
বিনোদিনী দাসী। বাংলা রঙ্গমঞ্চের সম্রাজ্ঞী। অমন আকাশছোঁয়া খ্যাতির পরেও বিনোদিনী ছিলেন এই সমাজের চোখে নিতান্তই ‘নষ্ট মেয়েমানুষ’। তাঁর সাধের দুয়ারে বিছানো কাঁটা কোনোদিন সরেনি। বাংলা থিয়েটারের নিঃসঙ্গ সম্রাজ্ঞী তো তিনিই। ১৯৪১ সাল পর্যন্ত যিনি বেঁচেছিলেন। রঙ্গমঞ্চ থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে গেলেও শোনা যায় একসময় স্টার থিয়েটারে প্রায়ই চলে আসতেন বিনোদিনী। অভিজ্ঞরা স্টার থিয়েটারের দারোয়ানদের বলতেন, উনি বিনোদিনী, ওঁকে কিছু বলবে না, উনি না থাকলে, স্টার থিয়েটার হত না। অথচ এই স্টার থিয়েটারই হয়ে উঠতে পারত বি থিয়েটার অর্থাৎ বিনোদিনী থিয়েটার। এসব কথা আজ সকলেই জানেন (বর্তমানে স্টার-এর নাম বদলে বিনোদিনী থিয়েটার করা হয়েছে)।
গত দেড় বছর ধরে সিনামন ও আঙ্গিক প্রযোজিত এবং অবন্তী চক্রবর্তী নির্দেশিত নাটক ‘বিনোদিনী অপেরা’ অভিনীত হচ্ছে। বিনোদিনীর জীবন শুধু নয়, বিনোদিনীর মতো পতিতাপল্লির বহু মেয়ের জাত অভিনেত্রী হবার লড়াই সমান্তরালভাবে এখানে উঠে এসেছে। তৈরি হয়েছে সমসময়ের কথন। বিনোদিনী যেন সমস্ত কাল অতিক্রম করে বহু নির্যাতিতা, অপমানিতা মেয়ের প্রতিনিধি হয়ে উঠছেন আবার, দেড়শো বছর পরেও।

গুর্মুখ রায় নামে মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের এক ধনাঢ্য যুবক গিরিশচন্দ্রের কাছে নতুন এক থিয়েটার খোলবার প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু শর্ত ছিল বিনোদিনীকে গুর্মুখের আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। সহকর্মী শিল্পীদের অনুরোধে বিনোদিনী পূর্ব রক্ষকের আশ্রয় ত্যাগ করে গুর্মুখের আশ্রয় গ্রহণ করেন। বিডন স্ট্রিটে এক পাকা নাট্যশালা তৈরি হয়, কথা ছিল বিনোদিনীর নামানুসারেই নাট্যশালার নাম হবে ‘বি থিয়েটার’৷ কিন্তু হয়নি। পতিতাপল্লির মেয়ের নামে থিয়েটারের নামকরণ করলে শহরের বাবু-ভদ্রলোকেরা নাকি দেখতে আসবেন না। অতএব নাম হল ‘স্টার’।

“তবু কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ
এখনো সে যে কোন নারী!
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখে না!”
বিনোদিনীর জীবন শুধু নয়, বিনোদিনীর মতো পতিতাপল্লির বহু মেয়ের জাত অভিনেত্রী হবার লড়াই সমান্তরালভাবে এখানে উঠে এসেছে। তৈরি হয়েছে সমসময়ের কথন।
‘বিনোদিনী অপেরা’ নাটকে এভাবেই ঘুরে ফিরে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। নাটকের গল্প বুনে বুনে চলেছে গান। হয়ে উঠেছে সার্থক অপেরা। পদ্মনাভ দাশগুপ্ত, সুজন মুখোপাধ্যায়, ইন্দুদীপা সিনহা, দোয়েল রায় নন্দী, শ্বেতা বাগচী, বিদিশা চক্রবর্তী, তথাগত চৌধুরী, অভিজিৎ গুহ, বিশ্বজিৎ দাস সকলেই বলিষ্ঠ অভিনয় করেছেন। পাশাপাশি বারবার চোখ আটকে গেছে বিনোদিনীর ভূমিকায় সুদীপ্তা চক্রবর্তীকে দেখে। কয়েকটি দৃশ্যের কথা বলতেই হয়। যেমন, কুমার বাহাদুর বিনোদিনীকে ছেড়ে পরিবারের মতে বিয়ে করতে চলে যায় আর চারদিকে উলুধ্বনির মধ্যে বিনোদিনীর হাহাকার কী অসামান্য ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সুদীপ্তা। ‘মেঘনাদবধ’ নাটকে বিনোদিনী একাই চিত্রাঙ্গদা, প্রমীলা, বারুণী, রতি, মায়া, মহামায়া ও সীতার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। দানব-বালা প্রমিলা বলছে “রাবণ শ্বশুর মম, মেঘনাদ স্বামী/ আমি কি ডরাই সখী ভিখারি রাঘবে!” দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন বিনোদিনীরূপী সুদীপ্তা। ‘ম্যাকবেথ’ নাটকের ছোট্ট একটি অংশেও তাক লাগানো অভিনয় ও শরীরী অভিব্যক্তি চোখে পড়ার মতো। সঙ্গে সেই দৃশ্যে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন ডাইনিরূপী তিন অভিনেত্রী।

মঞ্চের নৈপুণ্য এবং আখ্যানের পরিপূরক নিদর্শন হিসাবে প্রপসের ব্যবহার অত্যন্ত প্রশংসনীয়। মঞ্চসজ্জায় কাশী ভ্রমণের রূপক হিসাবে নৌকা আঁকা ট্রান্সপারেন্ট পর্দার ব্যবহার থেকে মেয়েদের পায়ে বেড়ি বোঝাতে মঞ্চজুড়ে মোটা নানা রঙের দড়ির ব্যবহার বিস্ময়কর। অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসার রূপক হিসাবে হ্যারিকেনের হাত চালাচালি অবাক করেছে। ‘বিনোদিনী অপেরা’ একটি সার্থক জীবনী নির্ভর প্রযোজনা হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু এই বাঁধাধরা ছক থেকে বেরিয়ে নির্দেশক অবন্তী চক্রবর্তী নাটকটিকে করে তুলেছেন সমসাময়িক এবং অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এখানেই নাটকটি নিছকই একটি পিরিয়ড ড্রামা হয়ে আটকে থাকেনি। হাতিবাগানের স্টার থিয়েটারের বিপরীতে এক ব্যস্ত রাস্তায় অবহেলায় পড়ে আছে নটী বিনোদিনী নামাঙ্কিত ফলক। তাতে পানের পিক। সরাসরি মঞ্চ থেকেই প্রতিবাদ ছুড়েছেন একালের বিনোদিনীরা। জোর গলায় বলা হয়েছে দেড়শো বছর পরেও কি কারোর মনে হল না, বিনোদিনীর নামে একটি থিয়েটার গড়ার কথা!
হাতিবাগানের স্টার থিয়েটারের বিপরীতে এক ব্যস্ত রাস্তায় অবহেলায় পড়ে আছে নটী বিনোদিনী নামাঙ্কিত ফলক। তাতে পানের পিক। সরাসরি মঞ্চ থেকেই প্রতিবাদ ছুড়েছেন একালের বিনোদিনীরা। জোর গলায় বলা হয়েছে দেড়শো বছর পরেও কি কারোর মনে হল না, বিনোদিনীর নামে একটি থিয়েটার গড়ার কথা!
শ্রেণি বৈষম্য ভেঙে, গণিকা পল্লি থেকে উল্কার বেগে বঙ্গ রঙ্গমঞ্চে যাঁর আবির্ভাব, সেই বিনোদিনীর বিচিত্র জীবনকথা যেন শেষ হতে চায় না। নিজের কবিতাতেই তিনি লিখে গিয়েছেন,
“তৃষিত চাতকী প্রাণ কাতর রহিল
জীবন শুকাল তবু বারি না মিলিল;
নবীন নীরদ পানে, চাহিত তৃষিত প্রাণে
এই আশা ছিল মনে বুঝি বারি পাব,
জানি না জগতে আমি এরূপে শুকাব॥”

‘বিনোদিনী অপেরা’ নাটকের অসামান্য সংগীত ও নৃত্য পরিচালনা করেছেন যথাক্রমে শুভদীপ গুহ ও রক্তিম গোস্বামী। মঞ্চসজ্জা করেছেন সঞ্চয়ন ঘোষ। আলোক নির্মাণে সুদীপ সান্যাল। সঞ্জয় পালের রূপসজ্জা এবং হেমা মুন্সির কেশসজ্জায় নাটকের চরিত্ররা প্রাণ পেয়েছে। নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন অবন্তী চক্রবর্তী। লিখেছেন শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ও অবন্তী চক্রবর্তী। দীর্ঘদিন গানের মহড়া চলেছে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান রাজ্যশ্রী ঘোষের কাছে।
বিনোদিনীর মঞ্চে ওঠা মানেই শো হাউজফুল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিনোদিনী অপেরার প্রায় প্রতিটি অভিনয়েই প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ থাকে। বিনোদিনীর মতো অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তীও হয়ে উঠুক হাউজফুলের আরেক নাম। তাঁকে থিয়েটারের মঞ্চে আরও আরও দেখতে চাই।

