
হারমোনিয়াম নিয়ে নানা সময়ে নানা মন্তব্য করেছেন রবীন্দ্রনাথ
মৌলবাদ কথাটাকে আমরা শুধুমাত্র ধর্মের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করি বটে কিন্তু আদপে তার চেহারা ও চরিত্র আরও নানা বিভঙ্গেই ধরা পড়ে, যা অনেকসময় আমাদের তেমন চোখে পড়ে না। যেমন ধরা যাক, রবীন্দ্রনাথের গানের ক্ষেত্রে মডেল যন্ত্রানুষঙ্গ কী হতে পারে বা হওয়া উচিত এ নিয়ে একরকম মৌলবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আছে, অন্তত কিছুকাল আগে পর্যন্ত বেশ জ্যান্ত ছিল। ‘রবীনদোসোংগীত’ নামের একটা হুঁকোমুখো চিড়িয়া বাজারে নামার পর তাতে এত বিচিত্র বাদ্যযন্ত্রের মিলমিশ ঘটেছে যে ইদানীং কিছু কিছু নামজাদা ‘সিল্পি’, শুনি তিন কুড়ি চার কুড়ি যন্ত্রপাতি নিয়ে সেই ‘সোংগীতের’ জলসা কাম আদ্যশ্রাদ্ধ করে থাকেন। কিন্তু এর বাইরে শীলিত রবীন্দ্রগান-চর্চার পরিসরে একটা অঘোষিত বিধি এই যে, রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে সব থেকে বেশি মানানসই হল তানপুরা ও এস্রাজ। তালবাদ্য হিসেবে তবলা, খোল , মন্দিরা অনুমোদিত কিন্তু সুরের সহযোগী হিসেবে হারমোনিয়ামকে মানতে বহুদিন পর্যন্ত তারা নারাজ ছিলেন, ইদানিং মানেন তবে সেটা চাঁদ সদাগরের মনসা পুজোর মতোই প্রবল অনিচ্ছাজাত। কারণটা কী ?
এটা ঠিক, বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্রনাথের জীবৎকালে তাঁর গানের সঙ্গে তানপুরা ও এস্রাজ ব্যবহার হত। সেই সময়ে যারা সংগীত সমিতিতে গান শিখেছেন তাঁদের ভাষ্য এই তথ্যের পক্ষে। পাশাপাশি, এটা একটি জনশ্রুতি যে, রবীন্দ্রনাথ নাকি পাশ্চাত্য যন্ত্র হিসেবে হারমোনিয়ামের বিরোধী ছিলেন। এই বক্তব্যের কোনও সারমর্ম আছে বলে মনে হয় না। কারণ, পাশ্চাত্যের যন্ত্র হিসেবে রবীন্দ্রনাথ পিয়ানো ব্যবহার করেছেন তাঁর সংগীতজীবনের গোড়ার দিকেই। অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোর বাড়িতে পিয়ানো বাজিয়ে বাজিয়ে তাঁর গানে সুর দিচ্ছেন বা তিনি নিজেই পিয়ানো বাজিয়ে নিজের গানে সুর তুলছেন এইসব বর্ণনা তো তাঁর নিজের লেখাতেই পাওয়া যায়। আর যদি তাঁর কিছু গানকে একটু আলাদা করে নেওয়া যায়, যেমন: “সকলই ফুরালো স্বপনপ্রায়”, “তুমি আমাদের পিতা”, “সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে”, “ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে”, “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে” ইত্যাদি নানা গানের সুরের ছাঁচটাই এমন যা কেবল পিয়ানো যন্ত্রেই খোলতাই হয়ে ধরা যায়। আর এইসব গানগুলি বেশিরভাগ ব্রাহ্মমন্দিরের উপাসনা সংগীত হিসেবে গীত হত। এখানে খৃস্টীয় চার্চে পিয়ানো বাজিয়ে প্রার্থনা সংগীত বা গস্পেলএর সঙ্গে এই গানের ছাঁচগুলো বেশি কাছাকাছি এবং ভারতীয় উপাসনা সংগীতের ক্ষেত্রে একদম ব্যতিক্রমী।
হারমোনিয়াম নিয়ে রবীন্দ্রনাথ নানা সময়ে নানা মন্তব্য করেছেন। ১৯ জানুয়ারি ১৯৪০ এ লেখা একটি চিঠিতে কবি আকাশবাণী কলকাতার সেই সময়কার স্টেশন ডিরেক্টর অশোক কুমার সেন-কে লিখেছেন “I have always been very much against the prevalent use of Harmonium for purpose of accompaniment in our music and it is banished completely from our ashram. You will be doing a great service to the cause of Indian Music if you get it abandoned in the studio of All India Radio”
এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আকাশবাণীতে হারমোনিয়াম ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়। পরে স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরুজিও কবির এই অনুরোধ বহাল রাখেন। