দুই ছেলের সংগীতচর্চায় মোহন সিং-এর তেমন কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না

দুই ছেলের সংগীতচর্চায় মোহন সিং-এর তেমন কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না

মোহন সিং-ও বারবার আসেন তাঁর উদাত্ত সুর নিয়ে। তাঁর মুখে লেগে থাকে অমলিন হাসি। মোহন রূপের দরজায় তখন কড়া নাড়ে রাগ-রাগিনীর সুবিস্তৃত চরাচর। বেখেয়ালে তাঁকে ডেকে যান রামকিংকর বেইজ। হাত ধরে জ্যোৎস্নার চাঁদ দেখান ঋত্বিক ঘটক। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় হেসে হেসে বলতে থাকেন, "কী, কেমন দিলাম? সেই তো শান্তিনিকেতনেই থেকে যেতে হল। কোত্থাও যেতে পারবে না। এই বলে দিলুম।" উস্তাদজি আসেন নিভৃতে। নীপবন পার করে সম্মুখে এসে দাঁড়ান শান্তিদেব ঘোষ। একটা সহজপাঠ মোহনের হাতে ধরিয়ে মুচকি হেসে চলে যান শুচিস্মিতা। বিক্রম আসেন রবি ঠাকুরের গান গাইতে গাইতে। দাদার পাশে এস্রাজ হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন আবির।

এ এক আশ্চর্য দুনিয়া। সময় আর মহাকাল বারবার মোহন সিং-দের জিতিয়ে দিয়ে চলে যায়। শুধু রয়ে যায় এরকম নজরকাড়া দৃশ্যের একটি চলচ্চিত্র। যেখানে সুরের মূর্চ্ছনাই শেষ কথা।

(গত পর্বের পর) 

গল্প করতে করতে মোহনের বারবার মনে পড়ে যায় প্রিয় মোহরদির (কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়) কথা। একদিন মোহরদিকে বলা হয়েছে খিচুড়ি রান্না করতে। মোহরদি সেদিন পরিমাণ বুঝতে পারেননি। চাল আর ডাল সমান সমান নিয়ে অনেক সবজি ফুটন্ত জলে দিয়ে দিয়েছিলেন। উপর থেকে সব উপচে পড়ছে। মোহনদের প্রিয়  "সাধুবাবা তখন মোহরদিকে বললেন, খেতেই জানো শুধু, রান্না করতে জানো না। সেই খিচুড়ি যে কতগুলো কড়াইয়ের মধ্যে ঢালা হল, সে কী বলব! পরিমাণে এতই যে শেষ আর হয় না। মোহরদি সেদিন প্রথম খিচুড়ি রান্না করেছিলেন। আমরা তৃপ্তি করে ওই খাবারটিই খেয়েছিলাম।"

পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তেমন কোনও বার্তা নেই মোহন সিং-এর। বাড়িতে নিজের সন্তানদের ক্ষেত্রেও তাই। এই যেমন বিক্রম, কলেজে পড়াশোনা করতেন, লেখালেখি করতেন, ছবি আঁকতেন, পাশাপাশি গানের রেওয়াজ চলত সেই ছোট্টবেলা থেকে। গানের সুর তাঁকে কখনও ছেড়ে যায়নি। তার কারণটা পুরোপুরি মোহন সিং হয়তো নন। বাড়িতে সবসময় গান চলছে। সেই সুরের যাত্রাপথ বিক্রমকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল সেই কোন ছোটোবেলায়। তাই বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত থাকলেও বিক্রম সিংকে মানুষ মনে রেখেছে একজন সফল সংগীতশিল্পী হিসাবেই। অন্যদিকে ছোটো ছেলে আবির চলে গেলেন পুরোপুরি যন্ত্রে। দুই সন্তানের এই সংগীতচর্চার ক্ষেত্রে মোহন সিং-এর কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না। কিন্তু ঘটনাচক্রে এরকম একটি সংগীত পরিবার থেকে দুই তরুণ উঠে আসছেন— একজন কণ্ঠে, আরেকজন যন্ত্রে। বিক্রম সিং গাইলেন রাগ সংগীত, রবীন্দ্রসংগীত আর আবিরের হাতে উঠল এসরাজ। 

আনন্দ পুরস্কারের অনুষ্ঠানে মোহন  সিং

আমরা যারা কমবেশি মোহন সিং খাঙ্গুরার গান-বাজনা এবং বিপুল কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে অল্পবিস্তর জানি, তারা জেনে গিয়েছি যে, তাঁর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এসরাজ এবং তানপুরা বাদ্যযন্ত্রদুটি। এই জীবনালেখ্য যাঁরা প্রথম পর্ব থেকে পড়ছেন, একথা বিস্তারে জেনে থাকবেন। এই দুটি বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে শাস্ত্রীয় ও রবীন্দ্রনাথের গান লালিত হয়েছে।

মোহন সিং-এর বাল্যবন্ধু টুকু অর্থাৎ রনধীর রায়ের বাদ্যযন্ত্র দেখলেই টুং টাং করতেন আবির। একবার কোনো একটি তার খুলে যাওয়ায় ছোট্ট আবির বাঁধতে শুরু করেছিল। সেই দেখে চমকে উঠেছিলেন রনধীরবাবু। এতটুকু বয়সে এত সুন্দর করে তার বাঁধছে বাদ্যযন্ত্রে! সেই শুরু। আরেক সন্তান বিক্রম। স্বাতন্ত্রতায় যিনি আজও প্রত্যেকটি সংগীতপ্রেমীর হৃদয়ের নয়ন জুড়ে থেকে গেছেন। বিক্রম সিং-এর কথা উঠতেই বাবা মোহন সিং বলেন, বিক্রমের জন্ম পাঞ্জাবে। গায়ের রং ছিল গোলাপি। সেই থেকে মায়ের দেওয়া নাম ‘পিঙ্কু’। প্রথম ‘সা’ লাগিয়েছিল মাত্র দেড় বছর বয়সে।

(চলবে…)

*মূল সাক্ষাৎকার গ্রাহক— অর্পিতা চ্যাটার্জি

অনিবার্য কারণবশত এখন কোনও ভিডিও ক্লিপিং রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

Developed by DXDasia