
অক্ষরের সঙ্গে সুরের জগতে উত্তরণ
কলের গান চালাচ্ছেন চন্দন চট্টোপাধ্যায়, সম্পাদক, রামমোহন লাইব্রেরি
কলকাতার সুকিয়া স্ট্রিটের রামমোহন লাইব্রেরির (Rammohun Library and Free Reading Room) ‘কার্ল এরিখ হামেরগ্রেন মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’ (Karl eric hammergren)-এ গেলে এখন শোনা যাবে গওহর জান, আঙুরবালা, বিনোদিনী দাসী, শিশির ভাদুড়ির কণ্ঠস্বর। হারিয়ে যাওয়া কলের গানে, ৭৮ আরএমপি-র কালো রেকর্ডে বেজে উঠবে রবীন্দ্রনাথের গলায়, “তবু মনে রেখ” গান অথবা “আমি যখন বাবার মত হবো” কবিতা। শোনা যাবে, রবীন্দ্রনাথের ১০০তম জন্মজয়ন্তীতে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গাওয়া রবীন্দ্রনাথের গান, ”বিশ্ব যখন নিদ্রামগন গগন অন্ধকার” বা “নিশিথ প্রাণের দেবতা”। পাশ্চাত্য সংগীতে যাঁদের আগ্রহ আছে তাঁরা শুনতে পারবেন মোৎজার্টের 25th সিম্ফনি অথবা পল রোবসনের নিজের গাওয়া গান। বিস্ময় লাগছে? নিশ্চয়ই ভাবছেন, লাইব্রেরিতে বইয়ের বদলে হঠাৎ গান কেন? আসলে, কলকাতার মতো এমন বৈচিত্রের শহরে এরকম অনেক ঘটনাই অহরহ ঘটে চলে, কিছু আমরা জানতে পারি, কিছু পারি না।


কার্ল এরিখ হামেরগ্রেন, লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা। এনার নামেই কার্ল এরিখ হামেরগ্রেন মেমোরিয়াল মিউজিয়াম, এখানেই ১৭৫০টি রেকর্ড রাখা আছে
গান শোনার নয়, পুরোনো রেকর্ড আজ গবেষণা ও সংগ্রহের বিষয়। বিশ্ব সংগীতের পরম্পরা চর্চার পাশাপাশি গবেষণার দিকটিও উন্মোচন করলো রামমোহন লাইব্রেরি।
১৯২৫ থেকে ১৯৬০ এই সময়ের গান যদি এখনকার প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা শুনতে চায়, তাহলে তারা সোম থেকে শনি, যে কোনও দিন হাজির হতেই পারে রামমোহন লাইব্রেরিতে। সেখানকার ‘কার্ল এরিখ হামেরগ্রেন মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’-এ অপেক্ষা করে আছে ফেলে আসা সময়ের গানবাজনার অপার বিস্ময়। কার্ল এরিখ হ্যামার গ্রিনের উদ্যোগেই ১৯০৪ সালে গড়ে উঠেছিল সুকিয়া স্ট্রিটের রামমোহন লাইব্রেরি। আর ২০২৩-এর ২৪ ফেব্রুয়ারি এই লাইব্রেরির একটি তলে জন্ম নিয়েছে ‘কার্ল এরিখ হামেরগ্রেন মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’। রয়েছে বাংলা গান সহ সারা বিশ্বের সংগীত-সম্ভার। ১৭৫০টি ৭৮ আরএমপি, এলপি, ইপি, এসপি রেকর্ড নিয়ে তৈরি হয়েছে এই মিউজিক লাইব্রেরি বা মিউজিয়াম। রেকর্ড শোনানোর জন্য রাখা হয়েছে ইংল্যান্ডে তৈরি, শতবর্ষ পুরোনো এমন গ্রামোফোন, যা হাতে চালাতে হয়। আছে আর একটি বিদ্যুৎচালিত গ্রামোফোনও। ২০০২ সালে এ দেশের রেকর্ড সংস্কৃতি শতবর্ষ পেরিয়েছে। গান শোনা নয়, পুরোনো রেকর্ড আজ গবেষণা ও সংগ্রহের বিষয়। বিশ্ব সংগীতের পরম্পরা চর্চার পাশাপাশি গবেষণার দিকটিও উন্মোচন করলো রামমোহন লাইব্রেরি।

গওহরজান, বিনোদিনী দাসী, রবীন্দ্রনাথ ও মোৎজার্টের ২৫তম সিম্ফনি রেকর্ড

রামমোহনের ব্যবহার করা রিভলভিং অ্যান্ড রাউন্ড টেবিলে রেকর্ড ও কলের গান রাখা
শচিন দেব বর্মন, পংকজ মল্লিক, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, অখিলবন্ধু ঘোষ, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, প্রতিমা বন্দ্যেপাধ্যায়, শিপ্রা বসু, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়রা যেমন আমাদের উপহার দিয়েছেন অমূল্য সব গান তেমনই এই কলকাতাতেই ৭০-এর দশকে মহীনের ঘোড়াগুলির আত্মপ্রকাশ, তারপর নগর ফিলোমেল থেকে ফসিলস, ফকিরা, বর্ণ অনন্য –এপর্যন্ত জন্ম নিয়েছে অসংখ্য বাংলা গানের দল। এই শহরে সব সুর, সব গানই সবসময় নিজের মতো করে জায়গা করে নিয়েছে।
কমল দাশগুপ্ত, রবীন মজুমদার, সত্য চৌধুরির নাম এখন ক’জন জানেন? ক’জনই বা জানেন সলিল চৌধুরী “এবার আমি আমার থেকে আমাকে বাদ দিয়ে” গানটি লতা মঙ্গেশকর ছাড়াও শচিন গুপ্তকে দিয়ে গাইয়েছিলেন? পণ্ডিত ওঙ্কারনাথের গাওয়া “বন্দে মাতরম”-এর প্রথম রেকর্ড এই মিউজিয়ামে আছে। আছে শচিনদেব বর্মনের হিন্দি ভজন, যা এখন দুস্প্রাপ্য। এই বিপুল পরিমাণ রেকর্ড ও কলের গান নিয়ে কার্ল এরিখ হামেরগ্রেনের নামে মিউজিয়াম তৈরির ভাবনা এলো কত্থেকে? কীভাবেই বা একটি ফ্রি রিডিংরুম লাইব্রেরির সঙ্গে বিপুল সংখ্যক রেকর্ড, কলের গান এবং আধুনিক রেকর্ড প্লেয়ার রেখে মানুষকে হারিয়ে যাওয়া গান, কবিতা শোনাবার উদ্যোগ শুরু হল, এবার সেই বিষয়ে আসা যাক।
চন্দনকুমার চট্টোপাধ্যায়। ইনি হলেন রামমোহন লাইব্রেরির সম্পাদক। এই চন্দনবাবুই সন্তান স্নেহে আগলে রেখেছেন এই কার্ল এরিখ হ্যামার গ্রিন মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের ১৭৫০টি রেকর্ড, একটি কলের গান ও একটি আধুনিক রেকর্ড প্লেয়ারকে। তাঁকে যখন এই মিউজিয়ামে বসে প্রশ্ন করছিলাম, কেমন করে একটা লাইব্রেরিতে এরকম একটা মিউজিক্যাল মিউজিয়াম গড়ে তুললেন?

