
চলচ্চিত্রে সরাসরি উদ্বাস্তু জীবনের সমস্যা না এলেও, মৃণালের একটি নাটকের মধ্যে সেই প্রসঙ্গের উল্লেখ আছে
মৃণালের প্রেমের ফাঁদ পাতা ছিল হুগলির প্রবেশ দ্বার ভদ্রকালী উত্তরপাড়ায়। সেখানে গীতার বাসা। একবার বাড়ি ফেরার পথে দুজনে, নির্জন বালি ব্রীজের উপর দিয়ে হাঁটছেন। এমন সময়, জীবনে প্রথমবার মৃণালের ঘনিষ্ঠ হবার ইচ্ছে হল গীতার সঙ্গে। গীতার হাত ধরে ওকে চুমু খাওয়ার ইচ্ছা। এত বড়ো একটা ফাঁকা ব্রিজের উপর দুজনে মুখোমুখি। নার্ভাস মৃণালের ঠোঁট গিয়ে পড়ল গীতার নাকে; হাতটা কেঁপে উঠল মৃণালের। মুহূর্তে হাত থেকে ঝপাং করে গঙ্গার জলে পড়ে গেল সদ্য কেনা গ্যালাহার-এর 'আ কেস ফর কমিউনিজম'। 'প্রথম চুম্বনের সঙ্গে কমিউনিজমের সপক্ষে গ্যালাহারের যুক্তিজাল গঙ্গায় ভেসে গেল' মৃণাল সেনের হাত থেকে। দূরে তখন ট্রেন ছুটে চলেছে। ব্রিজের পিলারগুলোর উপর আছড়ে পড়ছে গঙ্গার জল। রুপোলি চাঁদের আলো ভেসে আছে গঙ্গা-তরঙ্গে।
পঞ্চাশের দশকের গোড়াতেই হুগলি জেলার প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সমাজের মননে চিন্তনে 'ভদ্রকালী নাট্যচক্র' সক্রিয় প্রভাব বিস্তার করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়, পঞ্চাশের মন্বন্তরের জঠর থেকে বেরিয়ে আসা শোষিত নিপীড়িত মানুষের বাস্তব জীবন সংগ্রামের দৃশ্য রচনা হয়েছিল বিজন ভট্টাচার্যের নাটক 'নবান্ন'য়। সেই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের অনিবার্যতায় 'নবান্ন'র প্রযোজনা দেশের নাট্যসমাজের অভ্যস্ত চিন্তা চেতনার আভরণকে উন্মুক্ত করল প্রকাশ্যে। এই যুগান্তকারী ঘটনারই ফসল 'ভারতীয় গণনাট্য সংঘ'। সুন্দর ও সুষ্ঠ সমাজ গড়ে তোলাই ছিল গণনাট্য আন্দোলনের প্রধান আদর্শ ও লক্ষ্য।

সেই স্বপ্ন দেখার চোখ নিয়েই ভদ্রকালী দোলতলা অঞ্চলের শ্রী গুরুপদ সেনের মোটর গ্যারেজে ১৯৫১ সালে জন্ম নিল 'ভদ্রকালী নাট্যচক্র'। রাষ্ট্রের চিরকালীন দাদাগিরিকে তোয়াক্কা না করে এই সংস্থা প্রচণ্ড কালবৈশাখীর তোড়ে এগিয়ে চলেছিল গ্রাম শহর নগর বন্দরে। এই ঝড় আলোড়িত ও উদ্দীপিত করেছিল সেই সময়ের সর্বস্তরের মানুষকে।
গভীর অন্ধকারের মধ্যেও কিছু মানুষ হেঁটে চলেছেন জীবনের গান গেয়ে। মানুষের মঙ্গলপ্রদীপ হাতে চিরকাল মানুষের মধ্যে এমনই ভাবনার জন্ম দিয়েছিল সেদিনের এই ভারতীয় গণনাট্য সংঘের বিভিন্ন শাখার মতোই এই ভদ্রকালী নাট্যচক্র। এই নাট্যচক্রে সক্রিয়ভাবে আরও অনেকের সঙ্গে সেই সময় কাঁধ মিলিয়ে সামিল হয়েছিলেন মৃণাল সেন। সঙ্গে গীতা সোম এবং অনুপকুমার। এছাড়াও ছিলেন হুগলি জেলার কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ— বিজয় মোদক, তুষার চট্টোপাধ্যায়, পাঁচুগোপাল ভাদুড়ি, দীনেন ভট্টাচার্য, সুশীতল রায় চৌধুরী প্রমুখ। এই চক্রের হিতাকাঙ্ক্ষী ছিলেন জ্যোতি বসু, হীরেন চ্যাটার্জী, বঙ্কিম মুখার্জী, অহীন্দ্র চৌধুরী, তুলসী লাহিড়ী, ছবি বিশ্বাস, উত্তমকুমার, উৎপল দত্ত, শোভা সেন, রবি ঘোষ, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, মাধবী মুখার্জী, ভি বালসারা প্রমুখ। স্থানীয় প্রতিভাবান শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ব্যোমকেশ চ্যাটার্জী, শম্ভু চ্যাটার্জী, জাহ্নবী মুখার্জী।

