
যদিও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘হাওয়া’ একটি মাইলস্টোন বৈকি!
৪র্থ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ‘হাওয়া’ একমাত্র ‘ভালো’ ছবি নয়। ‘রেহানা মরিয়ম নূর’, ‘নোনা জলের কাব্য’-এর মতো আরও কিছু ভালো ছবিও প্রদর্শিত হয় অত্যন্ত অনাড়ম্বরে এবং দর্শকদের কোনোরকম উন্মাদনা ছাড়াই। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে কোন ছবি কতটা বা কীভাবে উদযাপিত হবে তা সম্পূর্ণভাবে দর্শকদের ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় এবং দর্শকই ছবির ভাগ্য-নিয়ন্তা।
২রা নভেম্বর, ২০২২। শহর কলকাতায় আয়োজিত ৪র্থ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র (4th Bangladesh Film Festival – Kolata) উৎসবের শেষ দিন। নন্দন (Nandan) প্রাঙ্গনে বিকেল থেকে লম্বা লাইনে দর্শকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে। নন্দন-৩-এ প্রদর্শিত হবে ‘নোনা জলের কাব্য’ এবং নন্দন-২-এ ‘হাওয়া’ (Hawa)। ‘হাওয়া’র লাইনটিকে অনেক আগেই সমাপ্ত করা হয়েছে। সেখানে যাদের জায়গা হয়নি তাদের বেশিরভাগই একরকম বাধ্য হয়েই ‘নোনা জলের কাব্য’-র লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এই দীর্ঘ একঘেয়েমির একটি বিনোদন হয়ে ওঠে ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট ম্যাচ। অনেকেই তাই স্মার্টফোনে ব্যস্ত। সেই ফাঁকেই আলাপ জমে ওঠে ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক ফটোগ্রাফার যুবকের সঙ্গে। কথায় কথায় জানা গেলো ঠিক আগেরদিন প্রদর্শিত ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ তাকে খুব একটা নাড়া দিতে পারেনি, তবে ‘হাওয়া’ তাকে শুধু নাড়াই দ্যায়নি, তার মনে রীতিমতো তুফান তুলে দিয়েছে। পরে অবশ্য ‘নোনা জলের কাব্য’ প্রদর্শনের মাঝপথেই যুবকটি কিছুক্ষণ উসখুস করে, মোবাইল ঘেঁটে হল ছেড়ে বেরিয়ে যায়। শোয়ের শেষে তাই একটিই প্রশ্ন নিয়ে ঘরে ফিরতে হলো- কীভাবে ‘হাওয়া’র মতো ছবি একটি দেশের চলচ্চিত্র উৎসবের বাকি সমস্ত ছবিকেই ম্লান করে দিতে পারে?

কলকাতায় হাওয়া ছবি দেখার জন্য দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ৪র্থ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উৎসব উপলক্ষ্যে নন্দনে ‘হাওয়া’ ছবিটির পূর্বনির্ধারিত তিনটি প্রদর্শনীকে বাড়িয়ে পাঁচটি করা হয় এবং প্রত্যেকটি প্রদর্শনীই হাউজফুল হয়। এপার বাংলার কোনও বাংলা ছবি নিয়ে এ বাংলার দর্শকের মধ্যে শেষ কবে এতো উন্মাদনা দেখা গিয়েছিলো সেকথা কলকাতা মহানগরী হয়তো ভুলতেই বসেছে।
আরও পড়ুন: হাওয়া চলচ্চিত্রের রিভিউ
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মেজবুর রহমান সুমন (Mejbaur Rahman Sumon) পরিচালিত ‘হাওয়া’ (২০২২) একটি মাইলস্টোন বৈকি! বৈশ্বিক চলচ্চিত্রের মানদণ্ডেও ছবির নিজস্ব ভাষা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে হাস্যরস এবং ট্রাজেডির এমন মিশেল অনবদ্য। সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলে জীবনের ‘সাদা-কালো’ রঙের মিশেল, শ্রেণি-রাজনীতি, যৌনতার টানাপোড়েন এবং জৈবিক সংকট প্রায় নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে জীবনমুখী এই ছবিটিতে। চিত্রগ্রহণ, শব্দ, আলোর ব্যবহার এবং অভিনেতাদের অভিনয় দক্ষতা – এসবকিছুর বিচারে ছবিটি নিঃসন্দেহে উন্নতমানের। প্লট কিছুটা দুর্বল হলেও থ্রিলার এবং অ্যাডভেঞ্চার-প্রেমী বাঙালি যে মুগ্ধ হবেই সেকথা অবশ্য নতুন নয়। কিন্তু এর বাইরেও ভালোলাগার মতো আরও কিছু বিষয় থেকে যায়। যেমন ছবিতে ব্যবহৃত গানগুলি ছায়াছবির গান হিসেবে কাহিনিকে শুধু এগিয়েই নিয়ে যায়নি, যোগ করেছে এক বিশেষ আচ্ছন্নতা। ছবির ট্রেলার এবং গানগুলি মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই ‘হাওয়া’ নামটি প্রায় রাতারাতি দর্শকের মুখে মুখে ফিরেছে। পল্লী বাংলার প্রাণের কাছাকাছি যে মেঠো সুর ‘তুমি বন্ধু কালা পাখি’র মতো গানের অসম্ভব সুন্দর কথনে উঠে এসেছে তার যাদু তো ব্যর্থ হবার নয়। তাই ছবিটি পর্দায় দেখতে পাওয়ার আগে শুধু গানের মাধ্যমেই ছবিটির সঙ্গে দর্শকদের এক অদৃশ্য যোগাযোগ ও আত্মীয়তা তৈরি হয়ে গিয়েছে। এবার আসা যাক ছবির চরিত্রদের মুখের ভাষা প্রয়োগের বিষয়ে। বাংলাদেশের বাংলা ছবিতে আঞ্চলিক উপভাষার প্রয়োগ স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত হলেও এ-বাংলার চলচ্চিত্র নির্মাতারা চরিত্রদের মোটামুটি কলকাতার সাংস্কৃতিক গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। (প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য, মানস মুকুল পাল বা অনির্বাণ ভট্টাচার্যের মতো কয়েকজন অবশ্য এই নিরিখে ব্যতিক্রমী কাজ করে চলেছেন) তাই এ বাংলার শহুরে দর্শকের কাছে ‘হাওয়া'র চরিত্রদের মুখের ভাষা অভিনব। ছবিটিতে খুলনা এলাকার উপভাষা ব্যবহারের মাধুর্য হয়তো ও-বাংলার দর্শকেরা সহজেই ধরতে পারবেন, কিন্তু এ-বাংলার দর্শকদের কাছে সেটাই হয়তো ম্যাজিক হয়ে উঠেছে। অভিনেতাদের অভিনয় দক্ষতাও মুগ্ধ করার মতো। বিশেষ করে চঞ্চল চৌধুরীর কথা তো আলাদা করে বলতেই হয়। তাঁর অভিনয় শৈলী দুই বাংলার দর্শককেই সমানভাবে মজিয়ে রাখে। এ-বাংলার গতানুগতিক টেলিভিশন ধারাবাহিকগুলির শৈল্পিক ব্যর্থতা তো অনেকাংশেই দায়ী ওপার বাংলার টেলিভিশনের ‘নাটক’ এবং চঞ্চল চৌধুরীর মতো (Chanchal Chowdhury) সুদক্ষ অভিনেতাদের আপন করে নেওয়ার জন্য। তাই ‘হাওয়া’র এহেন চমকপ্রদ সাফল্যের পিছনে চঞ্চল চৌধুরীর ‘স্টার ক্যারিশ্মা’কে অস্বীকার করার কোনোও উপায় নেই। এছাড়াও ছবির নির্মাণ শৈলী, ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণ প্রক্রিয়া এবং কলাকুশলীদের পরিশ্রমের মূল্যায়ণ যেভাবে বাঙালি দর্শক করতে পেরেছে তা অবশ্যই বাংলার অন্যান্য প্রযোজক-পরিচালকদেরকেও প্রেরণা জোগাবে গতানুগতিকতা ভেঙে ভালো কাজ করার জন্য।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মেজবুর রহমান সুমন পরিচালিত ‘হাওয়া’ (২০২২) একটি মাইলস্টোন বৈকি! বৈশ্বিক চলচ্চিত্রের মানদণ্ডেও ছবির নিজস্ব ভাষা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে হাস্যরস এবং ট্রাজেডির এমন মিশেল অনবদ্য।

হাওয়া – প্রোডাকশন স্টিল
‘হাওয়া’র অভাবনীয় সাফল্য যেমন বাংলা ছবির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার বার্তা দেয়, আবার কিছুটা হলেও হতাশ করে। ৪র্থ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ‘হাওয়া’ একমাত্র ‘ভালো’ ছবি নয়। ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ (Rehena Maryam Noor), ‘নোনা জলের কাব্য’ (Nonajoler Kabbo)-এর মতো আরও কিছু ভালো ছবিও প্রদর্শিত হয় অত্যন্ত অনাড়ম্বরে এবং দর্শকদের কোনোরকম উন্মাদনা ছাড়াই। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে কোন ছবি কতটা বা কীভাবে উদযাপিত হবে তা সম্পূর্ণভাবে দর্শকদের ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় এবং দর্শকই ছবির ভাগ্য-নিয়ন্তা। সেক্ষেত্রে কোনো ছবির শিল্পগুণ নিয়ে আলোচনার প্রাসঙ্গিকতাই বোধহয় মূল্যহীন হয়ে যায়, শুধু পড়ে থাকে ব্যবসায়িক সাফল্যটুকুই। কারণ একটি ভালো শিল্পকর্ম নিয়ে যে দর্শক পাগলপ্রায়, আরোও একটি ভালো শিল্পকর্ম নিয়ে সেই একই দর্শক যদি একেবারেই নিরুত্তাপ থাকে তাহলে প্রথম শিল্পকর্মটির মূল্যায়ন কতখানি শিল্পগুণের নিরিখে সে বিষয়ে তো সন্দেহ থেকেই যায়।

রেহানা মরিয়ম নূর