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দিলীপকুমার রায়, শচীন দেববর্মণ, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ আকাশবাণীতে গান গাওয়া বন্ধ করে দেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’ তে চন্দননগরে মোরাম সাহেবের বাগান বাড়িতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও কাদম্বরী দেবীর সঙ্গে তাঁর কাটানো সময়ের যে স্মৃতিযাপন করেছেন সেখানে তিনি লিখছেন: “আমার গঙ্গাতীরের সেই সুন্দর দিনগুলি গঙ্গার জলে উৎসর্গ করা পূর্ণ বিকশিত পদ্মফুলের মতো একটি একটি করিয়া ভাসিয়া যাইতে লাগিল। কখনো-বা ঘনঘোর বর্ষার দিনে হারমোনিয়াম যন্ত্র যোগে বিদ্যাপতির “ভরা বাদর মাহ ভাদর” পদটিতে মনের মতো সুর বসাইয়া বর্ষার রাগিনী গাহিতে গাহিতে বৃষ্টিপাত মুখরিত জলধারাচ্ছন্ন মধ্যাহ্ন খ্যাপার মতো কাটাইয়া দিতাম”। ফলে গান পরিবেশনের ক্ষেত্রে হারমোনিয়াম একদমই পরিত্যাজ্য এমন কোনও স্বতঃসিদ্ধ কখনও ছিল না।
তবে একটা সময় ‘শান্তিনিকেতনী’ ঘরানা বলে একটা কিছু প্রচলিত হয় যার অনুষঙ্গ হিসেবে রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে সুরযন্ত্র হিসেবে তানপুরা, এস্রাজ ও তালবাদ্য হিসেবে প্রচলিত হয় তবলা, পাখোয়াজ, মন্দিরা ইত্যাদি। তবে রবীন্দ্রনাথের উত্তরপ্রয়াণকালে কলকাতার সংগীত শিক্ষায়তনগুলিতে তাঁর গানের সঙ্গে হারমোনিয়াম বেজেছে। গ্রামোফোন কোম্পানিতেও সবরকম বাজনার সঙ্গেই গান রেকর্ড করা হয়েছে, হারমোনিয়াম সেখানে ব্রাত্য ছিল না।
দেবব্রত বিশ্বাসের গান বিষয়ে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড যে আপত্তি জানিয়েছিলেন আদপে তা কিন্তু তাঁর গানের গায়কি নিয়ে নয়, তাঁদের আপত্তির জায়গা ছিল গানের যন্ত্রানুষঙ্গ । তাঁরা জর্জ বিশ্বাসকে যে চিঠি দিয়েছিলেন তাতে বলেছিলেন, গানের যন্ত্রানুষঙ্গ গানের ভাব বা ব্যঞ্জনার সঙ্গে ডিসকর্ডান্ট যার কাছাকাছি পরিভাষা হতে পারে বেমানান বা বেসুরো। এখন কথাটা হল, গানের গায়কি বা স্বরক্ষেপণের সঙ্গে বেসুরো শব্দটা প্রয়োগ করলে তার একটা মাপকাঠি হল স্বরলিপি – কারণ সেটা স্বয়ং সুরকার ও গীতিকার অনুমোদিত আর তাই সেটাকে একটা স্ট্যান্ডার্ড বলে ধরা চলে। কিন্তু যন্ত্রানুষঙ্গর ক্ষেত্রে এমন কোনও মাপক নেই, কারণ, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের ক্ষেত্রে সমস্ত কিছু সুনির্দিষ্ট করে দিলেও দুটি ক্ষেত্রে কিছু বলেননি – গানের লয় ও তার যন্ত্রানুষঙ্গ ।
তাহলে এই ডিসকর্ডান্ট বা বেসুরো বিশেষণের তাৎপর্য কোথায়? কার্যত এই অভিযোগের কোনও বাস্তব ভিত্তি ছিল না। এই কারণেই ছিল না যে ‘বেসুরো’ কথাটি আসলে একটা সাবজেক্টিভ কথা। যেখানে রবীন্দ্রনাথের গানে যন্ত্র নিয়ে কোনও দিক নির্দেশ নেই, সেখানে কোনটা সুরের ব্যঞ্জনা ফুটিয়ে তুলছে বা তুলছে না এই বিচারের কোনও মাপকাঠিই নেই। দেবব্রত তাঁর পাল্টা চিঠিতে ঠিক এই কথাগুলোই জানিয়েছিলেন সেইদিন। তিনি লিখছেন, “…. In the matter of recording of Tagore songs, it was the function of Music Board to check up whether there was any deviation from the printed Notation. I have thoroughly gone through the works of Tagore and also listened to his speeches relating to the subject but nowhere in his writing I have found the Poet prescribing any limits to ‘Music Accompaniment’ … As such it occurs to me that the Examiner of Music Board has assumed the role of a Dictator…”
কথাটা একইভাবে প্রযোজ্য হারমোনিয়ামের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও। যেখানে কোনও স্পষ্ট নির্দেশ নেই সেখানে একদল অকুতোভয় ‘গ্রেট ডিক্টেটর’ এমন সব নিদান হেঁকে বাজার গরম করতে পছন্দ করেন। এরা এইটুকু বোঝেন না রবীন্দ্রনাথের মতো অসীম সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের পক্ষে নানা সময় নানা ভাবনার শরিক হওয়া খুব স্বাভাবিক, এটা তার অসংগতি নয় । শেষ বয়সে, আর্জেন্টিনার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তাঁদের ভিজিটার বুকে এই মানুষটাই লিখেছেন, “My greatest Virtue and my greatest Vice is my inconsistency!”
হায়, নিরেট মাথার মৌলবাদীরা যদি এর মর্মকথা বুঝতেন! বলছিলাম না, মৌলবাদের নাতিপুতিরা ছড়িয়ে আছেন সব জায়গায়!
