
পেশায় তিনি কলকাতা পুলিশের বিশেষ শাখায় কর্মরত একজন কনস্টেবল
পেশায় তিনি কলকাতা পুলিশের বিশেষ শাখায় কর্মরত একজন কনস্টেবল। এই পেশায় থাকলেও রক্তদান আন্দোলনকে জোরদার করা তাঁর নেশার কাজ। সেইসঙ্গে বিভিন্নরকম সমাজসেবামূলক কাজ করাও। কলকাতা পুলিশের এই কর্মীর নাম বাপন দাস। বয়স ৩৯। জন্ম উত্তরদিনাজপুর জেলার চোপড়া থানার হাফতিয়াগছে। শৈশব জীবনে গ্রামেরই স্কুলে পড়াশোনা। তারপর গ্রাম থেকে শিলিগুড়ি কলেজে পড়তে যাওয়া। কলেজে পড়তে পড়তেই ১৯ বছর বয়স থেকে শুরু হয় চাকরি।
কলেজের পড়া শেষ করতেই কলকাতা পুলিশে চলে যান। চাকরি করতে করতেই রক্তদানের মতো সেবামূলক কাজের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু হঠাৎ রক্তদানের মতো কাজকেই কেন বেছে নিলেন তিনি? বাপনবাবু উত্তর দিচ্ছেন, চাকরি শুরু করার আগে তাঁর দিদি রত্না দাসের মৃত্যু দেখেছিলেন কাছ থেকে। সেই সময় গ্রামে রক্তদানের খুব ভীতি ছিল। অথচ তাঁর দিদির চিকিৎসার সময় রক্তের খুব প্রয়োজন ছিল। রক্তের অভাবে তিনি মারা যান। তখনই শপথ নিয়েছিলেন, গ্রামে গ্রামে মানুষের মধ্যে রক্তদানের ভীতি কমাতে কাজে নামবেন। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ।

বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের জন্য কাজ করছেন বাপন
২০০০ সালেই সরস্বতী পুজোর সময় প্রথম শুরু করেন সামাজিক কাজ। গ্রামের এক হতদরিদ্র বয়স্কা মহিলা মারা যান। মৃতদেহ দাহ করার জন্য জ্বালানি কাঠ ক্রয় করার ক্ষমতা ছিল না সেই পরিবারের। বাপনবাবুরা পুজোর ফান্ড থেকে জ্বালানি কাঠ কিনে সেই মৃতদেহ সৎকারের উদ্যোগ নেন। এরপরই বাপনবাবু গঠন করেন বিধাননগর ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। রক্তদান দিয়েই শুরু হয়েছে কাজ। বাপনবাবু নিজেও রক্তদান করেন। ২০১৯ সালে মোট ২৭টি রক্তদান শিবির করেছেন। ২০১৮ সালে ১৭টি। শিবির পরিচালনার জন্য বাপনবাবু ৬৫ জন ছেলেমেয়েকে নিয়ে একটি টিম গঠন করেছেন। বিভিন্ন থানা থেকেও রক্তদান শিবির আয়োজন করতে ডাক আসছে বাপনবাবুর। রক্তদান শিবির আয়োজনের পাশাপাশি রক্তদান সম্পর্কে ভীতি কমাতেও বাপনবাবু এবং তাঁর টিম গ্রামে গ্রামে গিয়ে সচেতনতার প্রচার করছেন।

পিকনিক স্পট পরিষ্কার রাখার বার্তা
শুধু রক্তদান নয়, পাহাড় বা পাহাড় লাগোয়া পিকনিক স্পটে গিয়ে বাপনবাবু পিকনিক দলগুলোর মধ্যে প্রচার করছেন প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ ও থার্মোকলের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি দুধিয়া গিয়ে বাপনবাবুরা সকলের কাছ থেকে প্লাস্টিক বা থার্মোকলের থালা গ্লাস তুলে নিয়ে তাঁদের হাতে কাগজের থালাবাটি গ্লাস বিলি করেন। আবার দুর্গাপুজোর শেষে নিজের উদ্যোগে মহানন্দা নদী সাফাইয়ের মতো কাজেও নেমে পড়েছেন তিনি। হেলমেটবিহীন বাইক চালকদের রাস্তায় থামিয়ে তাদের হাতে পিঠে বিলি করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। গত ৩০ জানুয়ারি বিধাননগর উৎসবের মাধ্যমে গ্রামের দু’শো জন বিশেষচাহিদাসম্পন্ন মানুষের হাতে ট্রাই সাইকেল, হুইল চেয়ার এবং শ্রবণ যন্ত্র বিলির প্রয়াস নিতেও দেখা যায় বাপনবাবুকে। ফলে উত্তরদিনাজপুরের চোপড়ার গ্রাম থেকে শিলিগুড়ি মহকুমার বিধাননগর বা অন্য গ্রামগুলোতে তাঁর নাম এখন ছড়িয়ে পড়েছে। বাপনবাবু বলেন, “রক্তের অভাবে কারও মৃত্যু হোক তা আমরা চাই না”।

রক্তদান করছেন বাপন
২০১৬ সালে এই কাজের স্বীকৃতি হিসাবে ইন্দোনেশিয়া ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন তাঁকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার দিয়েছে। প্রসঙ্গত, সেবামূলক কাজ করার ফাঁকেই যাদবপুর থেকে সোশ্যাল কাজ করার বিশেষ ডিপ্লোমাও করেছেন বাপনবাবু। ভিআইপিদের নিরাপত্তায় কাজ করা তাঁর চাকরি। আর গ্রামের অসহায় মুমুর্ষ মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাঁর নেশা। গত ২ ফেব্রুয়ারি ইসলামপুরে এক বৌভাতের অনুষ্ঠানেও রক্তদান শিবির আয়োজনে বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করেন তিনি।
