অবাঙালি, এমনকি অভারতীয় রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদের তাহলে কী চোখে দেখব?
যে-কোনো বাংলা গানের থেকে রবীন্দ্রসংগীতের ব্যাপ্তি অনেক বেশি। রবীন্দ্রনাথ নিজে এক জায়গায় বলেছেন, আমি আমার গানে কবিতা-ঘেঁষা সুর দিয়েছি। এই কথাটার একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে। রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ গানই কবিতা, তিনি নিজেও তাই মনে করতেন। রবীন্দ্রনাথের গানে ভাব ও ব্যঞ্জনা তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে বলতেই পারেন, রবীন্দ্রনাথের গানে যে-কথা, যে-কবিতা, যে-ব্যঞ্জনা—সেটা কি অবাঙালিদের পক্ষে বোঝা সম্ভব? আমি বলব, বাঙালিরাও কি সকলে এই ব্যঞ্জনা বোঝেন?
গান বোঝার দুটি দিক থাকে। একটা হচ্ছে, কেউ কথা-সুর বা সমস্ত গানটাই বুঝলেন। আবার অনেক সময়েই হয়তো কেউ কথাটা সম্পূর্ণ বুঝতে পারলেন না ভাষাটি অতখানি রপ্ত না থাকায়। কিন্তু গানের ভাবটি তার ভিতরে চারিয়ে গেল। যিনি গানের কথা-সুর-ভাব সবটাই বুঝেছেন, তিনি অবশ্যই দ্বিতীয়জনের থেকে অনেকটা বেশি পেয়েছেন সন্দেহ নেই। কিন্তু যিনি প্রধানত সুরের ভিতর দিয়ে ভাবকে আত্মস্থ করতে পেরেছেন ভাষা সবটুকু না বুঝলেও, তিনিও কিন্তু অনেকখানিই পেয়েছেন। আমাদের এই কম-বেশি পাওয়াটা আছে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের কথা বা বাণী বোঝাটা খুবই দরকার। কিন্তু এটা যদি ধরে নিই, অবাঙালি হলে গানের ভাব বা ব্যঞ্জনা বুঝতেই পারবে না, সেটা ভুল। এটা প্রধানত শ্রোতার দিকের কথা।
কিন্তু, অবাঙালি হয়েও চমৎকার রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছেন এমন কত উদাহরণই তো আমাদের সামনে আছে। আমার মতে রবীন্দ্রসংগীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী রাজেশ্বরী দত্ত (বাসুদেব), বা কে এল সায়গল থেকে শুরু করে মোহন সিং খাঙ্গুরা, এঁদের গান শুনে কি মনে হয়, এঁরা রবীন্দ্রসঙ্গীত না বুঝে গাইছেন? বিক্রম সিং বা মনোজ মুরলী নায়ারকে আমি অবাঙালিদের মধ্যে ইচ্ছে করেই রাখছি না। কারণ, সাহানার মতো এঁদেরও বেড়ে ওঠা বাংলাতেই, শান্তিনিকেতনে। বিশেষত, বিক্রম রবীন্দ্রনাথ পড়ে বড়ো হয়েছে, বাংলা অনার্স ও এমএ-তে আমাদের ছাত্র ছিল। রবীন্দ্রনাথের গান সম্পর্কে পিএইচডি রেজিস্ট্রেশনও করেছিল আমার কাছে। বাংলায় কবিতা লিখেছে। এঁদের অবাঙালি বলা একটু কঠিন।
একজনের কথা আমি আলাদা করেই বলব, দক্ষিণের শিল্পী সুব্বুলক্ষ্মী। ওঁর গাওয়া ‘হে নূতন’ গানটি যদি আমরা শুনি, দেখব তথাকথিত বাংলা উচ্চারণ ওঁর নয়। কিন্তু, সুব্বুলক্ষ্মীর গান শুনতে শুনতে মনে হয়, গানের প্রতিটি শব্দ বা সমগ্র গানটি উনি অনুভব করেই গাইছেন। সেখানে তাই উচ্চারণটাও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তবে, সুব্বুলক্ষ্মী বা বালমুরলীকৃষ্ণ ব্যতিক্রম। উচ্চারণের বাধা কাটিয়ে রবীন্দ্রনাথের গান পৌঁছে দেওয়া সহজ নয়, সেটা এঁরা পেরেছেন। উল্লেখযোগ্য, এঁরা দুজনেই সংগীতগুণী হিসেবে বিশ্বভারতীর ‘দেশিকোত্তম’।
রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে গেলে উচ্চারণ স্পষ্ট হওয়া বিশেষ প্রয়োজন। সেটা বাঙালি-অবাঙালি সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বাঙালিরও উচ্চারণ যদি স্পষ্ট না হয়, যেমন অনেকক্ষেত্রেই হয়ে থাকে, তাহলে গান শ্রোতার কাছে পৌঁছয় না। শব্দের যথার্থ উচ্চারণে গান বিশেষ মাত্রা পায়। বিক্রম-মনোজ-সাহানার গানে স্বাভাবিক কারণেই উচ্চারণের কোনো সমস্যা নেই। যে-সমস্ত প্রবীণ মান্য শিল্পীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের কারোর যদি উচ্চারণে অল্প-বিস্তর সমস্যা থাকেও পরিবেশনে কখনো মনে হয়নি তাঁরা গানের অর্থ না বুঝেই গাইছেন।
শান্তিনিকেতনের অভিজ্ঞতা থেকে বলি, শুধু অবাঙালি নয়, অভারতীয়রাও এখানে দীর্ঘকাল ধরে রবীন্দ্রসংগীত চর্চা করেছেন। শুধু সংগীতভবনে নয়, কলাভবনে বা বাংলা পড়তে এসেও অনেক অভারতীয়কে বেশ ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে আমি নিজের কানেই শুনেছি। জাপানি মেয়েরা তো চমৎকার রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইত। হয়তো এরা পরে গানকে পেশা করেনি বলে এদের নাম ছড়িয়ে পড়েনি। জাপান থেকে বাংলা পড়তে এসে শান্তিদেব ঘোষের কাছে গান শিখে তোমোকো কাম্বে আজীবন রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চা করে গেছেন। আমার কাছে গান শেখার সময়ে ইউকা ওকুদা বারবার গানের অর্থ বুঝতে চেয়েছেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুধু অবাঙালিরা নয়, অভারতীয়রাও সার্থকভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারেন। শুধু ভাষাটা রপ্ত করা প্রয়োজন, উচ্চারণের স্পষ্টতা ও সঠিক সুরে গান শেখা প্রয়োজন, গানের ভাব বুঝে গাওয়াটা প্রয়োজন।