
অপর্ণা সেন পরিচালিত ‘ঘরে বাইরে আজ’ ছবির রিভিউ
গৌরী লঙ্কেশকে উৎসর্গ করে শুরু হয়েছে অপর্ণা সেনের ছবি ‘ঘরে বাইরে আজ’। ছবির শেষে আমরা গৌরী লঙ্কেশকে পেলাম নতুনভাবে, নতুন রূপে। প্রত্যেকটি মানুষ, যারা মুক্তচিন্তার চর্চা করেন, তাঁদের সবার মধ্যে একজন করে গৌরী লঙ্কেশ লুকিয়ে থাকে। এক গৌরী লঙ্কেশের মৃত্যু বাকি গৌরী লঙ্কেশদের উদ্বুদ্ধ করে, ভয় না পেয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার স্পর্ধা জোগায়। এখন তাঁদের বড়ো দরকার। মানুষের গোটা সভ্যতাই তো বিপন্ন। উগ্র জাতীয়তাবাদের মোড়কে সাম্প্রদায়িকতা যখন সারা পৃথিবীতেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, আমাদের প্রিয় ভারতভূমিও তার থেকে মুক্ত নয়, এমনই রাক্ষসীবেলায় ছবিটি বানিয়েছেন অপর্ণা। রবীন্দ্রনাথকে তুলে এনেছেন একুশ শতকের প্রেক্ষিতে। রবি ঠাকুরের উপন্যাস কিংবা সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের থেকে এই সিনেমা অনেকটাই স্বতন্ত্র। সর্বতোভাবে এই ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে সমকালের এক দলিল।
গণতন্ত্র মানে কি কেবলই সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন? ‘ঘরে বাইরে আজ’ ছবির উপসংহারে দর্শকদের কাছে এই প্রশ্নই ছুঁড়ে দিয়েছেন পরিচালক। প্রশ্নটির উত্তর লুকিয়ে আছে গোটা সিনেমা জুড়েই। কীভাবে ভণ্ড বুদ্ধিজীবীরা কথার চমকে মানুষের যুক্তিবোধকে বিভ্রান্ত করে, কীভাবে উদার উন্মুক্ত ভারতীয় সংস্কৃতি একদল স্বার্থান্বেষীর হাতে পড়ে তালিবানি ফ্যাসিবাদের রূপ পায়, তা গোটা ছবি জুড়েই দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। তার সঙ্গে অতিবাম অন্ধ আনুগত্যকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন পরিচালক। আর রেখেছেন দেশীয় সংস্কৃতি নিয়ে বেশ কিছু ভাবনাচিন্তার উপাদান। কীভাবে আমাদের সমাজে ঈশ্বরকে পরিবারেরই এক সদস্য করে তোলা হয়, কেনই বা নিরাকার তত্ত্বের চেয়ে সাকার মূর্তিপুজো আমজনতার মনে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, সে সব নিয়ে মননশীল দর্শকদের ভাববার অবকাশ রয়েছে বই কি!

গোটা ছবি আবর্তিত হয়েছে নিখিলেশ-বৃন্দা-সন্দীপের পারস্পরিক টানাপোড়েনকে ঘিরে। বিমলা কীভাবে বৃন্দা হয়ে উঠল, তার ইতিহাসও রয়েছে ছবিতে। এক দলিত মেয়ের বাঙালি উচ্চবর্ণ পরিবারে আসা, দিল্লির এলিট পরিবেশে বড়ো হয়ে ওঠা, এবং তার নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে কীভাবে মুছে দিল মেট্রোপলিটন আভিজাত্য, তা সুন্দর ফুটে উঠেছে। বাংলা উচ্চারণে বৃন্দার অস্বাচ্ছন্দ্য সেই পরিচয়ের সংকটকেই প্রকট করে তোলে। উল্টোদিকে নিখিলেশ তার আদর্শে স্থির, নির্ভীক, এতটাই আস্থাশীল যে সেটা আর চিৎকার করে জাহির করতে হয় না। নিখিলেশ যেন গৌরী লঙ্কেশেরই প্রতিরূপ। বৃন্দার মনে হয়, সন্দীপ যেভাবে নিজের কথাগুলো জোর দিয়ে বলতে পারে, নিখিলেশ তা পারে না। আসলে প্রথমে সুযোগসন্ধানী সন্দীপের সঙ্গে আদর্শবান নিখিলেশের পার্থক্য বুঝে উঠতে পারেনি বৃন্দা। তার দাম দিতে হয়েছে বৃন্দা-নিখিলেশ দু’জনকেই, এমনকি সন্দীপকেও।
তবে, নিখিলেশ-বৃন্দার সম্পর্কে এমন কী শূন্যতা ছিল, কোন অভাববোধ ছিল, কীসের জন্য বৃন্দা সন্দীপের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়, তা একেবারেই পরিষ্কার হয়নি ছবিতে। বরং, বৃষ্টিমুখর রাত, নিখিলেশের অনুপস্থিতি – এই গোটা ব্যাপারটাই বড়ো আরোপিত মনে হয়েছে।
ছবিতে সবার অভিনয়ই যথাযথ। সন্দীপের নানা সূক্ষ্মতা এবং জটিলতাকে দক্ষভাবে তুলে এনেছেন যিশু। অনির্বাণের কাজ যথারীতি মুগ্ধ করেছে। তবে এই ছবিতে আলাদা করে অবশ্যই অবশ্যই সবার নজর কেড়েছেন তুহিনা দাস। নানা ভূমিকায় শ্রীনন্দা শঙ্কর, অঞ্জন দত্ত বরুণ চন্দ, সোহাগ সেন, ঋতব্রত মুখোপাধ্যায় – সবাই অনবদ্য। নীল দত্তের আবহ সংগীত মন ছুঁয়ে যায়। শমীক হালদার এবং রবিরঞ্জন মৈত্রের কাজও প্রশংসনীয়।

তবে, এই ছবির ভিতরে বাইরে সর্বত্রই অপর্ণা সেন। যেন, গোটা ছবিটি জুড়ে তিনি নিজেই কথা বলে গেছেন। সরাসরি তুলে ধরেছেন নিজের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা। বড়োই খোলাখুলি। যার ফলে শিল্পের প্রতি খানিকটা অবিচারই করতে হয়েছে তাঁকে। তাই, ছবিটি দেখে শেষ পর্যন্ত খানিকটা অতৃপ্তিই রয়ে গেল। ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’-এর পরিচালকের কাছে আরেকটু বেশি কিছু আশা করা কি অসঙ্গত?
ছবি – ঘরে বাইরে আজ
পরিচালক – অপর্ণা সেন
অভিনয় – তুহিনা দাস, যিশু সেনগুপ্ত, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, শ্রীনন্দা শঙ্কর, অঞ্জন দত্ত বরুণ চন্দ, সোহাগ সেন, ঋতব্রত মুখোপাধ্যায় এবং অন্যান্য।
আবহ সংগীত – নীল দত্ত