সীমিত আয়োজন কিন্তু নিজেকে দান করা, বিসর্জন করাই ছিল এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য। ঘরের জামাকাপড়, আরও নানান জিনিসপত্র দিয়েই তৈরি হত মঞ্চ ও অন্যান্য সাজসজ্জা। ভালোবাসাই যার একমাত্র মূলধন। এই নাট্যচক্রের সূচনা হয় মৃণাল সেনের নাটক 'শহিদের ডাক' ও দিগীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'মশাল' নাটকের অভিনয় দিয়ে। শহিদের ডাক নাটকটি ছিল ছায়ানাটক। রচনার পাশাপাশি এর নির্দেশনার দায়িত্বেও ছিলেন মৃণাল সেন নিজেই। আলোকসম্পাতে বন্ধু তাপস সেন। ভদ্রকালীতে প্রথম অভিনয়ের পরই এর ডাক আসে বিহারের দুমকা, বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর থেকে। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল বিহার সরকার সাধারণ রঙ্গালয়ে এর অভিনয় করতে বাধা দেয়। তখন স্থানীয় পৌরপ্রধানের সদিচ্ছায় তাঁর বাড়ির উঠোনে অভিনয়ের সুযোগ মেলে। সেখানে 'মশাল' নাটকটি অভিনয় হলেও 'শহিদের ডাক' মঞ্চস্থ করা যায় না বিদ্যুৎ ব্যবস্থা না থাকায়।
শহিদের ডাক নাটকের চরিত্রেরা সকলেই অভিনয় করতেন মঞ্চের উপর টাঙানো সাদা পর্দার আড়াল থেকে। আর চরিত্রদের উপর আলো ফেলা হত পিছন থেকে। কারণ সহজেই অনুমেয়। চরিত্রদের ছায়া কখন লেপটে যেত, ছিটকে এসে লাগত টানটান সাদা পর্দার গায়ে। আবার হারিয়ে যেত। ঘন হালকা, কাছে দূরে, উপর নিচে, নানা ছায়া উপছায়ার অভিঘাতে 'শহিদের ডাক' নাটকে দেশভাগের যন্ত্রণা, কান্না, আর্তনাদ সেদিনের দর্শকের চোখে আজও অমলিন।
এরপর সর্বক্ষণের চলচ্চিত্রকর্মী হয়ে গেলেন মৃণাল সেন। গীতার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হল। তাঁদের ঘরে এল কুণাল। এ কাহিনি অন্য কোনো দিন। তাঁর চলচ্চিত্রে সরাসরি উদ্বাস্তু জীবনের সমস্যা আমরা দেখতে না পেলেও এই নাটকটির মধ্যে সেই প্রসঙ্গের উল্লেখ চিহ্ন আমরা পেয়ে গেলাম। এই বিষয়ে ইচ্ছুক পাঠকেরা, গবেষণার ইচ্ছা নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে জীবনস্মৃতি ডিজিটাল আর্কাইভ, উত্তরপাড়ায় চলে আসতে পারেন। মৃণাল সেন আগামীদিনে যে ছায়াচিত্রকর হবেন তাঁর ইঙ্গিত সামান্য হলেও মেলে এই ছায়ানাটকের আঙ্গিক ভাবনায়। আর অন্যদিকে তাঁর চলচ্চিত্র; ক্যামেরা হাতে সরাসরি মানুষের মিছিলে প্রবেশ করবেই, তারও একটা বড়ো প্রেক্ষাপট এই গণনাট্য আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সক্রিয় সম্পর্ক। মানুষের মিছিলে যিনি একবার হেঁটেছেন, সেই ধুলো, সেই ঘাম যাঁর শরীর স্পর্শ করেছে অন্তত একবার, সেই চেতনা দগ্ধ হৃদিপুরুষকে ওই মাটির মানুষের দল তাঁদের বেঁচে থাকার সংগ্রামবিন্দুতে আজীবন টান দেবে। মৃণাল সেন সেই টানকে চিরকাল অনুভব করেছেন, সম্মান করেছেন, স্বীকৃতি দিয়েছেন নিজের সৃষ্টিতে। দরজার ভিতর থেকে মিছিলের শব্দ শুনে ফেড আউট করে অন্য পথে না হেঁটে, সেই মিছিলের পথ ধরেই তাঁর সৃষ্টি পৃথিবীর মানচিত্র স্পর্শ করেছে। হাজার হাজার বছর আগে যে মানবের পদযাত্রা শুরু হয়েছিল, চোখ মেললে আজও ভারতবর্ষের মানচিত্রে রেলপথ ধরে নতুন স্বপ্নের ইশারা দিচ্ছেন সেই যাত্রীদল। এই যাত্রাপথের আলোয় সেলুলয়েডকে পুড়িয়ে ফেলতে, অথবা আমাদের হাতের ডিজিটাল ইমেজ রচনায় ব্যবহৃত প্রিকসেলগুলোকে সেই পদচিহ্ন, ওই পদধ্বনির মূর্চ্ছনা নির্মাণে কি আজ আমরা এই বন্ধ দরজার ভিতরে বসে মুক্তবাণিজ্যের সোনালিভ্রম, সুবিধাভোগী মন, অনুদানলোভী শরীরকে শুচি করে নতুন ভাবনায় আরেক চিত্তভাষের খোঁজে মনকে খেপিয়ে তুলতে পারি না?
ছবি সৌজন্যেঃ কুণাল সেন
জীবনস্মৃতি ডিজিটাল আর্কাইভ
তথ্য সৌজন্যেঃ জীবনস্মৃতি ডিজিটাল আর্কাইভ
