
দশদিনের বদলে মাত্র দুইদিনের নাট্যমেলা হচ্ছে নান্দীকারের আয়োজনে
২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর ‘বঙ্গদর্শন’-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে একালের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেত্রী এবং নান্দীকারের নাট্যকর্মী সোহিনী সেনগুপ্ত তাঁদের নাট্য উৎসব সম্বন্ধে বলেছিলেন, এই উৎসবের পিছনের গল্পটা হচ্ছে টাকার অভাবের গল্প। তিনি বলেন, “দর্শক যেমন আসেন, সেখান থেকে যা টাকা পাওয়া যায়, তা থিয়েটার দলগুলোকে দেওয়া হয়। প্রতিবছর একটু করে বুড়ো হই আর চিন্তা বাড়ে। কিন্তু কীভাবে যেন ফেস্টিভ্যালটা হয়েও যায় ভালো করে। নান্দীকারে কিছু তরুণ-তরুণী আছেন; অনিন্দিতা, অর্ঘ্য, অয়ন, শুভদীপ এরকম প্রায় জনা কুড়ি ছেলে-মেয়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে ফেস্টিভ্যালের চেহারাটাই পাল্টে যায়।”
নান্দীকার নাট্যোৎসব হচ্ছে এবারেও। সেই উৎসবের এবার ৩৮তম সংস্করণ। কিন্তু অন্যান্যবারের তুলনায় মেজাজটা একেবারেই আলাদা। আলাদা, তার প্রধান কারণ নান্দীকারের ‘ম্যাডাম’ স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত আর নেই। এই প্রথম নান্দীকার জাতীয় নাট্যোৎসব হবে এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রীকে ছাড়া। পাশাপাশি করোনার গ্রাস এখনও আমাদের পিছু ছাড়েনি। বন্ধ হয়ে গেছে একাধিক গ্রুপ থিয়েটার। কল শোয়ের সংখ্যা কমে এসেছে। দর্শকরাও আর আগের মতো ভিড় জমাচ্ছেন না। ২০১৯ সালে যে কথাগুলি সোহিনী বলেছিলেন, তার অধিকাংশ হবহু মিলে যাচ্ছে ২০২১ সালেও।
স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত (ছবি সৌজন্যে – নান্দীকার)
একটি ভিডিও বার্তায় সোহিনী সেনগুপ্ত বলেছেন, “এ বছর আমার কাছে নতুন একটা অভিজ্ঞতা হবে। কারণ মা নেই। ছোটোবেলা থেকে দেখতাম, নাট্যমেলায় আমার মা ঝাঁটা, ফিনাইল এসব নিয়ে আকাদেমির বাথরুম নিজের হাতে পরিষ্কার করতেন। রুম ফ্রেশনার ছড়িয়ে দিতেন সব ঘরে ঘরে। শম্ভু জেঠু (শম্ভু মিত্র) আসতেন। শম্ভু জেঠুর ঘরটা মা জুঁইয়ের মালা দিয়ে সাজিয়ে দিতেন। যাকে দেখে বড়ো হয়েছি, যার জন্য নান্দীকারকে ভালোবাসোতে শিখেছি, তিনি আজ নেই। কিন্তু তাঁর ছবিটা রাখা থাকবে সযত্নে। মা যে নাট্যমেলায় থাকবেন না, এখনও আমার মেনে নিতে কষ্ট হয়। হয়তো আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে যাবে।”
দশদিনের জায়গায় মাত্র দুইদিনের উৎসব হচ্ছে এবার। এই সীমিত সাধ্যের মধ্যেই বড়ো মেজাজ নিয়ে পালিত হবে নান্দীকার জাতীয় নাট্যোৎসব। নান্দীকার এবং নাট্যমেলার ঐতিহ্যকে মাথায় রেখে উৎসব এগিয়ে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন দলের কর্মকর্তারা। আগামী ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বর আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসে মঞ্চস্থ হবে পাঁচটি থিয়েটার প্রোডাকশন।
রঙরূপ প্রযোজিত, সীমা মুখোপাধ্যায় নির্দেশিত ও চিত্রা সেন অভিনীত নাটক ‘জলছবি’ মঞ্চস্থ হবে ২৫ ডিসেম্বর দুপুর ২-৩০টেয়। উল্লেখ্য, থিয়েটার জননী বর্ষীয়ান অভিনেত্রী চিত্রা সেনকে নান্দীকারের পক্ষ থেকে সম্বর্ধনা দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। সোহিনীর কথায়, একে একে থিয়েটারের মায়েরা চলে যাচ্ছেন। ঊষা গঙ্গোপাধ্যায়, স্বাতীলেখা সেনগুপ্তেরা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। সোহিনী জানিয়েছেন, “যে কজন থিয়েটারের মা জীবিত আছেন, তাঁদের মধ্যে সবথেকে বলিষ্ঠ অভিনেত্রী চিত্রা সেন। তাঁকে এবছর আমরা সম্মানিত করব। চিত্রা মাসি প্রত্যেকদিন কাজ করেন। কাজ ছাড়া উনি থাকতে পারেন না। এতে ওঁর কোনও ক্লান্তি নেই। আশাকরি বয়সকালে আমিও চিত্রা মাসির মতো হতে পারব।”
ওইদিনই সন্ধে ৬-৩০টা থেকে মঞ্চস্থ হবে নান্দীকার প্রযোজিত, সপ্তর্ষি মৌলিক অভিনীত এবং সোহিনী সেনগুপ্ত নির্দেশিত নাটক ‘মানুষ’। এই মুহূর্তে নান্দীকারের অন্যতম মঞ্চসফল প্রযোজনা এটি।
২৬ ডিসেম্বর দুপুর ১টায় উপস্থাপিত হবে অয়ন ঘোষ নির্দেশিত পথ নাটক ‘সত্যবতী’, পরিবেশনায় নান্দীকারের ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ।
এই উৎসবের সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ থিয়েটার ফর্মেশন পরিবর্তক প্রযোজিত, জয়রাজ ভট্টাচার্য নির্দেশিত এবং অনির্বাণ ভট্টাচার্য অভিনীত নাটক ‘তিতুমীর’। যা ওইদিন দুপুর ২-৩০টেয় মঞ্চস্থ হবে।
২৬ তারিখ সন্ধে ৬-৩০টায় মঞ্চস্থ হবে এই নাট্যোৎসবের শেষ নাটক চাকদহ নাট্যজন প্রযোজিত এবং সায়িক সিদ্দিকী নির্দেশিত ‘ভানু সুন্দরীর পালা’।
সব মিলিয়ে দুটোদিন আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস মুখরিত হবে একদল থিয়েটারপ্রেমী মানুষদের ভালোবাসায়। হাজির থাকবেন নান্দীকারের ‘স্যার’ রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত।
সোহিনী সেনগুপ্ত জানিয়েছেন, “অনেক দলকেই আমন্ত্রণ জানানোর ইচ্ছা ছিল, কিন্তু এ বছর সম্ভব হল না। সামনের বছর আশাকরি আগের মতোই দশদিনের জাতীয় নাট্যোৎসব করতে পারব।”
