ঘোড়ায় টানা ট্রাম চলার ১৫০ বছর পূর্তি হবে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি
রবি ঠাকুর স্বপ্ন দেখেছিলেন, “কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে।” মফস্সলের প্রাইমারি স্কুলের ক্লাস থ্রির বেঞ্চে বসে একদিন গালে হাত দিয়ে আমিও ভেবেছিলাম, কলিকাতা বুঝি নড়ে চড়েই চলে। ততদিনে বাবার অসুখ জোরালো হয়েছে। কালীঘাটে নার্সিংহোমে বাবা ভর্তি। বাবাকে মফস্সলের সেই ভাড়া বাড়ি থেকে মায়ের হাত ধরে দেখতে আসতাম। বেহালায় মামাবাড়ি থেকে ট্রামে চাপতাম। সেই ঘণ্টি বাজলে ট্রাম নড়ে নড়ে চলা শুরু করত। ছোটো ছোটো আঙুল দিয়ে মায়ের হাতে জোরে চাপ দিতাম। আমার একখানা অন্য অনুভূতির সন্ধান মা টের পেত কিনা জানতাম না। শিউরে উঠতাম। মনে হত, “রাস্তা চলেছে যত অজগর সাপ,/ পিঠে তার ট্রামগাড়ি পড়ে ধুপ ধাপ।” কালীঘাটে ট্রাম থেকে নেমে মায়ের হাত ধরে নার্সিংহোমে যেতাম। ফিরতাম আবার ট্রামে। শহরটাকে ট্রামের জানলায় বসে দেখতাম। ধীর গতিতে সরে সরে যেত পথ ঘাট, দোকানদানি। লাইন ঘষে ঘষে চলতে চলতে মনে হত, বাবা অনেক দূরে আছে। কোনোদিন কি আমরা একসঙ্গে থাকতে পারব? আমার বাবা কবিতা লিখত। সে সব কি আবার বাবা লিখতে পারবে?
তারপর বহু বছর কেটে গেছে। আমার শৈশব পার হয়ে গেল আর তার বহু আগে বাবা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। কিন্তু আমার স্মৃতিতে ট্রাম কেমন জবর দখল করে নিল। কলেজের বেঞ্চে বসে একদিন আমার মাকে লাবণ্যপ্রভা দাশ মনে হল। বাবাকে জীবনানন্দ। হাতের সামনে বইয়ের পাতায় তখন,
“কলকাতার ফুটপাত থেকে ফুটপাতে— ফুটপাত থেকে ফুটপাতে—
কয়েকটি আদিম সর্পিনী সহোদরার মতো এই যে ট্রামের লাইন ছড়িয়ে আছে
পায়ের তলে, সমস্ত শরীরের রক্তে এদের বিষাক্ত বিস্বাদ স্পর্শ অনুভব
করে হাঁটছি আমি…”

উত্তাল সত্তরের দশক ও কলকাতা ট্রাম
কৈশোরে আমি মনে মনে কতবার মায়ের হাত ধরে কালীঘাটে নেমেছি। ট্রাম ঘণ্টি বাজিয়ে ঘষে ঘষে টেনে টেনে বাইবেলের ‘সার্পেন্ট’ সুলভ শরীরটাকে নিয়ে কত সহজেই চোখের আড়াল হয়ে যেত। সেই ‘সার্পেন্ট’ আমাকে কতদিন অবশ করে রেখেছিল। তারপর ঘোর কাটল এ শহরে এসেই। ততদিনে শহর অনেক বদলে গেছে। বেহালায় ট্রামের হদিশ নেই। বরং মেট্রো আসবে বলে প্রতীক্ষার উদ্বেগ শুরু! কালীঘাটে আর ট্রাম নেই। কত নিভৃতচারী প্রেমিক-প্রেমিকা শেষ ট্রামের জন্য মেট্রোর ভিড় প্রত্যাখ্যান করে অপেক্ষায় থেকে গেছে। কত কত রুটের ট্রাম চলবে বলে আর চলেনি।
আরও পড়ুন: ট্রাম মিউজিয়াম ও নতুন আড্ডা জোন
তথ্যের দাবি, ২০১৭ সালেও শহরের ২৫টির বেশি রুটে ট্রাম পরিষেবা চালু ছিল। দুর্ঘটনা আর যানজটের দোহাই দিয়ে ধীরে ধীরে সেই সব রুট বন্ধ হয়েছে। এই মুহূর্তে কলকাতায় মাত্র দুটি রুটে ট্রাম চলাচল করছে। হয়তো জীবনানন্দ বেঁচে থাকলে বলতেন, এ শহর আমি চিনি না!
