মহীনের অন্যতম ঘোড়া তাপস বাপি দাসের ক্যান্সার চিকিৎসার দায়িত্ব নিল রাজ্য সরকার

এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মহীনের ঘোড়াগুলির সহ-প্রতিষ্ঠাতা

পার বাংলায় সত্তরের দশকে যে ফোক-রক ব্যান্ড বাংলা গানের দুনিয়ায় রেনেসাঁ এনে আলোড়ন ফেলেছিল তার নাম ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’। এ প্রজন্ম আজও ভালোবেসে গেয়ে ওঠে, “ভালোবাসি জ্যোৎস্নায় কাশবনে ছুটতে” অথবা “তাকে যত তাড়াই দূরে”। এই যুগোত্তীর্ণ সমস্ত গান আপামর বাঙালি শুনেছেন অথচ এখনও অনেকেই জানেন না, এই গানগুলির জন্য যিনি কলম ধরেছিলেন, যিনি এই সুবিখ্যাত বাংলা গানের দলটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা সেই তাপস বাপি দাস-এর নাম। তাঁর ‘মহীন এখন ও বন্ধুরা’ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাংলা গানের সেই লেগাসি। আজ দুরারোগ্য ক্যান্সারের সঙ্গে যুঝছেন ৬৮ বছর বয়সী মহীনের এই আদি ঘোড়া। ফুসফুসের ক্যানসার তৃতীয় স্তরে পৌঁছে গিয়েছে। চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ না থাকায় বহু বিশিষ্ট মানুষ সহ সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসেন তাঁর সাহায্যার্থে। এবার তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে যাবতীয় চিকিৎসা-খরচের দায়িত্ব নিয়েছে রাজ্য সরকার। এখন এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এই কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী।  

কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন চলছে তাপসবাবুর। একটি টিউমারের জন্য খাদ্যনালীতে সমস্যা দেখা দেওয়ায় ঠিক ভাবে খেতেও পারছেন না তিনি। রেডিয়েশন নেওয়ার মতো শারীরিক ক্ষমতা নেই। ওজন এখন ৩৫ কিলো। হিমোগ্লোবিনের মাত্রা নামতে নামতে ৬-এ ঠেকেছে। শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা রয়েছে। ক্যান্সার ধরা পড়ার আগে ৮ সেপ্টেম্বর তাঁর গল ব্লাডার অপারেশন হয়। তারপরও শারীরিক সমস্যা থেকে যাওয়ায় অঙ্কলোজিস্টের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়। তারপরই ধরা পড়ে মারণরোগ। ১৩ অক্টোবর থেকে টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে চারটি কেমো নেন তাপসবাবু। ২২ ডিসেম্বর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরেন। তার ঠিক তিনদিন পরই ডাক্তারদের নিষেধ সত্ত্বেও নাকে অক্সিজেন নল সমেত দেশপ্রিয় পার্কে বর্ষশেষের একটি সংগীতানুষ্ঠানে তাঁর দল ‘মহীন এখন ও বন্ধুরা’র সঙ্গে সশীরের মঞ্চে উপস্থিত হন। কথা ছিল মঞ্চের পিছনে থেকে তিনি শুধুমাত্র দলকে উদ্বুদ্ধ করবেন। কিন্তু ঠিক যে সময় “সুদিন কাছে এসো… ভালোবাসি একসাথে সবকিছুই” তাঁর রচিত সেই বিখ্যাত গানটি গেয়ে ওঠেন দলের সদস্যরা, তিনি আর মঞ্চের পিছনে না থেকে সরাসরি মঞ্চে এসে গলা মেলাতে শুরু করেন। আবেগে ভেসে যান তাঁর অসংখ্য অনুরাগী, উপস্থিত সকল শ্রোতা।

