দিল্লিতে রবীন্দ্রনাথের ধ্রুপদ গাইলেন মোহন সিং, ভাষা না বুঝেও ভাবে ডুবে গিয়েছিলেন শ্রোতারা

মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন — পর্ব ২০

মোহন সিং-এর এই দীর্ঘ জীবনে তাঁর স্ত্রী শুচিস্মিতার প্রভাব খুব গুরুত্বপূর্ণ। সংসারে মন ছিল না মোহনের। টাকা-পয়সা সব স্ত্রীর হাতে দিয়ে বলতেন “তুমি যা করবে করো”। শুচিস্মিতা তাঁকে অসম্ভব সাহায্য করেছেন আজীবন। মোহনকে চাল-ডাল-নুন-তেলের মধ্যে নিয়ে যাননি কখনও। তাঁর রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া কিন্তু স্ত্রীর জন্যই৷ এছাড়াও ওঁর কথায় মোহন তৈরি করেছেন একাধিক গান। শুচিস্মিতার কথা এই ধারাবাহিকে আগেও লেখা হয়েছে। অত্যন্ত ঘরোয়া নিপুণ কারিগরের অধিকারী ছিলেন তিনি। এই যেমন বড়ো ছেলে বিক্রম— সাইকেলে তিনি চলেছেন লাইব্রেরির পথে, কখনও কোপাই, সোনাঝুরি, লালবাঁধ। বাড়ি ফিরেই মাকে বলতেন, "দু'পিস মাছ ভেজে দাও তো। খুব খিদে পেয়েছে।" রাতে আবার বায়না উঠল ফেঞ্চ টোস্টের। নিজেই কিচেনে ঢুকতে যাচ্ছেন। তখন মা নিষেধ করে বলছেন, "থাম তো, তুই যা, আমি বানিয়ে দিচ্ছি"। 

(গত পর্বের পর)

রবীন্দ্রনাথের গান কি শুধুমাত্র বাঙালিদের জন্যই? একেবারেই না। রবীন্দ্রসংগীত পৌঁছে গেছে বিশ্বের আঙিনায়। বাংলা ভাষা না জেনেও শুধুমাত্র গানের ভাব, সুর আর রবীন্দ্রনাথের টান বহু বহু অবাঙালি শ্রোতা ও সংগীতজ্ঞের কাছে ধরা দিয়েছে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ উচ্চারণ নিয়ে কোনোদিন কাউকে কিচ্ছুটি বলতেন না। উনি সবসময় বলতেন, “গাও, গাও”। দক্ষিণ ভারতের কত গুণী শিল্পীরা রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছেন। কিন্তু মোহন সিং-এর কি কোনো স্বপ্ন আছে রবীন্দ্রনাথের গান বিশ্বের কাছে আরও বিপুলভাবে পৌঁছে দেবার জন্য? 

দিল্লিতে একটি শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুষ্ঠানে মোহন সিং রবীন্দ্রনাথের ধ্রুপদ গেয়েছেন। গানের ভাষা বুঝতে পারেননি শ্রোতারা। কিন্তু এই গায়কিতে কী যেন একটা আছে। না জানা ভাষা আর না জানা গান শুনে সেদিন শ্রোতারা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়েছিলেন। দিল্লিতে একটি ফিল্ড কেন্দ্র তৈরি করেছিলেন তিনি। গাড়িতে যেতে যেতে অনেক মানুষ রবীন্দ্রনাথের গান শোনেন। অথচ তাঁরা কেউ বাংলা জানেন না। নিজের গায়কির মাধ্যমে মোহন বুঝিয়ে আসছেন রবীন্দ্রনাথের গান ঠিক কীভাবে গাওয়া উচিত। ‘ভাব’ নামক যে একটি কথা আমরা বলি, তা সর্বৈবভাবে ভুল৷ ভাব তখনই আসে যখন শিল্পী মগ্ন হয়ে যাবেন সুরে এবং অনায়াস তাল থাকবে। যেমন নাটকে সংলাপ মুখস্থ না থাকলে আসল অভিনয়টাই বেরিয়ে আসবে না। গান গাওয়ার আনন্দ তখনই হবে, যখন মানুষ এই অনুভবের চওড়া পথ জয় করে নেবেন। 

রবীন্দ্রসংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার পান মোহন সিং

রবীন্দ্রসংগীতকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার জন্য মোহন সিং এযাবৎকাল অবধি বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ভারতের রাষ্ট্রপতির সৌজন্যে পেয়েছেন রোল মডেল অ্যাওয়ার্ড, দিল্লি থেকে পেয়েছেন পাঞ্জাবি আকাদেমি পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে রাজ্য আকাদেমি পুরস্কার এবং ভারতবর্ষের অন্যতম গর্বের সম্মান সংগীত নাটক আকাদেমি, যা তাঁকে প্রদান করা হয় রবীন্দ্রসংগীতে অবদানের জন্য।

আসলে এই সবকিছুর পিছনেই রয়েছে মানুষের ভালোবাসা। নিজের সুরেলা চলার পথে হাঁটতে হাঁটতে বারবার জিতে গিয়েছেন মোহন সিং। মোহন সিং আসলে সেই পারাপারের নাম, যিনি প্রেমিক, একইসঙ্গে আমাদের কাঁদান, হাসান— সাক্ষী থাকেন রবীন্দ্রনাথ। 

(চলবে…)

*মূল সাক্ষাৎকার গ্রাহক— অর্পিতা চ্যাটার্জি

অনিবার্য কারণবশত এখন কোনও ভিডিও ক্লিপিং রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
 

Developed by DXDasia