২০১৭ সালেও শহরের ২৫টির বেশি রুটে ট্রাম পরিষেবা চালু ছিল। দুর্ঘটনা আর যানজটের দোহাই দিয়ে ধীরে ধীরে সেই সব রুট বন্ধ হয়েছে। এই মুহূর্তে কলকাতায় মাত্র দুটি রুটে ট্রাম চলাচল করছে।

নব্বইয়ের দশক ও কলকাতার ট্রাম
কলকাতা শহর চিনতে গেলে অনেক কিছুর মতো ট্রামও চিনতে হয়। ঔপনিবেশিক শাসনের সময় থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে কেবল কলকাতা আর মেলবোর্ন শহরেই ট্রাম একটানা চলেছে কোনো বিরতি ছাড়াই। ইতিহাস বলে, ১৮৭৩ সালে এশিয়ার প্রাচীনতম এবং ভারতের প্রথম ট্রাম পরিষেবা চালু হয়েছিল এ শহরের বুকেই। দ্য ক্যালকাটা ট্রাম কোম্পানি আজ আর নেই, যা শুরু হয়েছিল ১৮৮০ সালের ডিসেম্বরে, লন্ডনে।
স্বাধীনতার সমসাময়িক ভারতের অন্যান্য শহরগুলি থেকে ধীরে ধীরে ট্রাম যখন উবে যায়, তখন কেবল ট্রাম টিকে থাকে কলকাতায়। কম খরচে নিম্নব্যয়ের যান হিসেবে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের কাছের পরিবহন হয়ে উঠেছিল ট্রাম। ফলে একদা কলকাতার সিগনেচার টিউন ছিল দুকামরার ট্রামের ঘড়ঘড় শব্দ। আর টুং টুং ঘণ্টাধ্বনি ছিল শহরের চেনা শব্দ। গতি, ব্যস্ততার কাছে হার মেনে সেইসব শব্দ এখন কোণঠাসা। শেঠ-বসাক-সাবর্ণদের শহরে বাইক, মেট্রো, অটো, ক্যাবের ভিড়ে ট্রাম ব্রাত্য! অথচ গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর দাপটে বিশ্বের উন্নত দেশগুলি যখন ট্রাম চলার গুরুত্ব স্বীকার করছে, তখন কলকাতা ক্ষতবিক্ষত হয়েছে হয়েছে ট্রাম হারানোর যন্ত্রণায়। পরিবেশপ্রেমীদের সংগঠনগুলি বারবার কলকাতা ট্রাম-এর সপক্ষে কথা বলেছে। তবুও ট্রাম যেন মহানগরীর বুকে চলমান বোঝার মতো মনে হচ্ছিল। ট্রাম তুলে দেওয়ার যুক্তি সাজানো হচ্ছিল প্রতিনিয়ত। তখনই নীরব, অবহেলিত ট্রামের কথা বলার জন্য তৈরি হল ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার্স এসোসিয়েশন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে কিছু সমমনস্ক পরিবেশপ্রেমী মানুষ এই সংগঠন তৈরি করেন।

কলকাতা ট্রামের শতবর্ষে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপন
জব চার্নকের মহানগরী যখন তরতর করে সীমাহীন উন্নতির সাপেক্ষে শব্দ আর বায়ুদূষণে এগিয়ে চলেছে, তখন দূষণের ধোঁয়াশায় অলক্ষ্যে এসে দাঁড়িয়েছে ট্রামের ১৫০ বছর। ঘোড়ায় টানা ট্রাম চলার ১৫০ বছর পূর্তি হবে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি। ডাব্লুবিটিসি (ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন), সিটিসি (ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি)-র সহযোগিতায় এবার ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার্স এসোসিয়েশন ট্রামযাত্রা ২০২৩ উৎসব পালন করছে।
ঘোড়ায় টানা ট্রাম চলার ১৫০ বছর পূর্তি হবে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি। ডাব্লুবিটিসি ও সিটিসি-র সহযোগিতায় এবার ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার্স এসোসিয়েশন ট্রামযাত্রা ২০২৩ উৎসব পালন করছে।
এদিন মেলবোর্ন শহরের অন্যতম ট্রাম কন্ডাক্টর রবার্তো ডি’আন্দ্রিয়া শহরে উপস্থিত থাকবেন। ডাব্লুবিটিসি-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজনভীর সিং কাপুরের পক্ষ থেকে জানা যায়, ট্রাম কলকাতার ঐতিহ্য। এখনও ট্র্যাক-সহ প্রায় ৩০ টি রুট রয়েছে। যার মধ্যে চলমান মাত্র দুটি রুট। সেগুলি হল রুট নম্বর ২৫ (গড়িয়াহাট-এসপ্ল্যানেড) এবং ২৪/২৯ (টালিগঞ্জ-বালিগঞ্জ)। তিনি আরও জানান, খুব তাড়াতাড়ি আমরা এসপ্ল্যানেডে একটি ঐহিত্যবাহী ট্রাম লাইন তৈরি করতে চলেছি, যা ময়দান পর্যন্ত চক্কর কাটবে। এছাড়াও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রামে বিনামূল্যে ওয়াইফাই চালু করা হয়েছে, যাতে অল্পবয়সী নাগরিকরাও ট্রামকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে শুরু করে।
কেবল হেরিটেজ নয়, ট্রাম চলার পক্ষে যুক্তি তৈরি করতে বিশ্বের ট্রামপ্রেমী মানুষের বিশুদ্ধ আয়োজন এই ট্রামযাত্রা। ট্রামযাত্রার অনুষ্ঠান ঢেলে সাজানো হয়েছে ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে। সকাল দশটায় ধর্মতলায় ট্রাম টার্মিনাসে অনুষ্ঠান শুরু হবে। থাকবে নানা মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান। থাকবে শতাব্দীর সেইসব পুরানো ট্রামগুলোর প্রদর্শনী। পরিবেশের সপক্ষে কথা বলতে হাজির হবেন মেলবোর্নের ট্রাম কন্ডাক্টর রবার্তো দি আন্দ্রিয়া সহ জার্মানির ২২ জন ট্রামকর্মী। যাঁরা বলবেন, দূষণ আর ভিড়ে ঠাসা শহরে মানুষের দুদণ্ড জিরিয়ে নেওয়ার জন্য ট্রামের ফিরে আসা চাই! ইতিমধ্যে ১১ ফেব্রুয়ারি ট্রামযাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছে। গড়িয়াহাট ট্রাম ডিপোর ট্রাম ওয়ার্ল্ড ক্যাফেতে সচেতনতা গড়ে তোলার পাশে চলেছে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান।
ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার্স এসোসিয়েশন সংস্থার তরফে সাগ্নিক গুপ্ত বঙ্গদর্শন.কমকে বলেন, "মানুষের আবারও ভাবার সময় এসেছে ট্রাম নিয়ে। যেখানে জার্মানি, রাশিয়ার মত দেশে ট্রাম চলছে, উত্তর আফ্রিকার দেশগুলিতে যেখানে ট্রাম নতুনভাবে চালানো হচ্ছে, সেখানে কলকাতার ট্রাম ১৫০ বছরে এসে থেমে যাবে?" বিশেষজ্ঞরা বলছেন ইউনেস্কোর ইন্ডাস্ট্রিয়াল হেরিটেজ তালিকায় স্থান পাওয়ার যোগ্যতা ট্রামের আছে। ট্রামযাত্রা সাফল্যমন্ডিত করুক সে সব আশা। কথা হচ্ছিল গড়িয়াহাটের আইটি কর্মী বছর ৩৫-এর স্বপ্না বসাকের সঙ্গে। ট্রাম নিয়ে উৎসাহী স্বপ্না বঙ্গদর্শন.কমকে বললেন, "ট্রামে চেপে কলেজস্ট্রিট চত্বরে বা ময়দানে সফর কি ভোলা যায়? আজকাল গাড়ির ধোঁয়ায় কষ্ট হলে ট্রামের কথা ভাবি। সে সময়ে ফিরে যেতে পারলে বেশ হয়।"
অনেকেই চান ট্রাম ফিরে আসুক। তিলোত্তমার বুকে জেগে উঠুক বিগত শতকের নস্ট্যালজিয়া। এসপ্ল্যানেড বা গড়িয়াহাটের ট্রাম মিউজিয়ামে শুধু অস্তিত্ব খোঁজার বদলে, কবিদের কবিতার মত ট্রাম হয়ে উঠুক মানুষের নিত্যসঙ্গী। শহর জুড়ে সর্পিল গতিতে ফিরে এসো ট্রাম।
____
ছবিসূত্র: ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার্স এসোসিয়েশন