রক্তক্ষরণের বিকল্প নাম লিটল ম্যাগাজিন

বর্তমান সময়ে লিটল ম্যাগাজিন সংস্কৃতির শিরা-উপশিরা নিয়ে কিছু ভাবনা

লিটল ম্যাগাজিনকে কি কাল্ট বলব? নাকি প্যাশন? সেই ইচ্ছে , সেই গণতন্ত্র যা কারোর কথা মানে না, নীতিবাগীশ নয়, লিটল ম্যাগাজিনের গ্রহে সেই আবেগগুলোই তো জলবায়ু, মাটি। লিটল ম্যাগাজিনের লেখাগুলো আমাদের আদর্শ শেখায় না, বরং জীবনকে তুলে ধরে , যা যাপনের অর্থ বোঝায় , রক্তক্ষরণ করাতে পারে। হ্যাঁ, সেসব লেখা যার বাঁধভাঙা অর্গল নেই। আপনি সেই লেখাকে ভালবাসতে পারেন , ঘেন্না করতে পারেন। কিন্তু এড়াতে পারবেনা মোটেও। এই পরিসরে লেখালেখি জীবনের একটা বিকল্প আর্ট । লিটল কেন বলি আমরা? কারণ এখানে সেসব সম্পাদকেরা কাজ করেন যাঁঁরা খুঁজে আনেন সেসব লেখক, যাঁঁদের কেউ চেনে না, সেইসব বিষয় যা নিয়ে কাজ হয়নি। ভুল বললাম, তা নিয়ে কাজ করার সময় হয়ে ওঠেনি প্রথাগত প্রকাশনী আর কমার্শিয়াল হাউসের। লিটল ম্যাগাজিনের মঞ্চে আপনি মন খুলে লিখতে পারবেন। আপনার ভাবনাকে কেউ রুদ্ধ করবে না। বিষয় নির্বাচন থেকে লেখনভঙ্গি, দুই ক্ষেত্রেই আপনি স্বাতন্ত্র্য ভাবে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন। পাতাভরা বিজ্ঞাপনের সংস্কৃতি থেকে অনেক দূরে , প্রকৃত লিটল ম্যাগাজিনের কর্মীরা নিজেদের পকেটের অর্থে ভর করে পত্রিকা চালান। কাজটা হয় হৃদয় থেকে। কমার্শিয়াল এই মঞ্চ থেকেই চিনে নেয় নতুন লেখক আর কবিদের, উদাহরণস্বরূপ রমেন্দ্রকুমার আচার্য, সুধীনবাবু, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, উৎপলকুমার বসু। মণীন্দ্র গুপ্ত আর দেবারতি মিত্রও লিটল ম্যাগাজিনের কর্মকাণ্ড থেকে পরিচিতি পেয়েছেন। অনেক পুরনো দিনের কথা বলছি ? আচ্ছা, তাহলে একটু বর্তমানে আসি। শোভন ভট্টাচার্য, শুভঙ্কর দাশ, রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, অভীক বন্দ্যোপাধ্যায় , অনির্বাণ দাস অথবা অনির্বাণ ধরিত্রীপুত্র, অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ইত্যাদি কবি, গদ্যকারেরাও এই সংস্কৃতির উজ্জ্বল ফসল। এঁদের অসামান্য লেখা , যাপন বাংলা সাহিত্যের নতুন দরজা খুলেছে।

