
ঈশান ঘোষ পরিচালিত প্রথম ছবি ‘ঝিল্লি’-র বিষয় কলকাতার অখ্যাত বা কুখ্যাত ডাম্পিং গ্রাউন্ড ধাপা
এইসব মাঠ, ঘাট, ধ্বংসস্তূপ, আবর্জনা পেরিয়ে তারা ছুটে চলেছে ওড়ার দিকে। যেখানে ওড়া বলতে বোঝায় কেবল দুটো ডানামাত্র। আর একটা উড়ন্ত মন। যাদের উপর ভর করে অবিরাম ছুটে চলা যায় যাত্রা থেকে যাত্রাহীনতার দিকে, ভয় থেকে ভয়হীনতার দিকে, অবিশ্বাস থেকে বিশ্বাসের দিকে। বিস্তৃত খোলা একটা মাঠ — যেখানে জমা হয় লাখো লাখো লাশ — তারপর গলে, পচে — বুনোশুয়োরের দল দাপাদাপি করে গন্ধ শোঁকার তাড়নায় — সেখানে গরু চড়ায় না কোনো রাখালের দল — মহাকাশ আর মাটির মাঝখানে সেখানে রাশি রাশি ফাঁপা স্বপ্ন, বলা ভালো স্বপ্ন দেখা এবং দেখানোর অভ্যাস। রাষ্ট্র বাধ্য করে আবর্জনার স্তূপ পাহাড়সমান করতে। পাহাড়ের চূড়া যত উঁচু হয়, আবর্জনাযুক্ত মানুষদের প্রত্যাশা তত বাড়তে থাকে। তারপর চূড়ান্ত হতাশা। আবার উচ্চাকাঙ্খা। আবার লোভের হাতছানি। আবার বন্ধুত্ব। প্রেম।
ঈশান ঘোষের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ‘ঝিল্লি’ এই শহরের বুকে বাস করা আরেকটি জীবনের খোঁজ দেয়। কলকাতার অখ্যাত বা কুখ্যাত ডাম্পিং গ্রাউন্ড ধাপা। বকুল নামের এক তরুণের সেখানে কাজ করা, মানসিক বিপর্যয়, বেকারত্বের অস্থিরতা এ ছবির মুখ্য বিষয়।

মহানগরের মধ্যেই আস্ত একটা ধাপার মাঠ। মানুষ থেকে জীবজন্তু সবার শরীরেরই হাড়ের টুকরো এখানে পাওয়া যাবে। দেখা যাবে মৃত ঘোড়াদের টগবগ শব্দ। কলকাতার সমস্ত আবর্জনা ধারণ করে আছে ধাপার মাঠ। দীর্ঘদিন ধরে। আবর্জনা জমতে জমতে পাহাড় হয়ে গেছে। সেখানেই বাস করে বকুল, গণেশ, চম্পা, শম্ভুরা। প্রত্যেকেই বন্ধু। একে অপরের সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে৷ প্রত্যেকেই আবার একা। দারিদ্র্য জ্বালায় প্রত্যেকেই চাইছে নিজের পায়ে ঘুরে দাঁড়াতে। আবর্জনার বাইরে দুর্গন্ধহীন একটা জীবনে বাঁচতে৷ কিন্তু দুর্গন্ধই তাদের তাড়া করে বেড়ায়৷
ঈশান ঘোষের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ‘ঝিল্লি’ এই শহরের বুকে বাস করা আরেকটি জীবনের খোঁজ দেয়। কলকাতার অখ্যাত বা কুখ্যাত ডাম্পিং গ্রাউন্ড ধাপা। বকুল নামের এক তরুণের সেখানে কাজ করা, মানসিক বিপর্যয়, বেকারত্বের অস্থিরতা এ ছবির মুখ্য বিষয়। বকুল এবং তার বন্ধুরা ড্রাগে মত্ত হতে থাকে। বিপর্যস্ত তারুণ্যের প্রতিফলন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন ঈশান।

তাঁর ছবির ক্যামেরা কোথাও বসে থাকেনি৷ চরিত্রের পিছু পিছু ধাওয়া করে বেড়িয়েছে এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত৷ ক্যামেরার অস্থিরতা প্রতি মুহূর্তে প্রমাণ করেছে এ জীবন বিপর্যয়ের। নানান প্রতিকূলতার মধ্যে এক বৃহৎ জীবনের খোঁজ। বাংলা চলচ্চিত্রে এমন অস্থির ক্যামেরার কাজ আগে দেখা যায়নি।
ছবির ক্যামেরা কোথাও বসে থাকেনি৷ চরিত্রের পিছু পিছু ধাওয়া করে বেড়িয়েছে এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত৷ ক্যামেরার অস্থিরতা প্রতি মুহূর্তে প্রমাণ করেছে এ জীবন বিপর্যয়ের।
টোরিনা চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হয়েছিল ‘ঝিল্লি’-র। সেখানে পরিচালক জানিয়েছেন তাঁর ব্যক্তিগত কিছু কথা। এশিয়ার বৃহত্তম ডাম্পিং গ্রাউন্ডগুলির মধ্যে একটি হল ধাপার মাঠ। পরিচালক আবর্জনায় ঝাঁপ দিয়েছেন। তুলে এনেছেন কিছু রূঢ় সত্যি কথা। এ যেন সমান্তরাল এক বিশ্ব। যার ইতিহাস আমাদের অজানা। শহর আবর্জনাবদ্ধ মানুষগুলোকে কী দিয়েছে? আদৌ কি ভেবেছে তাদের কথা? শহরে থেকেও ওরা বঞ্চিত হয়েছে মূলস্রোতে বাঁচতে। পরিচালক জানিয়েছেন, “এই ছবিটি তৈরি করে তাঁদের জীবনের সামান্য অংশ হতে চেয়েছিলাম।”

