১৮ বছরের রাহিলার ‘লাইব্রেরি’ বদলে দিচ্ছে গ্রামের জীবন

২০২০ সালের জুলাই মাসে শুরু হয় ‘আশিনা গ্রামীণ গ্রন্থাগার’

“একজনের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়ে, একজনের জীবন পাল্টে দেওয়া যায়

অনেকের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়ে, পুরো পৃথিবীটা পাল্টে দেওয়া যায়”

-রাহিলা খাতুন

কলকাতা থেকে মাত্র ৫০ কিমি দূরে, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ফলতার ছোট্ট গ্রাম- আশিনা। গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই জরির কারিগর, দর্জি নয়তো কৃষক। সেখানকার বেশিরভাগ মানুষকেই জীবিকার তাগিদে অন্যান্য রাজ্যে কাজ করতে যেতে হত, কিন্তু গতবছর কোভিড-১৯ হঠাৎ করেই সবকিছু পাল্টে দেয়। অনেক গ্রামবাসী কাজ হারিয়ে তাঁদের কর্মস্থলে আটকে পড়েন। দেশজুড়ে যখন লকডাউন ঘোষণা করা হয়, গ্রামবাসী রাজ্জাক শেখ তখন হায়দরাবাদে। আশিনায় ফিরে আসার জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, নবম শ্রেণী অবধি পড়াশোনা করা রাজ্জাক সিদ্ধান্ত নেন সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর গ্রামের অসহায় বাসিন্দাদের জন্য সাহায্যের আবেদন করবেন। প্রিয়ম বসু এবং জ্যোতিষ্ক দাস, এই দুই ব্যক্তি তাত্ক্ষণিকভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন এবং গ্রামে নিয়মিত রেশনের জোগান দিতে থাকেন।

গ্রামবাসীদের অন্য কোনও সাহায্যের দরকার আছে কি না, সে বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে নবাসন তুষ্টুচরণ হাই স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী রাহিলা খাতুনের সঙ্গে তাঁদের আলাপ হয়। লকডাউনের জেরে গ্রামের শিশুদের লেখাপড়ার উপর যে প্রভাব পড়েছিল তা নিয়ে চিন্তায় ছিল রাহিলা। এমনকি সে তার চাচা রাজ্জাক শেখ, হাসান শেখ এবং আসগর আলীর সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা বলে। তারপর, জ্যোতিষ্ক এবং প্রিয়মকে অনুরোধ করে, যেন তাঁরা স্কুলের পাঠ্যবই সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় বই জোগানের ব্যবস্থা করেন যাতে গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারে। রাহিলার সেই অনুরোধে তাঁরা দুজনেই খুব আনন্দিত হন, এবং বন্ধুবান্ধব-পরিচিতদের সাহায্যে সাধ্যমত পাঠ্যবইও জোগাড় করে ফেলেন।

বই তো চলে এল। এবার? রাহিলাকে ভাবতে হয় বইগুলো সে কীভাবে কাজে লাগাবে। জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রেই রাহিলার শক্তির স্তম্ভ তার মা ফাতেমা বিবি। সে তার মায়ের কাছে পরামর্শ চায়। ফাতেমাহ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পেরেছিলেন, রাহিলার বাবা মোয়েসদ্দিন শেখের সঙ্গে বিয়ের পরেই তাঁকে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে দিতে হয়। তিন সন্তানের মধ্যে তাঁর বড় ছেলে কাজ খুঁজতে দুবাই পাড়ি দেন এবং লকডাউন হওয়ার পর সেখানেই আটকে পড়েন। মেয়ে রাহিলা মাখনা হাই স্কুল থকে খুব ভালো ভাবে মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়ে এখন মানবিকবিদ্যা (হিউম্যানিটিজ) নিয়ে পড়াশোনা করছে।