এই সময়ে কলকাতার কেন্দ্রে আর মফস্বলে অনেক লিটল ম্যাগাজিন ভালো কাজ করছে। মানিকতলা অঞ্চলের পত্রিকা 'জলঘড়ি'। বড্ড যত্ন করে পত্রিকাটি প্রকাশ করা হয়। সম্পাদকমণ্ডলীতে আছেন অর্ধেন্দুশেখর গোস্বামী, শক্তিসাধন মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। জলঘড়ির প্রতি সংখ্যায় একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র থাকে। হিমালয় পর্বতশ্রেণি , বন্যপ্রাণ অথবা হিন্দুকলেজ নিয়ে অসামান্য কাজ করেছে জলঘড়ি। আর একটি লিটল ম্যাগাজিন হল 'একশো আশি ডিগ্রি'। আট বছর ধরে পত্রিকাটি দারুণ কাজ করছে। প্রকাশিত হয় দক্ষিণেশ্বর থেকে। অভিষেক চক্রবর্তী পত্রিকার সম্পাদক। একেবারে মনে আঁকা রয়েছে ফাল্গুনী রায় সংখ্যা,যার মুখ্য আকর্ষণ তার অগ্রন্থিত কবিতা, চিঠি। আজও মানুষ খোঁজ করে পত্রিকার এই সংখ্যাটি। আরেকটি অসামান্য সংখ্যা কথার কথা। ঋত্বিক ঘটক, মণীন্দ্র গুপ্ত, কিম কি দুকের অমূল্য সাক্ষাত্কার নিয়ে একশো আশি ডিগ্রি অন্য একটি চিত্তাকর্ষক সংখ্যাও প্রকাশ করেছে। এই পত্রিকাটির উল্লেখযোগ্য প্রকাশ হল শ্মশান সংখ্যা যা আমাদের শেখায় মৃত্যুকে সম্পূর্ণ অন্য আঙ্গিকে দেখতে। আমরা জানতে পারি শর্মী পাণ্ডের শ্মশানকে কীভাবে একটি সুলভ শৌচালয় ভেবেছেন কিংবা অন্ত্যেষ্টি বলে একটি সংস্থা কীভাবে সদ্যমৃত ব্যক্তিদের শ্রাদ্ধের দায়িত্ব নিচ্ছে । আমরা কথা বলতে পারি সম্পাদক পৃথ্বী বসুর 'দশমিক' পত্রিকাটি নিয়েও। পত্রিকাটির নির্মল হালদার সংখ্যাটি অসামান্য। সাধারণ সংখ্যায় ভাস্কর চক্রবর্তীকে নিয়ে লেখা, মতি নন্দীর " কবি নই" এক কথায় অনবদ্য।মণীন্দ্র গুপ্তর প্রয়াণের পর স্বকাল পত্রিকা মণীন্দ্র গুপ্তর চিঠিপত্র প্রবন্ধ প্রচ্ছদ সমস্ত কিছু নেই একটি পত্রিকা করেন যা সংগ্রহের মতো। সম্পাদক সুস্নাত চৌধুরীর 'বোধশব্দ' পত্রিকা অসামান্য কাজ করেছে কবিতার বিপণন বিষয়টিকে সামনে রেখে। এই পত্রিকায় আমরা পাই রণজিৎ দাশের সাক্ষাত্কার " বাংলা কবিতা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতার ফার্টাইল গ্রাউন্ড",পূর্ণেন্দু পত্রীর বিভাব বা মণীন্দ্র গুপ্তর এক বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতা। বিষয়বস্তু আর বিন্যাসে অসামান্য সংকলন। 'দাহপত্র' একটি চব্বিশ বছরের পুরনো পত্রিকা। একটানা খুব সুন্দর কাজের সাক্ষর রাখছেন সম্পাদকদ্বয় কমলকুমার দত্ত আর সন্তু দাস। এই পত্রিকার নানান সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতার কালেকশন। কবিরা ছিলেন শৌভ চট্টোপাধ্যায় , তন্ময় ভট্টাচার্য , সেলিম মণ্ডল ইত্যাদি।

এই সমস্ত লিটল ম্যাগাজিনের সংরক্ষণ করছেন সন্দীপ দত্ত। কলকাতার টেমার লেনে নিজের পৈতৃক বাড়িতে লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাগারের প্রতিষ্ঠাতা উনি। একটানা তুলনাহীন কাজ করছেন ১৯৭৮ থেকে। প্রকৃত সাহিত্যর খোঁজে পাঠক লিটল ম্যাগাজিনের কাছে আসে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আজও অনেকে ভাবে লিটল ম্যাগাজিন সহজে অর্থ উপার্জন করার একটা পন্থা। এই ধারণা ভুল। মানুষ লিটল ম্যাগাজিন করেন নতুন লেখকদের খুঁজে বের করার খাতিরে, পাঠকদের অভিজ্ঞতায় উত্তরণ ঘটানোর খাতিরে। বরং টাকাপয়সার ব্যাপারে ভাবা হয় না বলেই অনেক সময়ে বহু লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। আর্থিক অনটন আর বড় প্রকাশনা সংস্থাগুলোর রাজনীতি থাকা সত্ত্বেও লিটল ম্যাগাজিনের এই সংস্কৃতি কলার তুলে হেঁটেচলে বেড়াচ্ছে। এস্থেটেজিম নিয়ে যাবতীয় বোধের অন্যতম উৎস হল লিটল ম্যাগাজিন। বাংলা সাহিত্যের এক বিশাল জগতে লিটল ম্যাগাজিনের গাছপালা চিরহরিৎ, যা বিকল্প লেখালেখির সুলুকসন্ধান দিয়ে প্রাণিত করে সমগ্র সাহিত্যপ্রেমীদের।
 

Developed by DXDasia