২৪টি কেমো নিয়েও নতুনভাবে বাঁচতে শেখাচ্ছেন নন্দিতা

নন্দিতার চিকিৎসা চলাকালীন, নার্সিংহোমের অন্য রোগীদের নিজের পরিবার ভাবতে শুরু করেছিলেন…

২০১৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে শুরু হয় কেমোথেরাপি। চলেছে ২০১৪ সালের নভেম্বর অবধি। এই সময়ের ব্যবধানে নন্দিতা আচার্য নিয়ে ফেলেছেন মোট চব্বিশটি কেমো। তাঁর ক্যান্সারটি বেশ দুর্লভ। তাই খরচও মাত্রাতিরিক্ত। সবকিছু সামলে নিজেকে মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন বারবার। বাঁচার মতো বাঁচতে চেয়েছেন। সমস্ত জরা, ব্যাধি, যন্ত্রণাকে হারিয়ে দিয়ে আর পাঁচজনের মতোই বাঁচতে চেয়েছিলেন নন্দিতা। নিজের বাঁচার সেই অদম্য ইচ্ছাকে স্বপ্নের মতো করে বুকে আগলে রেখে এখন দিব্যি সংসার করছেন, ছেলেকে মাতৃস্নেহে বড়ো করে তুলছেন, লিখে ফেলেছেন চারটি উপন্যাস, এছাড়াও বিভিন্ন এনজিও-র মধ্যে নিজেকে যুক্ত করেছেন।

এক একটা কেমোর দাম ছিল প্রায় আড়াই থেকে তিন লক্ষ টাকা। এই ধরনের ক্যান্সার দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে বাঁচার আশা খুবই কম। নন্দিতা দেবী প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছিলেন। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো যে-কোনো মানুষের জন্যই খুব কঠিন। ক্যান্সার ধরা পড়ে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। নন্দিতা আচার্য আমাদের জানাচ্ছিলেন, “সেইসময় কোথায় চিকিৎসা করাব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এখানকার ডাক্তাররা বলেছিলেন শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে মুম্বাইয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। কিন্তু মুম্বাই থেকে যাওয়া আসা আমার পক্ষে তখন সম্ভব ছিল না। আমার ডাক্তার ইন্দ্রনীল ঘোষ অসম্ভব পাশে থেকেছেন। আমার জীবনে যে সমস্ত ভালোবাসা রয়েছে, আরও তীব্র করতে শুরু করলাম। অনেকদিন ধরে একটি সিনেমা বানানোর ইচ্ছা, তারপর আমি এমন একটা উপন্যাস লিখব যেটা মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। আমার ছেলেটাকে বড়ো দেখতে চাই, ওকে একটা জায়গায় পৌঁছে দিতে না পারলে আমি মরতে পারতাম না। এইভাবে নিজের আশা আকাঙ্ক্ষাগুলো সঞ্চয় করতাম। নিজেকে বোঝাতাম।” 

নন্দিতা ফোনের ওপাশ থেকে যখন কথা বলছিলেন, তখন তিনি গাড়িতে। ভেসে আসছে রাস্তার কোলাহল। ভিড় বেড়ে চলেছে ফোনের দুইপাশে। চার বছর আগে কি তিনি ভেবেছিলেন, এই কোলাহলে তিনি নিজেকে আবার আগের মতো দেখতে পাবেন? ভিড়ের মধ্যে হেঁটে গিয়ে খুঁজে নেবেন নিজের মতো অন্য কাউকে। ভরসা দেবেন, সাহস জোগাবেন। যখন তাঁর চিকিৎসা চলছে সেইসময় নার্সিংহোমের অন্য রোগীদের পরিবার ভাবতে শুরু করেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন, গল্প জমাতেন। হয়ত সেই রোগীদের অবস্থা নন্দিতার থেকে অনেক ভালো ছিল। কিন্তু হার মানেননি তিনি। তাঁদের ঘিরেই তখন শুরু হয়েছিল আস্ত একটা সংসার। যেখান থেকে পরবর্তীকালে ভাবনারা রসদ জোগাবে। সিনেমা বানাবেন, উপন্যাস লিখবেন… 

কেমো চলাকালীন নন্দিতা আচার্য হারিয়েছেন তাঁর বাবা-মা’কে। মাত্র দশ মাসের ব্যবধানে বাবা এবং মা দুজনেই গত হন। তাঁর কথায়, “আমার পরিবার সবসময় আমার পাশে ছিল। কিন্তু আমার কিছু বন্ধুবান্ধব এবং কলিগরা সরে গিয়েছিলেন। প্রতিনিয়ত আমায় যুদ্ধ করতে হয়েছে। এখন আবার যখন আমি ঘুরে দাঁড়িয়েছি, তাঁরা আবার যোগাযোগ করছেন। অভিনন্দন জানাচ্ছেন। এটাই হয়ত মনুষ্য সমাজের নিয়ম। আমিও তাঁদের গ্রহণ করে নিয়েছি। নিজের জীবনটাকে আর জটিল করে লাভ নেই। আমার জীবন থেকে অনেকটা সময় চলে গেছে। অনেক কাজ করা বাকি আছে। সেগুলো ধীরে ধীরে করতে চাই।” নন্দিতা আচার্য পশুপ্রেমী। পশুদের নিয়ে প্রায় নয় বছর কাজ করেছেন। এছাড়াও হুগলির শ্রীরামপুরে কিছু বয়স্ক মানসিক রোগীদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। আগে জন্মদিনে তাঁদের রসগোল্লা খাওয়াতেন, তাঁদের গল্প পড়ে শোনাতেন, চুল আঁচড়ে দিতেন। স্বামী এবং এক ছেলেকে নিয়ে নন্দিতা আচার্য এখন কলকাতার গড়িয়াতে থাকেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে তিনি ভাবতে চান, তাঁদের জন্য কাজ করতে চান। তাঁদের বাড়িতে গিয়ে সরাসরি দেখা করেন, কথা বলেন। ক্যান্সার এমন একটা রোগ, নিরাময়ের জন্য গরিবদের কাছে যা দুঃসহ। কোন জায়গা থেকে তাঁরা টাকা পেতে পারেন বা ফান্ড কোথা থেকে আসতে পারে- এই বিষয়ে নন্দিতা তাঁদের সাহায্য করেন। সম্প্রতি একটি আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। নাম- ‘দেবদূত ও এলিয়েন’। এটি তাঁর চতুর্থ উপন্যাস। নন্দিতা আচার্যর মতো মানুষজন আজও আছেন বলেই পৃথিবীটা এত সুন্দর। তাঁদের এত তাড়াতাড়ি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলে হয়! নন্দিতা, আপনি বাঁচুন। আপনাকে দেখে বাঁচতে শিখুক এরকম হাজার হাজার ক্যান্সার আক্রান্ত ‘রোগী’।

Developed by DXDasia