রাহিলা যখন বইগুলো কোথায় রাখবে বুঝে উঠতে পারছিল না, তখন ফাতেমা রাহিলার বাবার সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেন, তাঁদের এক চিলতে বাড়ির দুটো ঘরের মধ্যে একটা ঘর ছেড়ে দেবেন তাঁরা। এভাবেই ২০২০ সালের জুলাই মাসে শুরু হয় ‘আশিনা গ্রামীণ গ্রন্থাগার’। ছোট্ট একটা ঘর পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ভাগাভাগি করে থাকাতে কোনও আফসোস হয় না রাহিলার পরিবারের। আর ঠিক এই কারণেই রাহিলা তার সমস্ত আত্মবিশ্বাসের জন্য মা’কে কৃতিত্ব দেয়।আমাদের (বঙ্গদর্শন এবং গেটবেঙ্গল) সঙ্গে সরাসরি কথা বলে রাহিলা, তার কথায়, “আমরা চাইছিলাম স্কুলছুটদের আবার পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনতে। যেটা বর্তমানে সবথেকে জরুরী একটা কাজ। আমরা দাঁতে দাঁত চেপে সেই লড়াইটাই করে চলেছি। এখানকার কিছু বাচ্চা আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে স্কুল ছেড়ে দেয়–স্মার্টফোন বা অন্য কোনো উপায়েই অনলাইনে ক্লাস করতে পারেনি। এমনকি পড়ার বইয়ের জন্যেও তারা স্কুলের উপর নির্ভরশীল।”

উপযুক্ত গাইডেন্স ছাড়া শুধু বই বিলি করলে গ্রন্থাগারটি যে কোনও উপকারে আসবে না, তা ভালোই বুঝতে পেরেছিল রাহিলা ও তার বন্ধুরা। যাঁরা শিক্ষিত ব্যক্তি, কলেজ পড়ুয়া বা যারা প্রাইভেট টিউশন পড়ান, সারা গ্রামে ঘুরে ঘুরে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে গ্রন্থাগারে সাপ্তাহিক ক্লাস করানোর প্রস্তাব দেয় রাহিলারা।গ্রন্থাগার পরিচালনার জন্য কোর কমিটি তৈরি হয়। সেই কমিটিতে রাহিলাসহ ১১ জন সদস্য রয়েছেন। রুনা খাতুন (যে অধ্যাপক হতে চায়) গ্রন্থাগারের ইনচার্জ। গ্রন্থাগারের নিয়মিত শিক্ষক স্নাতকের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী অর্জিনা খাতুন। বেশিরভাগ বই স্কুলপাঠ্য। গল্পের বই রয়েছে পাঁচটি। সপ্তাহে চার দিন নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর জন্য কোচিং ক্লাসেরও ব্যবস্থা রয়েছে। স্কুলছুট এবং সাধারন ছাত্রছাত্রী মিলিয়ে প্রায় ২০ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে। খাতা, পেন, পেনসিল সবই বিনামূল্যে দেওয়া হয়। প্রত্যেকেই কোঠরভাবে কোভিড-১৯ বিধিনিষেধ অনুসরণ করে চলে। মাস্ক পরে, সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে তবেই গ্রন্থাগারে ঢোকে প্রত্যেকে।রাহিলা স্পষ্টতই বুঝতে পেরেছে যে কেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষকে শিক্ষার আলোয় আনার চেষ্টা চলছে – শিক্ষা সমাজের মেরুদণ্ড। বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য তার পরিবারের আর্থিক সঙ্গতি নাই থাকতে পারে, তবুও জেনারেল নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি পড়াশোনার জন্য বদ্ধপরিকর সে। তার মা ফাতেমা বিবিও সমানভাবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে তাঁর মেয়েকে আরও পড়াশোনা করতে হবে। “আমি চাই না শুধুমাত্র মেয়ে হয়ে জন্মেছে বলে আমার মেয়ে জীবনে পিছিয়ে পড়ুক। ওকে আরো পড়াশোনা করতে হবে। একটা ছেলের সমতুল্য হয়ে কাজ করতে হবে।” জোর দিয়ে বলেন ফতেমা।

রাহিলার ‘লাইব্রেরি’ এখন গ্রামের মানুষের কাছে আশার আলো। আশেপাশের গ্রাম থেকেও শিক্ষার্থীরা গ্রন্থাগারে ঢুঁ মারতে শুরু করেছে। রাহিলার কথায়, “গ্রন্থাগারে এখন প্রায় ২০০ জন সদস্য। গ্রন্থাগারটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমি আশাবাদী, শুধু সাহায্য আর সমর্থনের অপেক্ষা করছি।”

Developed by DXDasia