বাঙালি-পাঞ্জাবি বুঝি না, নিজেকে শান্তিনিকেতনের মানুষ বলতেই ভালোবাসি

মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন — পর্ব ১৮

“মাঝে মাঝে সন্ধেবেলা শান্তিদা আসতেন। বলতেন, দিনুদার গানের গতিটা কে নিয়েছে বলো? নাট-বল্টু সব এখন ঢিলে হয়ে গিয়েছে। তোমার গানে সেই গতিটা আবার খুঁজে পেলাম।” 

মোহন সিং বলেন, কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথের গানে অতিরিক্ত ভাব আনতে গিয়ে সুর, তাল ভুলে যান। মনে রাখতে হবে, দুঃখের গান মানেই কান্নাকাটি করা নয়। রবীন্দ্রনাথের দুঃখের গানে যে আগুন আছে, সেটাকে স্পর্শ করতে হবে। মোহন আজীবন সেই চেষ্টাই করে এসেছেন।

(গত পর্বের পর) 

মোহন সিং কি রাবীন্দ্রিক নন? অবশ্যই রাবীন্দ্রিক। রাবীন্দ্রিক তিনি প্রথম থেকেই। রবীন্দ্রনাথের গান তাঁকে বোধ দিয়েছিল। জীবনের শুরুর পর্যায়ে শান্তিদেব ঘোষের মতো মানুষের সান্নিধ্যে এসেছিলেন। তবে এ-ও ঠিক, প্রথম থেকেই মোহন খেয়াল গান, ধ্রুপদ গান। তিনি রবীন্দ্রসংগীত কখনও কাউকে শেখান না। তবু শ্রোতারা তাঁকে শুধুমাত্র রবীন্দ্রসংগীতের গাইয়ের ছাপই দিয়ে দিয়েছেন।

মোহন সিং-এর সংগীত জীবনের দুটি দিক— গান এবং এসরাজ। কিন্তু তিনি মনে করেন সংগীতের আসলে কোনো জাত হয় না। সে খেয়াল হোক, ধ্রুপদ হোক, রবীন্দ্রসংগীত হোক বা লোকগান। কিন্তু ওই ফর্মটি চিনতে হয়৷ রবীন্দ্রনাথের গান কীভাবে হওয়া উচিত, খেয়াল কীভাবে হওয়া উচিত, ধ্রুপদ কীভাবে হওয়া উচিত— এদের আইডেন্টিটি মনের মধ্যে আসা দরকার। রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্যে যদি খেয়ালের তাল যুক্ত করা হয়, তাহলে অন্যায় করা হবে। অনুভব করতে হবে ভাষা, ভাব, চলন, ছন্দ, কথা। "What is the dimension of notes which he use" — আসলে মোহন সিং বোঝেন না ভাঙা গান কাকে বলে। রবীন্দ্রনাথের ৪৪-৪৫ বছর বয়সের যেসব গান, সেগুলো আর কেউ ভাঙতে পারছে না। সিলেবাসের সুবিধার্থে তাই খুচরো খুচরো ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। পূজার গান, প্রেমের গান, বর্ষার গান কিংবা দোলের গান। আসলে এগুলো কিছুই না, তাঁর গান সঠিক সুর ও তাল মেনে গাইলে তবেই শ্রদ্ধা জানানো হবে। কী রাগ-রাগিনী উনি ব্যবহার করেছেন তা খোঁজার চেষ্টা করতে হবে।

ভারতীয় ডাকটিকিটে মোহন সিং-এর স্ট্যাম্প

রবীন্দ্রনাথের কীর্তনাঙ্গের গান কয়েকটি মাত্র আছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে ৩০-৪০টি গান কীর্তনাঙ্গের গান বলে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ আসলে আস্ত একটি দেওয়াল, যেটা টপকানো খুব মুশকিল। আমরা দেওয়ালের একদিকে নাচানাচি করছি। 

মোহন সিং-এর জন্ম পঞ্জাব রাজ্যে। তারপর পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে সেই কবে চলে এসেছিলেন পড়াশোনা করতে৷ পাকাপাকিভাবে সেখানেই থেকে গেলেন৷ তাই উত্তর আসবে, নিজেকে শান্তিনিকেতনের মানুষ বলতেই বেশি ভালোবাসেন— বাঙালি পাঞ্জাবি এসব বুঝতে চান না— মানুষ তো মানুষই হবে— সেটিই একমাত্র পরিচয় হওয়া উচিত৷ তাই তাঁর প্রথম গানের ক্যাসেটেও লেখা ছিল— মোহন সিং শান্তিনিকেতন। 

সংগীত জগতে বিশেষ ভূমিকা পালন করার জন্য ঐতিহ্যবাহী সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার

কিছু কিছু মানুষ হয়তো আমাদের জীবনে এইভাবেই রয়ে যান তাঁর নিজস্ব বোধ নিয়ে। যে বোধের আলো থেকে ঠিকরে পড়ে কোনো প্রভাত সংগীত৷ এই বুঝি কোন আলেয়ার হ্রদ থেকে এসরাজ আর ধ্রুপদি তালে মোহন সিং উচ্চাঙ্গে গান ধরবেন।

(চলবে…) 

*মূল সাক্ষাৎকার গ্রাহক— অর্পিতা চ্যাটার্জি
অনিবার্য কারণবশত এখন কোনও ভিডিও ক্লিপিং রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

Developed by DXDasia