
আলিপুরদুয়ার জেলায় গড়ে উঠেছে এই লাইব্রেরিটি
“An investment in knowledge pays the best interest.” – Benjamin Franklin.
“জ্ঞানার্জন, ধনার্জনের চেয়ে মহত্ত্বর” – সৈয়দ মুজতবা আলী
বহুচর্চিত এই উক্তিগুলি থেকেই খানিকটা উপলব্ধি করা যায় সমাজে জ্ঞান ও শিক্ষার গুরুত্ব। জ্ঞান ও শিক্ষাই গড়ে দেয় একটি জাতির মেরুদণ্ড। চেতনা, চর্চা, বোধ, আত্মসমীক্ষা, কল্পনাশক্তি, কর্মদ্যোগ, যে যে নৌকায় চেপে মানুষ তার আবির্ভাব পর্ব থেকে পার হয়েছে সময়ের বৈতরণী, সভ্যতার ঊষাকাল পেরিয়ে এসে হয়ে উঠেছে আধুনিক, হয়ে উঠেছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জীব, সেসবের মূলে আছে জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ ইতিহাস। শুধু বোধ আর চেতনা নয়, জ্ঞানচর্চার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যের প্রশ্নগুলিও। এই সমাজে তাই প্রতিনিয়ত চলতে থাকে জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন উদ্যোগ। সেসব উদ্যোগের মধ্যে সাম্প্রতিককালে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হল উত্তরবঙ্গের ২৫ বছর বয়সী এক যুবকের তৈরি করা ওপেন এয়ার লাইব্রেরি ইকোস্ফিয়ার (Open Air Library Ecosphere)।

আরও পড়ুন: শনিবারের কড়চা : লাইব্রেরি বিশেষ সংখ্যা
অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, “The only thing that you absolutely have to know, is the location of the library.” পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার কালচিনি ব্লকে গেলে খুঁজে পেতে অসুবিধা হবে না, নিমেশ লামার (Nimesh Lama) তৈরি এই ওপেন এয়ার লাইব্রেরিটির (Open Air Library) অবস্থান। ২০২২ সালের মার্চ মাসে এই লাইব্রেরিটি তিনি সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেন। তিনি জানালেন, “আমি ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে এই ব্যাপারে ভাবতে শুরু করেছিলাম। ভাবনা আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমি এই বিষয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম। আমার বাড়ির সামনে একটা বিরাট মাঠ আছে। আর সেই মাঠে আছে বিশাল একটা গাছ। আমাদের ছোটোবেলায় ঐ মাঠে দুষ্কৃতি শ্রেণির লোকেদের আড্ডা বসতো। তারা সেখানে মদ্যপান ও ড্রাগসেবন করতো। চলতো জুয়া খেলাও। তাই ঐ অংশটা সাধারণ মানুষের জন্য ছিল পরিত্যক্ত। তবে আমরা ছোটোবেলায় ওখানে মাঝে মাঝে বড়োদের কাছ থেকে লুকিয়ে খেলতে যেতাম।”

নিমেশ লামার গ্রামের নাম বাইশধুরা। তিনি ২০২১ সালে গ্র্যাজুয়েশন পাশ করেন এবং এখন বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর লক্ষ্য একজন সরকারি আমলা হয়ে সমাজের উন্নতির জন্যে কাজ করা। তাঁর দলের সমস্ত সদস্যই হয় তাঁর সমবয়সী বা তাঁর থেকে একটু ছোটো। এলাকার সাধারণ মানুষ, নিমেশ লামার প্রতিবেশীরাও তাঁর এই কর্মকাণ্ডের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। পাড়া-প্রতিবেশীরা জানালেন, লামার জন্যেই এই এলাকাটি ঐসব দুষ্কৃতীদের থেকে মুক্ত হয়েছে।
বড়ো হওয়ার পর থেকেই তিনি ভাবতে শুরু করেন, কীভাবে এত সুন্দর সবুজ, দৃষ্টিনন্দন একটি জায়গাকে মানুষের ভালোর জন্য ব্যবহার করা যায়। “আমার মনে হয়েছিলো, যদি এখানে মানুষ খারাপ কাজের জন্য একত্রিত হতে পারে, তবে এখানে মানুষকে ভালো কাজের জন্যেও একত্রিত করা সম্ভব।”– এই কথা বলার সময় নিমেশ লামার চোখমুখ থেকে ঝরে পড়ছিলো তৃপ্তি আর আনন্দ। তিনি বললেন, “আমি যেহেতু নিজে বই পড়তে খুব ভালোবাসি, তাই এখানে লাইব্রেরি তৈরি করার কথাটাই প্রথমে মাথায় এসেছিলো।” লামার প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো মানুষের মধ্যে বইপড়া আর জ্ঞানচর্চার অভ্যেস গড়ে তোলা। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটা জায়গা গড়ে তুলতে, যেখানে সমাজের সব ধরনের, সব শ্রেণির মানুষ এসে নিজের পছন্দের বিষয়ে চর্চা করতে পারে।

এই হল ওপেন এয়ার লাইব্রেরি ইকোস্ফিয়ার (Open Air Library Ecosphere) জন্মের ইতিহাস। আলিপুরদুয়ারের লাইব্রেরিটি সত্যিই অভিনব। গড়ে উঠেছে ঐ বিশাল গাছটির চারিদিকে। গাছটির চারিদিকে কাঠের তৈরি ছোটো ছোটো অনেকগুলো বইয়ের তাক একটা
দড়ি দিয়ে বেঁধে আটকানো হয়েছে। বইগুলো রাখা থাকে সেই তাকগুলোর ওপরে। পুরো ব্যাপারটাই খুবই দৃষ্টিনন্দন। তাঁর আরেকটি উদ্যোগ হল সানডে আর্ট হাট (Sunday Art Haat)। তাঁর কথায়, “এটি প্রতি রবিবার একটা ফাঁকা জায়গায় অনুষ্ঠিত হয়। যে কেউ এখানে এসে নিজেদের পছন্দের যে কোনো সৃষ্টিশীল কাজ অভ্যাস করতে পারেন। আমি মনে করি, ‘practice makes a man perfect.’ যিনি যত ভুল করবেন, তিনি তত বেশি শিখবেন। তাই কোনও কাজে কেউ ভুল করলে তাঁকে দ্বিগুণ উৎসাহ দিই আমরা, চেষ্টা করি সেই ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে। এতে করে তাঁদের মনের ভয়ও কেটে যায় আর তাঁরা সর্বসমক্ষে নিজেদের প্রমাণ করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। কারোর যদি কবিতা লেখার অভ্যেস থাকে, তিনি এখানে এসে স্বরচিত কবিতা পাঠ করতে পারেন। যিনি গান গান, তিনি গান গাইতে পারেন, ইত্যাদি। এর মাধ্যমে সবাই একে অন্যের সঙ্গে একটা ভালো সময় কাটান আর একইসঙ্গে বাড়ে মানুষে-মানুষে পরিচিতি আর চলে শিল্পকলা ও জ্ঞানের আদানপ্রদান।”

নিমেশ লামার গ্রামের নাম বাইশধুরা। তিনি ২০২১ সালে গ্র্যাজুয়েশন পাশ করেন এবং এখন বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর লক্ষ্য একজন সরকারি আমলা হয়ে সমাজের উন্নতির জন্যে কাজ করা। তাঁর দলের সমস্ত সদস্যই হয় তাঁর সমবয়সী বা তাঁর থেকে একটু ছোটো। এলাকার সাধারণ মানুষ, নিমেশ লামার প্রতিবেশীরাও তাঁর এই কর্মকাণ্ডের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। পাড়া-প্রতিবেশীরা জানালেন, লামার জন্যেই এই এলাকাটি ঐসব দুষ্কৃতীদের থেকে মুক্ত হয়েছে। তবে লামা নিজে এই কথাটা মানতে চাইলেন না। তাঁর বক্তব্য, “আমি বা আমার দলের ৩-৪ জনের পক্ষে ঐ দুষ্কৃতিদের হটানো সম্ভব ছিলো না। আমরা বরং এলাকাবাসীদের জন্য কিছু গঠনমূলক কাজ করতে চেয়েছিলাম। শুরুর দিকে ঐসব দুষ্কৃতিরা ঝামেলা করার চেষ্টা করেছিলো বটে, তবে গ্রামবাসীরা শুরু থেকেই আমাদের পাশে ছিলেন। ধীরে ধীরে দুষ্কৃতীদের উপদ্রব কমে আসে, এবং তারপর এখানে জুয়া খেলা বা নেশা করা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সবথেকে আশ্চর্যজনক ভাবে সুন্দর ঘটনা হল এই যে, তাদের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরাও এখন আমাদের সানডে আর্ট হাটে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে। আমাদের লাইব্রেরিতেও আসে নিয়মিত।”

সানডে আর্ট হাট শুরু হয় প্রতি রবিবার সকাল ১১টায় আর চলে দুপুর ২টো পর্যন্ত। যাঁরা এই আর্ট হাটে অংশগ্রহণ করেন, তাঁরা সুযোগ পান রিডিং সেশনে অংশগ্রহণ করারও। যদি কেউ কোনো বই বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পড়তে চান, তিনি বিনামূল্যেই নিতে পারেন। শুধু তাঁকে সেই বইটি পরের সপ্তাহে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। লামা জানালেন, এতে মানুষের দায়িত্ববোধ সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। বোঝা যায় তিনি বইটির প্রতি যত্নশীল কি না আর নিজের প্রতিশ্রুতি ও দায়িত্বের প্রতি সচেতন কি না।

৫-৬ বছর বয়সী থেকে ৩০-৩৫ বছর বয়সী, সব ধরনের মানুষ আসেন এই লাইব্রেরিতে। কিছু বয়স্ক মানুষ অংশগ্রহণ করেন আর্ট হাটেও। লামা বললেন, “প্রতি রবিবার প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন এই হাটে অংশ নেন। আমাদের পাশের এলাকার মানুষেরাও আমাদেরকে আবেদন করেছেন সেখানেও একটি ‘ইকোস্ফিয়ার’ খুলতে। সেই অঞ্চলেও একটি বড়ো গাছ আছে আর সেখানেও চলে নিয়মিত জুয়া খেলা ও ড্রাগসেবন। কিন্তু আমরা যেহেতু নিজেরা ছাত্র, আমাদের কাছে খুব বেশি বইয়ের জোগান নেই। আমরা নিজেদের হাতখরচা থেকে বই কিনে এই লাইব্রেরি তৈরি করেছি। আমরা তাঁদের জানিয়েছি, যদি সম্ভব হয়, তাহলে পরে আমরা এই ব্যাপারে নিশ্চয়ই উদ্যোগী হব। তাঁরা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে নিজেদের এলাকায় এই ধরনের লাইব্রেরি খুলতে পারেন। আমরা তাঁদের নিশ্চয়ই সহায়তা করবো।”

নিমেশ লামার ইচ্ছে একটি স্থায়ী লাইব্রেরি খোলার। “এই লাইব্রেরিটি সপ্তাহের সোম থেকে শনিবার পর্যন্ত খোলা থাকবে। আর রবিবার আয়োজিত হবে সানডে আর্ট হাট।”– নিজের স্বপ্নের কথা জানাচ্ছিলেন নিমেশ লামা।
