
তাঁর গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য হল ‘অ্যাপ্লিকেশন অফ টেকনোলজি ফর অ্যাফোর্ডেবল হেলথকেয়ার’
তিনি পেয়েছেন বিজ্ঞানক্ষেত্রে ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার। পেয়েছেন ইনফোসিস পুরস্কারও। এবারে পেলেন আন্তর্জাতিক সংস্থা রিসার্চ.কম (Research.com)-এর ডি-ইনডেক্স (D-Index) অনুযায়ী ভারতের সেরা গবেষকের তকমা। তিনি ড. সুমন চক্রবর্তী (Dr. Suman Chakraborty)। বর্তমানে সুমনবাবু খড়গপুর আইআইটি-র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এবং স্যার জে.সি. বোস ন্যাশনাল ফেলো।
সুমন চক্রবর্তীর স্কুলজীবন কেটেছে কলকাতার সেন্ট লরেন্স স্কুলে। তারপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বিই এবং ব্যাঙ্গালোরের আইআইএসসি থেকে এমই ও পিএইচডি। তারপর উচ্চতর গবেষণার কাজে পাড়ি জমিয়েছিলেন জার্মানি এবং ইউএসএ। তাঁর গবেষণার প্রাথমিক বিষয়গুলি ছিল ফ্লুইড ডাইনামিক্স এবং তাপগতীয় ঘটনাবলি। যেমন থার্মোডিনামিক্স (Thermodynamics), হিট ট্রান্সফার (Heat Transfer) ইত্যাদি। একান্ত সাক্ষাৎকারে বঙ্গদর্শন.কম-কে সুমনবাবু বলেন, “আধুনিক বিজ্ঞানের সমস্যাগুলি একই ধরনের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। তা করার জন্য বিভিন্ন বিভাগ থেকে তথ্য নিতে হয়। যার মধ্যে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হল ন্যানোমেটেরিয়াল এবং ন্যানোপার্টিকেলস (Nano-materials and Nano-particles)। এর মধ্যে পড়ে আলো এবং পদার্থের পরস্পরের ওপর ক্রিয়া এবং ডেটা সায়েন্স (যার মধ্যে পড়ে বিভিন্ন প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্লেষণ)।”

নিজের গবেষণাকার্য থেকেই উদাহরণ দিয়ে বললেন, “আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো র্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট (Rapid Antigen Test)। এই টেস্টের ক্ষেত্রে টেস্ট কিটের মধ্যে থাকা কাগজের বা প্লেটের উপরে রাখা ভাইরাস বা সংক্রামক নমুনাটি ক্যাপিলারি অ্যাকশনের (Capillary Action) মাধ্যমে বাহিত হয়। অর্থ্যাৎ এইধরণের প্রবাহে অন্য কোনও পাম্পজাতীয় যন্ত্রের সাহায্য নিতে হয় না। সেই কিটের অন্য অংশে থাকে অনুরূপ অ্যান্টিজেন বা অ্যান্টিবডি। এই দুটি পদার্থ যদি কোনো ন্যানোপর্টিকেলের মাধ্যমে একত্রিত হয়, তবে কিছু বিশেষ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোক সংকেত তৈরি হয়। এইধরণের সংকেতের একটি বৈশিষ্ট্য হলো ‛সারফেস প্লাজমন রেসোনেন্স।’ সেই সংকেতকে ফ্লুরোসেন্ট বা ল্যাটারাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়। সেই বিশ্লেষণ থেকে বলা যায় ভাইরাসটি নমুনাতে আছে না নেই।”
রিসার্চ.কম একটি বিখ্যাত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের প্রকাশিত পিয়ার রিভিউড থিসিস পেপারের সংখ্যা, তাদের পূর্ববর্তী কাজ, সেই থিসিস পেপারগুলির কাজের বিশ্বময় প্রভাব, এইসবের উপর ভিত্তি করে একটি বিশ্বব্যাপী র্যাঙ্কিং তৈরি করে। বিশ্বস্তরে এই র্যাঙ্কিং-এর একেবারে উপরের দিকে যেসব বিজ্ঞানীরা স্থান পেয়েছেন, তাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুবিখ্যাত এবং স্বনামধন্য। ইনফোসিস পুরস্কার প্রাপ্ত ড. সুমন চক্রবর্তীর গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য হল ‘অ্যাপ্লিকেশন অফ টেকনোলজি ফর অ্যাফোর্ডেবল হেলথকেয়ার’। তিনি বলেন, বাংলা ভারত তথা সারা পৃথিবীতে গ্রামাঞ্চলের ও শহরাঞ্চলের মানুষদের একটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হল স্বাস্থ্য। তাঁদের কাছে স্বাস্থ্যপরিষেবা ঠিকমতো পৌঁছায় না বা তাঁরা আর্থিক অসঙ্গতির কারণে সেসব পরিষেবা গ্রহণ করতে পারেন না। এমনকি তাঁদের রোগগুলির প্রাথমিক শনাক্তকরণও বেশিরভাগ সময়ে সম্ভব হয় না। যেমন-ডায়াবেটিস, যার থেকে হার্ট, কিডনি, চোখ এসমস্ত অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বা মুখের ক্যান্সার, যা প্রাথমিক পর্যায়ে ধরাই পড়ে না। কিন্তু এসব রোগ একবার ছড়িয়ে পড়লে রোগীকে হয় বাঁচানোই মুশকিল হয়ে যায়, অথবা চিকিৎসার খরচ সাধ্যের বাইরে চলে যায়। গ্রামাঞ্চলের মহিলা ও শিশুদের ক্ষেত্রে অপুষ্টি ও সেইজনিত রক্তাল্পতা একটি বড়ো সমস্যা। সেই সমস্ত রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও রোগ নিরাময়ে প্রাথমিক সহায়তা দেওয়াই এই ধরনের গবেষণার মূল উদ্দেশ্য। আমাদের আবিষ্কৃত এই টেকনোলজিগুলো এখন অনেক কোম্পানি ব্যবহার করছে এবং তার মাধ্যমে নতুন পণ্য এবং রোগনির্ণয়ের