কেমো নিতে নিতেই শপথ নিয়েছিলাম, যদি বাঁচি, সারা জীবন ক্যান্সার পেশেন্টদের সঙ্গে থাকব : নন্দিতা

কর্কট বেলার অভিজ্ঞতা লিখছেন ক্যান্সার-জয়ী লেখিকা নন্দিতা আচার্য

সেছিল আমাদের ছোটোবেলা, কেউ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে জানলে, আতঙ্কে সকলের চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে আসা এক পৃথিবীর রূপ ফুটে উঠত। ক্যান্সার, নো আন্সার; এমনই একটা বোধ কাজ করতো। আমার বাড়ির সামনে এক পাড়াতুতো জেঠিমার শাশুড়ি (তিনি আশ্রমবাসী) ক্যান্সার নিয়ে ছেলের বাড়ি এলেন। ঘরবন্দি সেই বৃদ্ধাকে আমি চোখে দেখিনি; কিন্তু মাঝেমাঝেই তাঁর যন্ত্রণার চিৎকার যখন শুনতাম, অসহায় কান্না এসে আঁকড়ে ধরত। কেন এমন কষ্ট! জীবন কী অদ্ভুত; একদিন সেই কষ্টের মুখোমুখি আমিই দাঁড়িয়ে রইলাম।

রোগটা ভেতরে বাড়তে বাড়তে কখন যেন শেষ পর্যায়ে চলে গেছিল; কিছু যে সংকেত দেয়নি, তাও নয়! তবু আহাম্মকের মতো, অন্ধের মতো টলতে টলতে আমি শেষ ভূখণ্ডে গিয়ে পা রাখলাম।

আমার বাড়ির সামনে এক পাড়াতুতো জেঠিমার শাশুড়ি (তিনি আশ্রমবাসী) ক্যান্সার নিয়ে ছেলের বাড়ি এলেন। ঘরবন্দি সেই বৃদ্ধাকে আমি চোখে দেখিনি; কিন্তু মাঝেমাঝেই তাঁর যন্ত্রণার চিৎকার যখন শুনতাম, অসহায় কান্না এসে আঁকড়ে ধরত।

সত্যি কথা বলতে কি, জীবনে কখনও খুব কাছ থেকে কোনো ক্যান্সার রুগীকে দেখিওনি আমি। ডাক্তাররা যখন আমাকে বারবার জিজ্ঞেস করেছেন, বংশে ক্যান্সারের ইতিহাস; তখন বাবা এবং মা, কারুর দিকেই আমি একজন ব্যক্তিকেও খুঁজে পাইনি। আমিই প্রথম।   

খুব অবাক হয়েছিলাম প্রথম শুনে… ক্যান্সার? সে তো অন্যদের হয়; আমার কেন! 

তারপর যখন বুঝলাম, ব্যাপারটা আমারই হয়েছে, বেশ বাড়াবাড়ি রকম; তখন এক তীব্র ভয় আচ্ছন্ন করলো। ছোটোবেলায় শোনা সেই বৃদ্ধার কান্না এসে আমার মাথায় হন্ট করতে লাগল। অদ্ভুত এক অনুভূতি! যেন মাঝ সমুদ্রে কেউ আমাকে বিনা দোষে জাহাজ থেকে ঠেলে ফেলেছে। জলে হাবুডুবু খেতে খেতে দেখছি, জাহাজ ভর্তি আমার আপনজন, আমার বন্ধুবান্ধব, প্রিয় পোষ্যরা; সবাইকে নিয়ে জাহাজ এগিয়ে চলেছে…  আমাকে ফেলে রেখেই!      

ডাক্তারদের চিন্তিত আলোচনার মাঝখানে আমি আচমকা বলে উঠেছিলাম, কেমো নিলে চুল পড়ে যাবে? এখন তো এমন কেমো বেরিয়েছে, যাতে চুল পড়ে না! বড়ো ডাক্তার মুখ তুলে চাইলেন, সরি, আপনার জন্য সে রকম কোনো কেমো নেই। মরিয়া হয়ে প্রায় চেঁচিয়েই উঠি, তাহলে আমার চুলের কী হবে? ডাক্তার চরম বিস্মিত হয়ে ভ্রূ তুলে চান, আপনার কি জীবনের চেয়েও চুলের প্রায়োরিটি বেশি!

থতমত খেয়ে শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটে জিব বুলিয়ে নিই, কেন, আমি কি বাঁচব না! ডাক্তার বলেন, বলেছি কি? আশা আছে নিশ্চয়ই! বাঁই বাঁই করে ‘আশা’ শব্দটা চোখের সামনে ঘুরতে ঘুরতে প্রবল আঘাত করে আমায়। আশা আছে? কেন তিনি বললেন না, বাঁচবেন না মানে? অবশ্যই! 

আমি মরিয়া হয়ে হাতড়ে যেতাম বাঁচার আলো। চব্বিশটা হাই ডোজের কেমো, রেডিয়েশন… বছর পেরিয়ে যায়; ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া শরীরের ভেতর মনটাকে জিইয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চলতো।

দিন গড়িয়ে যায়, একের পর এক কেমো; তোলপাড় যন্ত্রণা, নাকানি চোবানি খাওয়ায়। তারই মধ্যে আমি মরিয়া হয়ে হাতড়ে যেতাম বাঁচার আলো। চব্বিশটা হাই ডোজের কেমো, রেডিয়েশন… বছর পেরিয়ে যায়; ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া শরীরের ভেতর মনটাকে জিইয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চলতো। ওই যে চুলের প্রায়োরিটি, তা কিন্তু আমাকে লজ্জিত করেনি; বরং আমার মধ্যে বিপরীত এক শক্তি গড়ে দিয়েছিল। নিজেকে বোঝাতাম, হুঁ হুঁ, কষ্টটুকু সয়ে নিতে হবে, তারপরেই তো ফিরে আসবে চুল।

নন্দিতা আচার্য এবং ওঁর বই 'দেবদূত ও এলিয়েন'

আশ্চর্যভাবে, সব কিছুর মধ্যেই আমি পজিটিভিটি খুঁজতাম। যে হসপিটালে ঢুকলে এক সময় ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে উঠত, পরবর্তীতে তা-ই হয়ে উঠল আমার বন্ধু রাজ্য। অসংখ্য পেশেন্টের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব; সেই বন্ধুত্বর গণ্ডি প্রসারিত হয় ডাক্তার, সিস্টার, হসপিটাল স্টাফ হয়ে বাইরের অজানা ক্যান্সার পেশেন্টের দুঃখ যন্ত্রণার ছায়াটিকে ছুঁয়ে। 

সত্যি কথা বলতে কি, আমার সেই কঠিন পথ পেরোনোর সমীকরণের আর একটা সূত্র ছিল, এই বন্ধুত্ব। নিজের দুঃখ কষ্ট ভোলার জন্য অন্যের কষ্টের সামিল হয়েছি বারেবারে। শুধু ডাক্তার, ওষুধ নয়; প্রবল মনের জোর দরকার ক্যান্সারকে পরাজিত করার জন্য। আমি সেই জোর সংগ্রহ করেছি অন্যের বেদনার সামিল হয়ে। মনে হয়েছিল, ও যদি এটা পারে, আমি কেন নয়? অথবা আমি যা পারছি, ওকেও সেই পারার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে!

এই বন্ধন ভেতরে এক প্রবল শক্তি তৈরি করেছিল আমার। অসহ্য যন্ত্রণা যখন দাপাদাপি করত, হাঁফাতে হাঁফাতে শোবার ঘরের জানলায় ছড়িয়ে রাখতাম কর্নফ্লেক্স, বিস্কুটের টুকরো; পাখিরা এসে খাবে। জানলার নিচে আমার প্রিয় পোষ্যদের অভিমানী মুখে চলাফেরা। এই যে না-মানুষদের চলন… তা আমাকে কষ্ট ভুলিয়ে দিত। তাদের এনার্জি আমার ভেতর এক উত্তাপ সৃষ্টি করত। এসবই ছিল লড়াইয়ের রসদ। আমি একজন ঔপন্যাসিক; সবসময় ল্যাপটপ থাকতো বালিশের পাশে, লিখতে পারি না পারি। প্রায়ই তাতে লিখতাম, ভালো আছি আমি। মনে মনে  ভেবে রাখতাম, সুস্থ হয়ে কী কী বিষয় নিয়ে আমি লিখব। এই যে শত কষ্টের মধ্যেও আশা জিইয়ে রাখা, এক লাফে তা প্রতিরোধ শক্তি বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি।

শুধু ডাক্তার, ওষুধ নয়; প্রবল মনের জোর দরকার ক্যান্সারকে পরাজিত করার জন্য। আমি সেই জোর সংগ্রহ করেছি অন্যের বেদনার সামিল হয়ে।

আসলে আমরা যখন এ রকম কঠিন অসুখের মধ্যে দিয়ে যাই, প্রথমেই সমাজ এবং কর্ম জগৎ, সঙ্গে নিজস্ব ভালোলাগার জগতের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে, নিজেদের গুটিয়ে নিই। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, যত পারা যায় স্বাভাবিক জীবন যাপনের মধ্যে অবস্থান করা; এতে করে কঠিন জার্নি অনেক সহজ হয়ে যায়। 

সুস্থ হবার পর আমি নিজেকে আরও বিস্তারিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কেমো নিতে নিতেই শপথ নিয়েছিলাম, যদি বাঁচি, সারা জীবন ক্যান্সার পেশেন্টদের সঙ্গে থাকব। এককভাবে সে কাজ আমি এখনও করে যাচ্ছি।

Developed by DXDasia