পরিচালক রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের প্রথম ছবি ‘নোনাজলের কাব্য’ (২০২০) এবং আবদুল্লা মহম্মদ সাদের ‘রেহানা মরিয়ম নূর' (২০২১) এ সময়ের বাংলাদেশী বাংলা ছবির ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য দুটি কাজ। ২৭তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এ দুটি ছবিই প্রদর্শিত হয়। ‘রেহানা মরিয়ম নূর' সম্পূর্ণভাবে নাচ-গান বর্জিত সামাজিক সমস্যাভিত্তিক, নারী-কেন্দ্রিক একটি স্বল্প বাজেটের ছবি, যা ৭৪তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘আঁ সেরতাঁ র্যবগার’ বিভাগে নির্বাচিত হয়। এশিয়া প্যাসিফিক স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডসের ১৪তম আসরে ছবিটি যৌথভাবে গ্রান্ড জুরি পুরস্কার পায় এবং আজমেরি হক বাঁধন সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। অন্যদিকে ‘নোনা জলের কাব্য’ ঘূর্ণিঝড় সিডর (২০০৭) পরবর্তী বঙ্গোপসাগর উপকূলের জেলে জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ওপর পরিবর্তনশীল ও প্রতিকূল মৌসুমি জলবায়ু এবং ইসলামিক কুসংস্কারের প্রভাব বিষয়ে একটি প্রগতিশীল ছবি, যেটি লন্ডন ও বুসান-সহ আরও বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। শিল্পগুণ এবং চলচ্চিত্র-ভাষার নিরিখে এ দুটি বাংলা ছবিই যে এ সময়ের প্রথম সারির কাজ সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
পরিচালক রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের প্রথম ছবি ‘নোনাজলের কাব্য’ (২০২০) এবং আবদুল্লা মহম্মদ সাদের ‘রেহানা মরিয়ম নূর' (২০২১) এ সময়ের বাংলাদেশী বাংলা ছবির ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য দুটি কাজ। ২৭তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এ দুটি ছবিই প্রদর্শিত হয়।

নোনা জলের কাব্য
এখন ‘হাওয়া’র সঙ্গে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ এবং ‘নোনা জলের কাব্য’র তুলনা টানতে গেলে যে বিষয়টি প্রথমেই চোখে পড়ে তা হল বিশুদ্ধ বিনোদনের দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বস্তরের দর্শককে টানার মতো যথেষ্ট মশলা ‘হাওয়া’তে ভরপুর রয়েছে, কিন্তু বাকি দুটি ছবির ক্ষেত্রে সেই মশলা প্রায় অনুপস্থিত। যেমন নাচ-গান বর্জিত ভারতীয় ছবির ভাবনাটাই যেন একটা সোনার পাথরবাটি। আর এ সমস্যা তো আজকের নয়, যেমন ‘পথের পাঁচালী’র যুগেও ছিল। তাই বলা যায় ‘রেহানা মরিয়ম নূর' এবং ‘নোনা জলের কাব্য’ অনেক বেশি মননশীল এবং বিকল্পধারার ছবি; আমাদের দেশে এরকম বিশ্বমানের ছবির দর্শক হয়তো সত্যিই কম। তাছাড়া ‘হাওয়া’ ছবিটিকে ঘিরে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমগুলিতে যে ‘হাইপ’ তৈরি হয়েছে, তার ছিটেফোঁটা প্রচার কিন্তু বাকি ছবিগুলি পায়নি। রেটিং দেখে ছবি দেখতে যাওয়ার যে কর্পোরেট অভ্যেস আমাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে সঠিক জিনিসের যথার্থ মূল্যায়ন আমরা সবসময় করে উঠতে পারি কি?
বেশ কিছুদিন ধরেই ‘মধ্যমেধার বাংলা ছবি’র পাশে দাঁড়ানোর আর্জি নিয়ে যে ‘ন্যাকামি’ এ-বাংলায় শুরু হয়েছে তার যোগ্য জবাব বোধহয় দিয়ে গেল ও-বাংলার ছবি ‘হাওয়া’। একথা সত্যি যে ‘হাওয়া’ এপার বাংলা এবং ওপার বাংলায় তৈরি হওয়া সমসাময়িক অন্যান্য কয়েকটি ভালো ছবির তুলনায় ওভাররেটেড; তা সত্ত্বেও বলতেই হয় সৎ প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত বিফলে যাবার নয়। মধ্যমেধার দাপাদাপি, লবিবাজি এবং রাজনৈতিক প্রভাব যেভাবে টলিউড ইন্ডাস্ট্রিকে দিনে দিনে রুগ্ন করে তুলছে তাতে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ছবির ভবিষ্যৎ অনুমান করা খুব কঠিন নয়। এহেন অস্বাস্থ্যকর আবহে ও-বাংলার ‘হাওয়া’ এসে যে বার্তা দিয়ে গেল, তা থেকে এ-বাংলা কিছু শিখতে পারলো কিনা সেকথা সময়ই বলুক।
____
*মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব
