
বাড়িতেই তৈরি হয় প্রাকৃতিক রং
আজ দোল উৎসব। গত কয়েক বছর ধরে ভেষজ আবিরের চাহিদা বাড়ছে দোলের সময়। রাসায়নিক আবির কত অপকার করে, তা নিয়ে আম-আদমি সচেতন হচ্ছেন ক্রমশ। রেড অক্সাইড, মেটানিল ইয়েলো ও ম্যালাকাইট গ্রিনের মতো পদার্থ থাকলে ত্বকে জ্বালা এবং চুলকুনি হয়। অ্যালার্জিক কনজাংটিভাইটিস, কর্নিয়ার ক্ষতি – আরও নানা প্রভাব দেখা গিয়েছে রাসায়নিক আবিরে।
প্রায় দেড় দশক আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ মানুষের হাতে ভেষজ আবির তুলে দিয়েছিল। এখন বাজার ছেয়ে গিয়েছে ভেষজ আবিরে। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে রাসায়নিক রং মেশানো আছে কিনা, তা নিয়েও থেকে যায় সন্দেহ। তাই বিষমুক্ত জৈব সামগ্রী নিয়ে যাঁরা দীর্ঘদিন চর্চা করছেন, তাঁদের থেকে কেনাই সবচেয়ে ভালো।
কৃষাণ স্বরাজ সমিতি
শৈলেন চণ্ডী এরকমই একজন রাসায়নিক বিরোধী যোদ্ধা। ২০১০ সাল থেকে জৈব সামগ্রী নিয়ে লড়ে যাচ্ছেন। প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বেলুড় মঠের রামকৃষ্ণ মিশন জনশিক্ষা মন্দির এবং রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ডেভলপমেন্ট রিসার্চ কমিউনিকেশন অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টার বা ডিআরসিএসসি থেকেও প্রশিক্ষিত তিনি। আগে বহুদিন কৃষিকাজ করতেন। তবে এখন আর করেন না। গ্রামে গ্রামে গিয়ে দেশি বীজ চাষের প্রশিক্ষণ দেন। তাহলে সংসার কীভাবে চলে? “কৃষকদের থেকে ফসল কিনে প্রসেসিং করি। এতেই আমার রোজগার হয়,” জানালেন শৈলেনবাবু।
কৃষাণ স্বরাজ সমিতি নামের এক সংগঠনের শান্তিপুর শাখার দায়িত্বে রয়েছেন শৈলেন চণ্ডী। জৈব চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করাই সংগঠনের কাজ। সঙ্গে মহিলা কৃষকদের গুরুত্ব তুলে ধরে সবার সামনে। শৈলেনবাবু জানালেন, “আমাদের দেশে পুরুষের থেকে মহিলারা কৃষিকাজে বেশি সংখ্যায় যুক্ত। কৃষকদের মধ্যে মহিলারা আছেন ৫৪ শতাংশ, বাকি ৪৬ শতাংশ পুরুষ। অথচ চাষি ভাইদের কথা আমরা যত বলি, চাষি বোনদের ততটাই ভুলে থাকি।”
শান্তিপুরে ২০১৮ সালে তাঁদের উদ্যোগে শুরু হয় ‘বিষমুক্ত খাদ্য বাজার’। মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠীও তৈরি করেছেন। নাম ‘মঞ্জুরি মহিলা গোষ্ঠী’। তাঁর মতে, “চারপাশে এত স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কথা শোনা যায়। কিন্তু তারা কেউ স্বনির্ভর নয়। আমরাই প্রথম স্বনির্ভর গোষ্ঠী চালু করি। যেখানে মেয়েরা নিজেরাই পণ্য উৎপাদন করে। নিজেরাই বিক্রি করে।”
শৈলেন চণ্ডী
শৈলেনবাবু এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের থেকে প্রশিক্ষণ পেয়ে ২০১৯ সালে মহিলারা বানিয়ে ফেলেন ভেষজ সাবান। পরের বছর ভেষজ শীতকালীন ক্রিম উৎপাদন করেন। চলতি বছরে প্রথম তাঁরা আবির তৈরি শুরু করলেন। তার জন্য জবা, পলাশ, শিউলি, গাঁদার মতো নানা ধরনের ফুল লাগে। সেগুলোর চাষ বাড়িতেই করেন গোষ্ঠীর মহিলারা। আর লাগে ভুট্টার অ্যারারুট। এই আবির একশো শতাংশ ত্বক-বান্ধব। শৈলেনবাবুর কথায় “গতবার আবির বানাতে পারিনি। এবছর তৈরি করেছি। দু’তিন-দিন আগে আবির বিক্রি শুরু হয়েছে। অর্ডার অনেক পেয়েছি। দেড় কুইন্টাল মতো উৎপাদন করেছি আবির। প্রত্যেকটি প্যাকেট ১০০ গ্রামের। আশা করি বিক্রি ভালো হবে।”
এভাবেই প্রচুর মহিলার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। দোলে যেমন আবির বিক্রি হয়, তেমনি ভোটের সময়েও আবিরের চাহিদা থাকে। তাই লাভের মুখ ভালো দেখবেন আশা করে সবাই কোমর বেঁধে নেমেছেন। পরবর্তী পরিকল্পনা কী? শৈলেনবাবু জানালেন, “এরপর মেয়েদের জন্য বডি অয়েল তৈরি করব। এছাড়া লক্ষ্মীনাথপুরে ১৭০ বিঘা জমি নিয়ে জৈব গ্রাম বানানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তার জন্য ইতিমধ্যেই হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (হ্যাল) বাড়িয়ে দিয়েছে সাহায্যের হাত।”

