
মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন — পর্ব ১৫
অনেক বছর হল শুচিস্মিতা নেই। এই শুচিস্মিতাই একসময় বাংলা শিখিয়েছিলেন মোহনকে। মোহন বাঁশির রূপ আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন আদরের সুমু। যেখান থেকে শান্তিনিকেতনের মাঠ-ঘাট-রাস্তা-সোনাঝুরি-লালবাঁধ-তেপান্তর ছাড়িয়ে তাঁদের প্রেম হয়ে উঠেছিল জ্যোৎস্না রাতের ক্ষণিক আলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন, "যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই -/ যা দেখেছি, যা পেয়েছি, তুলনা তার নাই।/ এই জ্যোতিসমুদ্র মাঝে যে শতদল পদ্ম রাজে/ তারি মধু পান করেছি, ধন্য আমি তাই।" — এই দেখা আর পাওয়ার মাঝে বিস্তৃত সংসারের সমুদ্র। প্রিয় সুমুরা অন্তরের মায়ায় থেকে যান আদিগন্ত।
(গত পর্বের পর)
সবুজ সংকেত আসে লালবাঁধের ধার থেকে। পুরোনো স্মৃতির ধুলো এই বুঝি উড়ে এল তেপান্তরের সুবিস্তৃত মাঠ পেরিয়ে ওপারের গ্রাম-গঞ্জ থেকে৷ কোন খেয়ালে গেয়ে চলে উদাসপুরের পথিক বাউল — সোনাঝুরির বাতাস এসে লাগে একতারার মূর্চ্ছনায়। ভোর হয় হয় বুঝি! ঠাটঃ ভৈরবীর আখ্যান যেন সংকীর্ণ শ্রেণি ও সরল বক্রগতির নাতিচঞ্চল শান্ত প্রকৃতির ভক্তি এবং ধ্রুপদ ও ঠুমরী অঙ্গে প্রচলিত হয়ে সূর্যের গতিতে সে নিজস্ব আকার ধারণ করছে। এদিকে মোহন সিং তাঁর জীবনপর্যায়ের সমস্ত রাগ-রাগিনী নিয়ে চেয়ে আছেন খোলা আকাশের দিকে। যেখানে পাখিদের কলকাকলির ডানায় ভর করে উড়ে চলেছে উদাত্ত সুর-সপ্তক৷
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব একবার বলেছিলেন, "একটা আম খেলে মাতোয়ারা হয়ে যাই, তো বাবুর বাগানে কটা গাছ, বছরে কবার ফল দেয় সে খবরে কী দরকার?"
— কথাটা এক দিক থেকে ঠিক। কিন্তু পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে, সব রকমের আম একই ভাবে কিন্তু খাওয়া যায় না। এই যেমন মুর্শিদাবাদের এক রকমের আম আছে যা দশ-বারো ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রাখতে হয়। রাতে তুলোর উপর রেখে কাটলে তবে তার সর্বোত্তম স্বাদ পাওয়া যায়। রাগও তো তেমনি। এক একজনের কাছে রাগ এক একরকমভাবে ধরা দেয়। ভাবের বহিঃপ্রকাশও তখন হয়তো পাল্টে পাল্টে যায়৷ অন্যদিকে আবার স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলছেন,
"একাকী গায়কের নহেকো গান, গাহিতে হবে দুইজনে।/ একজনা গাবে ছাড়িয়া গলা, আরজনা গাবে মনে।"
এইটিই হচ্ছে ভাবের বহিঃপ্রকাশ। একজন গলা ছেড়ে গাইবেন, অন্যজন মনে মনেও গাইতে পারেন। সমস্ত চলার রাস্তায় সততা থাকলে সুর আপনি এসে ধরা দেবে বৈকি!
আরও পড়ুন: “বাঙালি শ্রোতারা ছাপ মারতেই বেশি ভালোবাসেন” — মোহন সিং খাঙ্গুরা
মোহন সিং-ও বারবার আসেন তাঁর উদাত্ত সুর নিয়ে। তাঁর মুখে লেগে থাকে অমলিন হাসি। মোহন রূপের দরজায় তখন কড়া নাড়ে রাগ-রাগিনীর সুবিস্তৃত চরাচর। বেখেয়ালে তাঁকে ডেকে যান রামকিংকর বেইজ। হাত ধরে জ্যোৎস্নার চাঁদ দেখান ঋত্বিক ঘটক। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় হেসে হেসে বলতে থাকেন, "কী, কেমন দিলাম? সেই তো শান্তিনিকেতনেই থেকে যেতে হল। কোত্থাও যেতে পারবে না। এই বলে দিলুম।" উস্তাদজি আসেন নিভৃতে। নীপবন পার করে সম্মুখে এসে দাঁড়ান শান্তিদেব ঘোষ। একটা সহজপাঠ মোহনের হাতে ধরিয়ে মুচকি হেসে চলে যান শুচিস্মিতা। বিক্রম আসেন রবি ঠাকুরের গান গাইতে গাইতে। দাদার পাশে এস্রাজ হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন আবির।
এ এক আশ্চর্য দুনিয়া। সময় আর মহাকাল বারবার মোহন সিং-দের জিতিয়ে দিয়ে চলে যায়। শুধু রয়ে যায় এরকম নজরকাড়া দৃশ্যের একটি চলচ্চিত্র। যেখানে সুরের মূর্চ্ছনাই শেষ কথা।
(চলবে…)
*মূল সাক্ষাৎকার গ্রাহক— অর্পিতা চ্যাটার্জি
অনিবার্য কারণবশত এখন কোনও ভিডিও ক্লিপিং রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