যন্ত্র তৈরি করছে। আমাদের টিমের উদ্দেশ্য এই সমস্ত প্রযুক্তিজাত যন্ত্র, যা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলির উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। সেগুলিকে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া এবং যেখানে রোগনির্ণয় ও প্রাথমিক চিকিৎসার সুব্যবস্থা নেই, সেখানে যন্ত্রের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ এবং ডেটা সায়েন্সের মাধ্যমে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে সেসব অঞ্চলে ডিজিটাল স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং টেলিমেডিসিন পরিষেবার মাধ্যমে সুলভে চিকিৎসা পরিকাঠামো গড়ে তোলা।
শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার প্রাপ্ত বিজ্ঞানীকে এই নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তাঁর প্রতিক্রিয়া, “সবাই ভাবছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তা সম্ভব নয়। কারণ এটি কাজ করে অ্যালগোরিদমের উপর। অ্যালগোরিদম তৈরি করতে হলে প্রচুর টেস্ট ডেটা লাগে। এই অ্যালগোরিদম তৈরির প্রধান চ্যালেঞ্জ হল, যদি বাস্তবে এমন কোনো ঘটনা ঘটে, যা ঐ টেস্ট ডেটাগুলির বাইরে, তাহলে তার সমাধান AI দিয়ে করা সম্ভব নয়। আর আমাদের দেশে কর্মক্ষম মানুষের অভাব নেই, তাই সম্পূর্ণভাবে AI-এর উপর নির্ভর করার দরকারও নেই। বদলে AI এবং মানুষের কর্মদক্ষতা মিশিয়ে এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে, যা হবে সবদিক থেকেই অপরাজেয়।”

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সারা পৃথিবীতে এখন বহুল চর্চিত বিষয়। শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার প্রাপ্ত বিজ্ঞানীকে এই নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তাঁর প্রতিক্রিয়া, “সবাই ভাবছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তা সম্ভব নয়। কারণ এটি কাজ করে অ্যালগোরিদমের উপর। অ্যালগোরিদম তৈরি করতে হলে প্রচুর টেস্ট ডেটা লাগে। এই অ্যালগোরিদম তৈরির প্রধান চ্যালেঞ্জ হল, যদি বাস্তবে এমন কোনো ঘটনা ঘটে, যা ঐ টেস্ট ডেটাগুলির বাইরে, তাহলে তার সমাধান AI দিয়ে করা সম্ভব নয়। আর আমাদের দেশে কর্মক্ষম মানুষের অভাব নেই, তাই সম্পূর্ণভাবে AI-এর উপর নির্ভর করার দরকারও নেই। বদলে AI এবং মানুষের কর্মদক্ষতা মিশিয়ে এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে, যা হবে সবদিক থেকেই অপরাজেয়।” এই সংক্রান্ত উদাহরণও দিলেন তিনি। ধরা যাক, একজন ভিড়বহুল রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছে। কিন্তু সে ড্রাইভিং-এ অত দক্ষ নয়। গাড়িতে যদি এমন কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থাকে, যা ভিড় রাস্তায় চালককে সাহায্য করবে, তাহলে চালকের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। এছাড়া, ডাক্তারির কাজে AI-র ব্যবহার খুবই কার্যকর হতে পারে। আমাদের দেশে রোগীর মাথাপিছু ডাক্তারের সংখ্যা দরকারের থেকে কম। তাই সবসময় একজন রোগীর জন্য বেশি সময় দেওয়া সব ডাক্তারের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক চিকিৎসা করতে গেলে একজন চিকিৎসককে রোগী সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে হয়, যেমন-রোগের পূর্ব ইতিহাস, তার পরিবারে এই রোগের ইতিহাস, রোগের প্রাথমিক লক্ষণ ইত্যাদি। যদি কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সমস্ত তথ্য এবং সে সংক্রান্ত বিশ্লেষণ চিকিৎসকের হাতে তুলে দেওয়া যায়, তবে তাঁর কাছে চিকিৎসার কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে। সুমনবাবুর দাবি, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঠিক, সুষ্ঠ ও কার্যকর ব্যবহার সবক্ষেত্রেই খুলে দেবে নতুন সুযোগের দিগন্ত।”
রিসার্চ.কম-এর অন্তর্গত ডি-ইনডেক্সে ভারতসেরা গবেষক সুমন চক্রবর্তী। তাই বাংলা তথা ভারতের তরুণ গবেষকদের উদ্দেশ্যে তাঁর উপদেশ জানাটা অবশ্যকর্তব্য। গবেষণার মধ্যে সমস্তরকম চ্যালেঞ্জ স্বীকার করে নিয়ে সুমন জানান, “প্রশ্ন উদ্ভাবন করতে হয় নিজেকে। উত্তরও নিজেকেই খুঁজে বের করতে হয়। এই পথের পরতে পরতে আছে অজানাকে জানবার, অচেনাকে চেনবার আনন্দ। সেইসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছা আর সাহস যদি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থাকে, তবেই তাদের গবেষণায় আসা উচিৎ।”
____________________________
সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখা
