বাংলা লিটল ম্যাগাজিন ফোরাম আয়োজিত লিটল ম্যাগাজিন মেলার দ্বিতীয় বর্ষ
বুদ্ধদেব বসু এক জায়গায় লিখেছেন, “এক রকমের পত্রিকা আছে, যা রেল স্টেশনে পাওয়া যায় না, ফুটপাথে কিনতে হলেও বিস্তর ঘুরতে হয়, কিন্তু যা একবার হাতে এলে আমরা চোখ বুলিয়ে সরিয়ে রাখি না, চেখে-চেখে আস্তে আস্তে পড়ি, আর পড়া হয়ে গেলে গরম কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে ন্যাপথলিনগন্ধী তোরঙ্গে তুলে রাখি- জল, পোকা আর অপহারকের আক্রমণ থেকে বাঁচবার জন্য। এই দ্বিতীয় শ্রেণিতে যে-সব পত্রিকা পড়তে চায়- কৃতিত্ব যেটুকুই হোক, অন্ততপক্ষে নজরটা যাদের উঁচুর দিকে, তাদের জন্য নতুন একটা নাম বেরিয়েছে মার্কিন দেশে- চলতি কালের ইংরেজি বুলিতে এদের বলা হয়ে থাকে লিটল ম্যাগাজিন।”

সাহিত্য সংস্কৃতি রাজনীতির অন্যতম চর্চার জায়গা এই লিটল ম্যাগাজিন। আবার কখনও তা হয়ে ওঠে তরুণদের একমাত্র প্ল্যাটফর্ম। যেখান থেকে তাঁরা স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। পৌঁছে যান নতুন নতুন পাঠকদের অন্দরমহলে। বিগত কয়েকবছর ধরেই কলকাতা সহ বাইরে সারা পশ্চিমবঙ্গের বহু জেলা-মফস্বলে গড়ে উঠেছে লিটল ম্যাগাজিন মেলা। তাতে অংশগ্রহণ করছে শয়ে শয়ে পত্র-পত্রিকা। এমনই কিছু চিন্তাভাবনা নিয়ে বাংলা লিটল ম্যাগাজিন ফোরাম গত বছর থেকে লিটল ম্যাগাজিন মেলা আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৮ সালে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ভারতসভা হলে। এবছর ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হল জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির দ্বারকানাথ মঞ্চে। এবছর মেলায় অংশগ্রহণ করেছিল প্রায় ১৪০টি পত্রিকা। ফোরামের সদস্যরা শুরু থেকেই এই মেলার ডাকনাম হিসাবে বেছে নিয়েছে ‘আমাদের মেলা’। অর্থাৎ শুরু থেকেই এই মেলা সকলের মতামতকে প্রাধান্য দিয়েছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর ফোরামের সার্বজনীন সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলিকে মান্যতা দিয়েই এবারের মেলা। মেলার যুগ্ম সম্পাদক অভিষেক চক্রবর্তী বলেন, “এ মেলা পাঠকের, লেখকের, সম্পাদকের। তাই এ মেলা আপনার, আমার সবার মেলা। আমাদের মেলা। আমরা কোনও গোষ্ঠী নই। লিটল ম্যাগাজিনের সাথীরা মিলেই লিটল ম্যাগাজিন ফোরাম। এবছর প্রায় দেড়শোর কাছাকাছি পত্রিকা অংশগ্রহণ করেছে। বাংলার বিভিন্ন জেলা এমনকি বাংলাদেশ থেকে তাঁরা এসেছেন। এই ভালোবাসা অমূল্য।”

আরও পড়ুন
একশোর বেশি পত্রিকার জমায়েত কলেজ স্কোয়ারে
উদ্বোধনের দিন হাজির ছিলেন বিশিষ্টরা- দেবেশ রায়, জ্যোতির্ময় দত্ত, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, কালীকৃষ্ণ গুহ, অমর মিত্র, রমানাথ রায়। এই লিটল ম্যাগাজিন মেলার মূল মঞ্চটি উৎসর্গ করা হয় কবি মণীন্দ্র গুপ্তকে। এছাড়াও ২০১৮ সালে প্রয়াত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদেরও স্মরণ করা হয়। লিটল ম্যাগাজিন প্রধানত একটি অসংগঠিত উদ্যোগ। প্রতিষ্ঠানের বাইরে চলাফেরা করাই তার ধর্ম। তাই সে অনেক দায় থেকে মুক্ত। লিটল ম্যাগাজিন তার নিজস্ব সময়ের কথা বলে। আর এখানেই সে সবার থেকে আলাদা। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির এই মেলায় অংশগ্রহণ করেছিল ভাষালিপি, গুরুচণ্ডালী, একশো আশি ডিগ্রি, কালকথা, আঙ্গিক, আচমন, কবিয়াল, ইতিকথা, মাস্তুল, নাটমন্দির, ঐহিক, গ্রাফিত্তি, একক মাত্রা, তবুও প্রয়াস, উচ্চারণ, জলটুঙ্গি, দাহপত্র, জলঘড়ি, এপার ওপার ইছামতী সহ আরও অনেক পত্র-পত্রিকা।

লিটল ম্যাগাজিন নামে ক্ষুদ্র, কিন্তু মমনে মেধায় বৃহৎ। তাকে কখনও দমিয়ে রাখা যাবে না। ফোরামের এই মেলা তা আরেকবার প্রমাণ করল। দুইদিনের এই মেলা পশ্চিমবঙ্গ সহ বিদেশী লেখক পাঠকদের জমায়েতে আনন্দমুখর হয়ে উঠেছিল। “বড়ো যদি হতে চাও ছোটো হও তবে”- এই স্লোগান গর্বের। আর এই গর্ব নিয়েই লিটল ম্যাগাজিন কর্মীরা তাঁদের আন্দোলনকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।