ঈশান ছবিতে দেখান হাজার প্রতিকূলতার মধ্যেও এ জীবন থেকে তাঁরা কীভাবে সৌন্দর্য ও আনন্দ খুঁজে পায়। নোংরা জমির মধ্যে থাকতে থাকতে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখে তারা। হতাশার চেয়েও সেখানে আশার আলো ঝিলিক মারে। তাই শম্ভু চাকরি না পেয়েও বকুল, গণেশদের জানায় সে কুড়ি হাজার টাকার একটি চাকরি পেয়েছে। অতএব বকুল, গণেশরা এখন ভিখারি। ওরা মাটিতেই থাকবে৷ শম্ভু আকাশে উড়তে চায়। গণেশ অনেক কষ্টে আরেক বন্ধুর সঙ্গে ব্যবসা দাঁড় করাতে চায়। কিন্তু বন্ধু তাকে ছেড়ে চলে যায় চাকরি পেয়ে। আর আদিগন্ত বিস্তৃত ধাপার মাঠে একা পড়ে থাকে বকুল। শহর জোড়া হাইরাইজের উচ্চতায় চাপা পড়ে যায় তার স্বপ্ন। ঘর যায়৷ বলে, “মা, খুব খিদে পেয়েছে।”
এ শহর অবিরাম পরিবর্তনশীল। রাষ্ট্রব্যবস্থা বোঝে না সেইসব সমান্তরাল জীবনের কথা। বাড়ি ভেঙে সেখানে পার্ক হয়। রাস্তা হয়। আর ধাপার একাংশ মানুষ আজীবন কাটিয়ে দিতে চান ওই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ছবিতে বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে এরোপ্লেনের অনুষঙ্গ। জমি থেকে মহাকাশের বিশালতা বোঝাতেই উড়োজাহাজের গতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রায় পাঁচ বছর ধরে ছবিটি তৈরি করেছেন ঈশান। এর আগে তিনি গৌতম ঘোষের দুটি ছবি ‘শঙ্খচিল’ এবং ‘রাহগির’-এ সহযোগী পরিচালনার কাজ করেছেন। হাত পাকিয়েছেন চিত্রগ্রহণের কাজেও৷ ‘ঝিল্লি’ ছবির ক্যামেরা তাঁরই করা। যে কাজ আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বমানের৷ ‘ঝিল্লি’-র মতো এমন বৈপ্লবিক কাজ বাংলা চলচ্চিত্রে আগে তেমন দেখা যায়নি।বড়োপর্দায় দেখার মতো এই ছবিটি কিছু মাস পর মুক্তি পাবে বলে জানান এ ছবির অন্যতম প্রযোজক গৌতম ঘোষ।
‘ঝিল্লি’-র বিষয় ও চরিত্রেরা জীবনের চেয়ে বড়ো। উড়ে চলার রাস্তা তীব্র চওড়া। যার কূলকিনারা নেই। বকুল ঠিক হয়ে যাক। গণেশ ভালো থাক। শম্ভু চাকরি পাক৷ চম্পা নিজের সম্মান পাক৷ কলকাতা এত কিছু বুঝল, আর এগুলো বুঝবে না? রাষ্ট্র বড়ো কঠিন শব্দ। তাদের বোঝা দায়।

“মাঝে মাঝে মনে হয় কলকাতার পয়ঃপ্রণালীর
মধ্যে থেকে উঠে আসে, আজীবন যে শুয়ে রয়েছে… শিশু
যারা সামাজিক মাতা-পিতা নয় স্তম্ভিত ক্রিড়ায়
যে বোঝে সবার মধ্যে লক্ষ্যণীয় স্থান নেই তার—
নিতে হবে ছলে বলে, কেড়ে ও কৌশলে
রক্তে ও চোখের জলে ভেসে যাবে গাঙ্গেয় কলকাতা
শিরার সড়ক খুলে ঢালা হবে প্রসিদ্ধ বিদ্যুৎ
জ্বলবে ও জ্বালাবে তাকে এবং কলকাতা জ্বলে যাবে।”
(এক হতচ্ছাড়া যুদ্ধ চাই/ শক্তি চট্টোপাধ্যায়)