বরাবরই প্রচারবিমুখ থেকেছেন তাপসবাবু। অর্থনৈতিক অসুবিধা, বিভিন্ন সময়ে বড়োসড়ো শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন কিন্তু নিজের সৃষ্টি, নিজের গানের সঙ্গে কখনও আপোস করেননি। নিজের মতো নিয়মিত চর্চা চালিয়ে যান। নতুন শ্রোতাদের কথা ভেবে এখনও গান লেখেন, সুর বাঁধেন। সম্প্রতি তাঁর অসুস্থতার খবর সোশাল মিডিয়া মারফৎ ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর পরিচিত, শুভানুধ্যায়ী কয়েকজন অর্থ সাহায্যের অনুরোধ জানিয়ে নিজেদের সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন কিন্তু তখনও কোনও সংবাদ মাধ্যমে তাঁর অসুস্থতার খবর প্রকাশিত হয়নি। ইতিমধ্যেই ‘বঙ্গদর্শন’ তাঁর স্ত্রী এবং ‘মহীন এখন ও বন্ধুরা’-র পরিচালক সুতপা ঘোষের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তাঁর অসুস্থতার খবর সহ চিকিৎসায় অর্থ সাহায্যের আবেদন জানিয়ে সোশাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট করে। সাধ্যমতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয় বঙ্গদর্শনের পাঠকদের কাছে। অপ্রত্যাশিত ভাবে ছড়িয়ে পড়ে সেই পোস্ট। বোঝা যায় ‘ভালোবাসি জ্যোৎস্নায় কাশবনে ছুটতে’র স্রষ্টাকে কতটা ভালোবাসে বাংলার মানুষ। সাহানা বাজপেয়ী, স্যমন্তক সিনহা, অর্ক মুখার্জি’র মতো গানের জগতের একাধিক তারকা সহ অগুনতি মানুষ সেই পোস্ট শেয়ার করেন। এমনকী বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ অর্থ সাহায্য করার জন্য বঙ্গদর্শন-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

ইতিমধ্যে সংগীতকার রূপম ইসলাম এবং তাঁর স্ত্রী রূপসা দাশগুপ্ত তাপস বাপি দাসের এই বর্তমান সংকট নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন এবং সাময়িক ভাবে তাঁর ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য অর্থ সাহায্যের দায়িত্ব নেন। দুই রাজনৈতিক দলও সাহায্যের কথা জানান তাপসবাবুর স্ত্রী’কে। কিন্তু, তাঁদের আবেদনে সাড়া দেননি তিনি। এরপরই রাজ্য সরকারের তরফে যোগাযোগ করা হয় সুতপা ঘোষের সঙ্গে। “বাপির অসুস্থতার খবর পেয়ে দুই বিরোধী রাজনৈতিক দল অর্থ সাহায্য করার কথা জানায় আমাকে। কিন্তু আমরা তাতে রাজি হয়নি। এরমধ্যেই একদিন রাজ্য সরকারের তরফে আমাকে ফোন করেন ডেরেক ও’ব্রায়েন মহাশয়। আলোচনা করে বাপিকে আমরা এসএসকেএম-এ ভর্তির সিদ্ধান্ত নিই। পশ্চিমবঙ্গ সরকার কোনও রাজনৈতিক দল নয়, আর সেকারণেই আমরা এই সাহায্য ফিরিয়ে দিইনি। রাজ্য সরকারের তরফে একজন নিয়মিত ফোন করে খবর নেন, বাপি কেমন আছে। আমি আর বাপি দু’জনই রাজ্য সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ।” বঙ্গদর্শন-কে বলেন তাপসবাবুর স্ত্রী সুতপা ঘোষ। তাঁর সূত্রেই জানা যাচ্ছে, মহীনের অন্যতম স্রষ্টার চিকিৎসার সুযোগ পেয়ে নস্টালজিক হয়ে পড়ছেন চিকিৎসকরাও। তাঁদের অনেকেরই ছোটোবেলা বা তরুণ বয়সের সঙ্গী মহীনের ঘোড়াগুলি। তাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন তাপসবাবুর দ্রুত নিরাময়ের। অপেক্ষায় দিন গুনছে তাঁর অনুরাগীরাও। এত মানুষের ভালোবাসা কুড়িয়ে আশা ছাড়ছেন না সংগীত শিল্পীও। হাসপাতালে শুয়ে বারবার বলছেন, “হাসপাতাল থেকে ফিরে আমার আগামী অনুষ্ঠানে আমার সকল শুভানুধ্যায়ীদের ভালোবাসা আমি ফিরিয়ে দেব।”

সস্ত্রীক (সুতপা ঘোষ) তাপস বাপি দাস

প্রসঙ্গত, ২০২০-২১ সালে bongodorshon.com-এ ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হত তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখা “মহীনের তেজি ঘোড়াগুলি”। এবং সেই ধারাবাহিকের সংলকন ‘“মহীনের তেজি ঘোড়াগুলি” বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে ২০২২ সালের কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায়। প্রকাশক পি অ্যান্ড এম কমিউনিকেশনস। বইটি অনলাইনে সংগ্রহ করতে পারেন এখানে ক্লিক করে। এছাড়াও তাঁর বাড়িতে একটি ‘এক্সক্লুসিভ’ সাক্ষাৎকার তথা আড্ডার আয়োজন করে ‘বঙ্গদর্শন’। সঙ্গে ছিলেন শিল্পী হিরণ মিত্র। রইল সেই ভিডিও লিংক। দেখুন, পড়ুন আর ফিরে যান বাংলা গানের সেই উজ্জ্বল দিনগুলোয়।

Developed by DXDasia