“২০২৩-এর ২০ ফেব্রুয়ারি আমরা ঠিক করলাম, ২৪ ফেব্রুয়ারিই জনসাধারণের খুলে দেওয়া হবে এই মিউজিয়াম, হলও তাই।” বলছিলেন চন্দনবাবু। আসলে কোনও ভালো কাজ বাস্তবায়নে বিশেষ সময় লাগে না, তার উপর যদি সেই কাজকে বাস্তবায়িত করার উপকরণ হাতের সামনেই থাকে, এ ক্ষেত্রেও তাই হল। “২০১৯ সালে ভাটপাড়ার বাসিন্দা প্রয়াত অজিত ভট্টাচার্যের ভাই রবীন ভট্টাচার্য আমাদের লাইব্রেরিতে তাঁর সংগ্রহের মোট ১২০০ রেকর্ড দান করেন। নৈহাটির সাহানা চট্টোপাধ্যায় দেন ৫৫০টি রেকর্ড। এরমধ্যে ৭৮, ৪৫, ৩৩ আরএমপি মিলিয়ে মোট ১৭৫০টি রেকর্ড আছে। আমি নিজে ভালো করে সার্ফ দিয়ে ধুয়ে, তোলায়ে দিয়ে মুছে পরিষ্কার করেছি এই রেকর্ডগুলো। এখন শিল্পীদের নাম ধরে বর্ণানুক্রমিক ক্যাটালগ তৈরি করছি”, একটানা বলে যান চন্দনবাবু। কথা বলতে বলতেই হাতে একের পর এক রেকর্ড তুলে নিয়ে আপন মনে বলে যাচ্ছিলেন, “এটা আঙুরবালার, এটা কবি নজরুলের গলায় ‘রবিহারা’ কবিতা পাঠ, এটা বিনোদিনী দাসীর, এটা শিশির ভাদুড়ির, এটা রবীন্দ্রনাথের। ভাবা যায়, ছুঁলেও শিহরণ হয়! কেউ যদি রেকর্ড দিতে চান, তিনি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।”

মিউজিয়ামে বসে সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিত মিত্র
রামমোহন লাইব্রেরির পরিচালন পর্ষদই কার্ল এরিখ হামেরগ্রেন মেমোরিয়াল মিউজিয়ামটি পরিচালনা করছে। লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিত মিত্র জানালেন, “আমরা চাই এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বাংলা সংগীতের শিকড়ের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করুক। তাই আমরা এই মিউজিক্যাল মিউজিয়ামটা করেছি। এখানে ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন দুপুর ২টো থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত যে কেউ এসে বিনা খরচে নিজের পছন্দের গান বাছাই করে কলের গানে বাজিয়ে শুনতে পারবেন। কেউ যদি তাঁর সংগ্রহে থাকা রেকর্ড দান করতে চান তা হলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেই হবে। আমরা কাউকে জোর করছি না। আমরা শুধু এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের বলছি, আপনার আসুন, বাংলা সংগীত, বাংলার সংগীতের আদিধারার সঙ্গে পরিচিত হয়ে যান।” কেউ যদি বাংলা গানের ক্রমবিবর্তন নিয়ে গবেষণা করতে চান, তিনি রামমোহন লাইব্রেরির এই মিউজিয়ামে এলে অবশ্যই সমৃদ্ধ হনেন। “আগামী দিনে এই লাইব্রেরির চার তলায় গড়ে উঠতে চলেছে সম্পূর্ণ আলাদা একটি পুরোনো রেকর্ডের আর্কাইভ”, জানালেন সঞ্জিত মিত্র।

পরম যত্নে, সন্তান স্নেহে তাকে রেকর্ড সাজিয়ে রাখছেন চন্দনবাবু
সঞ্জিতবাবুর সঙ্গে যখন কথা বলছি তখন একমনে সন্তান স্নেহে রেকর্ডগুলোকে বর্ণানুক্রমে সাজিয়ে রাখার কাজ করে চলেছেন চন্দনবাবু। মিউজিয়ামের যে রিভলভিং অ্যান্ড রাউন্ড টেবিলটিতে ছড়িয়ে ছিল রেকর্ডগুলো, সেই টেবিলটিতে বসেই এক সময় বই পড়া ও লেখালেখির কাজ করতেন রাজা রামমোহন রায়, যাঁর নামে এই লাইব্রেরি। “এই মিউজিয়ামে এলে হারিয়ে যাওয়া দিন খুঁজে পাওয়া যাবেই, এটা নিশ্চিত।” রেকর্ড গুছোতে গুছোতে বলেন চন্দনবাবু।
________
ছবি: শিবপ্রিয় দাশগুপ্ত
