয়েটার করার পরের আমি এক না”, জানান মেঘনাদবাবু। সায়কের অন্যান্য অভিনেতা সদস্যদের মতে, যে নাটকটা করলেন, তার দর্শনগত দিক, তার সদর্থক চিন্তা তাঁদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়‌। মানুষ হিসাবে একধাপ এগিয়ে যান, কারণ তাঁদের নাটক দেখার আগের দর্শক একরকম, নাটকটা দেখার পর দর্শক আরেক রকম। সেইভাবেই বিষয়বস্তু নির্বাচন করে সায়ক নাট্যদল। এইভাবেই পঞ্চাশ বছর ধরে কলকাতায়, জেলায়, দেশের সব শহর আর বিদেশেও ৫৩টা অভিনয় করেছে। মেঘনাদবাবু বলেন, “এতগুলো বছর কাজ করছি কারণ আমরা সৎ ছিলাম, কখনও কোনো লোভ প্রলোভনে পা দিইনি। সাফল্যও আমাদের মাথা বিগড়ে দিতে পারেনি। থিয়েটার পঞ্চাশ বছর করলাম, আজকে থিয়েটারের লোকেদের যে ভালোবাসা পেয়েছি, সিনিয়রদের যে ভালোবাসা পেয়েছি এবং দর্শককুলের যে ভালোবাসা পেয়েছি তা তো থিয়েটার না করলে পেতাম না, তাই বলবো থিয়েটারের জয় হোক।”

২০২৩ সালে শুধু কলকাতা নয় বাঁকুড়া, হরিপাল, নৈহাটি, কোচবিহারেও সায়ক সুবর্ণ জয়ন্তী নাট্য উৎসব পালিত হয়েছে। রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, মনোজ মিত্র, বিভাস চক্রবর্তী, অশোক মুখোপাধ্যায়, দীপন রায় প্রমুখ বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্বদের সম্মাননা জ্ঞাপন করা হয়েছে। সায়কের নিজস্ব প্রযোজনা ‘দায়বদ্ধ’ নাটকটি কলকাতায় শেষবারের মতো মঞ্চস্থ হয় ২ ডিসেম্বর, ২০২৩।

এখনও পর্যন্ত ২৮টি পূর্ণাঙ্গ, ৯টি স্বল্পদৈর্ঘ্যের নাটকের প্রায় ৩,২০০টি অভিনয় কলকাতা, জেলা, বর্হিবঙ্গে এবং একাধিকবার বিদেশেও মঞ্চস্থ করেছে সায়ক। এছাড়াও বিজন থিয়েটার প্রতিষ্ঠা ও পরিচালন, সায়ক নাট্যবক্তৃতামালা, নির্বাচিত পূর্ণাঙ্গ বাংলা নাটকের নিয়মিত উৎসব, ছোটোদের জন্য প্রযোজনাভিত্তিক নাট্যপ্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজনও করে তারা।

কলকাতায় এই নাট্য উৎসবে মানুষের সাড়া ছিল দেখার মতো। মেঘনাদ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, “একাডেমিতে সুবর্ণ জয়ন্তী নাট্য উৎসব করতে গিয়ে বুঝলাম থিয়েটারের দর্শক এখনও আছে। ভালো প্রযোজনার সঙ্গে থিয়েটারের দর্শকরা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।” জানা গিয়েছে, বিভিন্ন শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে তাঁরা সাহায্যও পেয়েছেন, যেমন বিক্রম দাসগুপ্ত ফাউন্ডেশন, প্রণব বিশ্বাস, লক্ষ্মীকান্ত হাজরা এঁরা সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন। আগামীবছর সায়কের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে আরও দুটি নতুন নাটক মঞ্চস্থ হতে চলেছে। তারমধ্যে একটি নাটক আগামী মার্চেই অভিনীত হওয়ার কথা।

‘সায়ক’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ তীর। আর নাটকের অদৃশ্য তীরই বারবার বিদ্ধ করে অভিনেতাদের, দর্শকদের; ভাবতে শেখায় নতুন করে। তাই বহুবছর ধরে এই ধারালো অস্ত্র কখনও ভয় পাইয়েছে অত্যাচারীকে শাসককে, কখনও তীক্ষ্ণ ফলার আঘাতে আহত করেছে সমাজের পচনশীল অংশে। বিনোদনের পাশাপাশি নাটকের এই সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব নিয়েই অর্ধশতাব্দী পথ হাঁটলো সায়ক।

Developed by DXDasia