
সেলুনকর্মীর কন্যার জীবনযুদ্ধে জয়ী হবার লড়াই
শুধু লড়াই আর লড়াই। দৌড়ে যাবার লড়াই। সেলুনকর্মীর এক কন্যা জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার লড়াই চালানোর পাশাপাশি দৌড় প্রতিযোগিতার বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে একের পর এক পুরস্কার জিতে আনছেন। আর্থিক অনগ্রসরতার সঙ্গেও উত্তরবঙ্গের এই কন্যার লড়াই আর লড়াইয়ের বিভিন্ন ছবি ক্যামেরাবন্দি করতে আমেরিকা থেকেও একটি টিম সম্প্রতি উত্তরবঙ্গে ঘুরে গেল।
পূজা প্রামানিক। বাড়ি উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল লাগোয়া পোড়াঝাড় গ্রামে। বয়স ১৯ পেরিয়েছে। আলিপুরদুয়ার জেলার ফালাকাটা কলেজের ফিজিক্যাল এডুকেশন অনার্সের ছাত্রী সে। পূজার বাবা মানিক প্রামাণিক সামান্য একজন সেলুনকর্মী। উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কাছেই সিআরপিএফ ক্যাম্পের পাশে রাস্তার ধারে টিন ও বাঁশ দিয়ে তৈরি করা সেলুন চালান পূজার বাবা। আর সেই সেলুন দিয়েই কোনওমতে সংসার চলে পূজাদের।
বাবার সেলুনে পূজা
পূজারা দুই বোন। পূজাই বড়ো মেয়ে। কিন্তু জন্মের পর থেকেই পূজার নেশা দৌড়নো। মেডিকেলের পাশে কাওয়াখালি এলাকায় বিরাট মাঠ রয়েছে। সে মাঠেই চলে তার সকাল বিকাল অনুশীলন। অনুশীলনের ফাঁকেই শিলিগুড়ি শক্তিগড় বালিকা বিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় স্থানীয় স্তর তো বটেই, এমনকি রাজ্য স্তরের অনেক দৌড় প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছে পূজা। আর তাতে সফলতাও এসেছে। দৌড় প্রতিযোগিতার পাশাপাশি হাঁটা প্রতিযোগিতাতে নাম দিয়েও সফল হয়েছে পূজা। এখন ওর ইচ্ছে, জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় সফল হওয়া। আর তার জন্য চলছে অনবরত অনুশীলন।
কিন্ত অনুশীলন চালিয়ে যেতে গেলে তার জন্য জুতো, ট্র্যাক স্যুটসহ অন্য ক্রীড়া সরঞ্জাম দরকার। তাই আর্থিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করতে মাধ্যমিক পাশ করেই পূজা কাওয়াখালি নিমতলায় শিলিগুড়ি রাজবংশী রিপ মিনিস্ট্রি পরিচালিত সেলাই শিক্ষা কেন্দ্রে যোগ দেয়। একদিকে সেলাই শিক্ষার মাধ্যমে স্বনির্ভর হয়ে দুটো পয়সা রোজগার অন্যদিকে খেলাধূলা এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া। দৌড় আর দৌড়।
মাঠে প্র্যাক্টিস করছেন পূজা
কিন্তু কিছু দিন আগে কলকাতায় এক দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়ে ঘটে বিপত্তি। দৌড়তে দৌড়তে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যায় সে। ভর্তি হয় কলকাতার এসএসকেএমে। অসুস্থতা এমনই ছিল যে এসএসকেএমের বেডে শুয়ে সে কাউকে চিনতে পারছিল না। হারিয়ে ফেলেছিল সমস্ত স্মৃতিশক্তি। কিন্তু শেষমেষ চিকিৎসার জেরে সে সুস্থ হয়ে ওঠে। সুস্থ হয়ে পোড়াঝাড়ের গ্রামে পৌঁছেই আবার লড়াই শুরু করে দেয়। সম্প্রতি কলকাতায় রাজ্য স্তরের এক প্রতিযোগিতা থেকে প্রথম পুরস্কারও এসেছে। কিন্তু পূজার কথা, জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতা থেকে পুরস্কার জিতে আনা, বাংলার নাম উঁচুতে মেলে ধরা, আর খেলাধুলা নিয়েই ভবিষ্যতে কিছু করা। তারজন্য ফিজিক্যাল এডুকেশন নিয়ে পড়াশোনা করতে তাকে বেশ লড়াই করতে হচ্ছে।
আমেরিকা থেকে এসেছেন গেম অফ লাইফের একটি বিশেষ টিম
শিলিগুড়ি ও তার আশপাশের কলেজগুলোতে ফিজিক্যাল এডুকেশন নিয়ে পড়ে নিজেকে তৈরি করার সেভাবে সুযোগ নেই। সে সুযোগ রয়েছে আলিপুরদুয়ারের ফালাকাটা কলেজে। তাই ফিজিক্যাল এডুকেশনের টানে ফালাকাটা কলেজে পড়াশোনা করতে বেশ লড়তে হচ্ছে তাকে। রোজ ভোর ছটায় ঘুম থেকে উঠেই এনজেপি থেকে উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেসে চেপে বসা। কলেজ শেষ করে বিকেলে বাড়ি ফিরেই মাঠে অনুশীলন। পূজাদের গ্রামের বাড়ি থেকে অনুশীলন মাঠ, সেলাই শিক্ষাকেন্দ্র অনেকটা দূরে। আর তার জন্য তাকে কখনও হেঁটে, কখনও সাইকেলে পৌঁছাতে হয় সেই সব স্থানে। এর মধ্যেই সেলাই শিক্ষাকেন্দ্রের সমাজসেবী কৌস্তুভ দত্ত পূজাকে তার লড়াই আরও জোরদার করার জন্য গেম অফ লাইফ নামের একটি বই উপহার হিসাবে দিয়েছিলেন। আর পূজার লড়াইয়ের কথা গেম অফ লাইফের প্রকাশককেও জানিয়েছিলেন কৌস্তুভবাবু। গত ১৯ ও ২০ জানুয়ারি আমেরিকা থেকে গেম অফ লাইফের একটি টিম পোড়াঝাড়, কাওয়াখালি এলাকায় এসে পূজার ওপর ভিডিও শ্যুটিং করে গিয়েছে। শীঘ্রই তারা তাদের গেম অফ লাইফের পরবর্তী সংস্করণে পূজার লড়াইয়ের কাহিনি প্রকাশ করবে বলে জানিয়েছে।
