
অভিনন্দন ব্যানার্জির ‘মানিকবাবুর মেঘ’ ছবির একটি নিবিড় পাঠ
প্রথম দৃশ্য। একটি নগরের ছবি আকাশ থেকে। না মধ্য গগনে ক্যামেরা নেই। নগরের ডান দিকে হাওড়া ব্রিজ। সেই ১৯৪৩-এ প্রযুক্তির নিপুণ ব্যবহারে কলকাতা শহরে গতি জুড়ে দিয়েছিল বাকি দেশের সঙ্গে। স্যার আর এন মুখার্জি এ বাংলার প্রথম স্বীকৃত ইঞ্জিনিয়ার, এ কারিগরি বিস্ময়ের স্থপতি। কলকাতা চেনাতে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বা হাওড়া রবীন্দ্র সেতু কখনও বা দুই-ই ব্যবহার হয়ে আসছে। নগরের কলোনিয়াল ইতিহাসের সাক্ষ্য ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আনবেন পরিচালক অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়। যখন “বাঙালি পুরুষ কোট প্যান্ট পরলে তাকে ভালো লাগে” এবং তাই-ই মানিকবাবু প্রেমিকার সঙ্গে মোলাকাতের জন্য ভরা বৈশাখে চড়া দুপুরে কালো কোট প্যান্ট পরে ভিক্টোরিয়ার উল্টোদিকের ময়দানের মাঝে হাজির হবেন। ময়দানের ঘাসে চিৎ হয়ে শুয়ে প্রেমের নাগর মেঘের সঙ্গে দেয়ালা করেন। ঐ মাঠেই না প্রেমের তুফান ওড়ে সূর্যাস্তের পরে! এ দুই-ই কলকাতা নগর। দুই-ই প্রযুক্তি কারিগরি বিদ্যার অহংকারী প্রকাশ।

মানিকবাবু অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মরমী মানুষ। অভাব তাঁর সারা পরিসর জুড়ে। মাছের বাজারে স্বচ্ছল ক্রেতা যখন দামী রুই কাতলা কিনছে মানিকবাবু মাছ ও ক্রেতা দুই-ই জরিপ করে নেন। নিজের স্বাভাবিক লালসা তাঁর সারা অবয়ব ছেয়ে রাখে।
এই নগরের আরেক প্রান্তে ধাপায় যাবেন মানিকবাবু। পাঁচটি স্কাইস্ক্রেপার দূরে আর হাই ভোলটেজ বৈদ্যুতিক তার এবং টাওয়ার ব্যাকগ্রাউন্ডে। মানিকবাবু নিজের রাখা সম্পদ বর্জন করতে যাবেন। নগরের ভিন্ন ভিন্ন স্তরের বর্জ্য বাতিল জৈবিক অজৈবিক সবের ঠাঁই ধাপায়! এই নগরের পথের হোর্ডিং ভরা বিপণন বিজ্ঞাপন৷ সেখানে লজেন্সের গন্ধ বা দামী চার চাকার বিজ্ঞাপনে জন্তুর লাগাম ধরে নিয়ন্ত্রণ করার হাঁক, সঙ্গে ইমারতি লোহার হোর্ডিংও আছে। কোথাও বা “মেঘের সঙ্গে বসবাসের জন্য আবাসন স্কাইস্ক্রাপারের ডাক”। নগরের একটি বসত ঘরে আধুনিক প্রযুক্তি পরিত্যক্ত। সে ঘরের সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেই পাবেন অসংখ্য গাছের যত্নভরা বাগান। অকেজো ফ্রিজের কোলে কাঁখালে নবীন গাছের চারা। চার ঠ্যাঙা টুলের সঙ্গে সাদাকালো পেট মোটা পিকচার টিউবওয়ালা টিভি সেটের স্মৃতি আমাদের অনেকের। পিকচার টিউবের জায়গাটা ব্যবহার হয়েছে ছায়ালালিত গাছের আশ্রয় হিসেবে।
মানিকবাবু জনসংযোগের অত্যাবশ্যক উপকরণ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। তাই তাঁর সান্ধ্য জলখাবার পাওয়ার সুযোগ যে চলে গেছে জানতেও পারেন না। প্রায় মূক মানিকবাবু এ ছবিতে প্রথম কথা বলছেন ছাত্রকে বাচিক কলায় পারদর্শী করে তুলতে। ঠিকঠাক ছন্দে তালে সঠিক উচ্চারণে আবৃত্তি শেখানোর বিনিময়ে অফিস ফেরতা জলখাবার আর মাসের চারশো টাকা বেতন জুটিয়ে নিতেন। বাংলা শব্দের কিম্ভুত উচ্চারণে অভ্যস্ত ছেলেটির মা মানিকবাবুকে ছাড়িয়ে দেবেন কয়েক দিন পরে। কারণ ছেলেটি ইংরেজি শিখবে। ছবির আবৃত্তি শিক্ষার এই দৃশ্যে অভিনন্দন একটা ভূমিকা লিখে দিচ্ছেন সুকুমার রায়ের রোগশয্যায় লিখিত অতি গুরুত্বপূর্ণ ছড়া আবোল তাবোল দিয়ে — “মেঘ মুলুকে ঝাপসা রাতে/রামধনুকের আবছায়াতে/ তাল বেতালে খেয়াল সুরে/ তান ধরেছি কণ্ঠ পুরে… ”। এই অংশের পরে মানিকবাবুর স্বগোতক্তির মতো সেই ছাদবাগান জুড়ে আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে নাকি আকাশে ছড়িয়ে যাচ্ছে “আজকে দাদা যাবার আগে/ বলব যা মোর চিত্তে লাগে/ নাই বা তাহার অর্থ হোক/ নাই বা বুঝুক বেবাক লোক…”
ছবির একদম শুরুতে অভিনন্দন ডন কিখোটে (বা ডন ক্যুইকসোট) উদ্ধৃত করেছেন — When life itself seems lunatic, who knows where madness lies! ছাদ ভরা গাছ থেকে ডেঁও পিঁপড়ের লালনপালন এবং শয্যাবন্দি জরাগ্রস্ত বাবার প্রাত্যহিক প্রয়োজন মিটিয়ে মানিকবাবু আপিসের কেরানি হয়ে ওঠার পথ চলায় বাজপড়া গাছের গোড়ায় বেড়ে ওঠা অশ্বত্থ গাছের চারার জন্য মাটির জালা থেকে জল ভরে নিয়ে যান। এবং প্রত্যেকবার বজ্রাহত গাছটিকে দেখেন ঘাড় উঁচু করে! সেখানে কি পাতা আসবে!
ছবির সবটা লিখে দেওয়া মানে গল্প বলা। চলচ্চিত্র তো উপাখ্যান চিত্র। চলমান চিত্র। তাই কোনো মানে হয় না। কিছু খেই ধরিয়ে দেওয়া যায়। পড়ে যদি আপনি ছবিটা দেখতে যান! ভালো ছবি দেখার দর্শক চাই। হ্যাঁ, খানিক গল্প ইন্দ্রিয় সচেতন একটি পুরুষ নির্জনতা বেছে নিয়ে জরাগ্রস্ত পিতার শুশ্রূষা করছেন। ভোর হয় পাশের বাড়ির রেডিও থেকে ভেসে আসা রজনীকান্ত সেনের গানে ‘আমায় অভাবে রেখেছো সদা হরি হায়’। তারপর মানিকবাবুর বাবার টেপ রেকর্ডারে বাজে ‘মলয় বাতাসে ভেসে যাবো’। সঙ্গে তাঁর প্রয়াতা স্ত্রীর দেওয়াল ছবি। তিনি তাকিয়ে আছেন। মানিকবাবু যে মুহূর্তে টেপের ক্যাসেট থামিয়ে দিচ্ছেন অভিনন্দন বোঝালেন ওটুকুই তাঁর প্রয়োজন। একটা দেওয়াল ঘড়ি আর বহু ব্যবহৃত সাবেক টেপ রেকর্ডার — এই তো মানিকবাবুর বসতের ব্যবহৃত প্রযুক্তি। এরপর মানিকবাবু বাজার করার আগে প্রায় অভিভাবক কালী ভক্ত কালীদার দোকানে সকালের চা-পানের সঙ্গে শোনেন এবং উপভোগ করেন শচীদুলাল চক্র উপাধ্যায়ের লেখা ‘দে মা আমার চেতনা চৈতন্য করে’। চেতনা আর চৈতন্য এবং মানিকবাবুর স্মিত আনন্দময় হাসি।

চেতনা থেকে চৈতন্য অর্জনের যাত্রার ছবি মানিকবাবুর মেঘ। আকুল প্রেমে ফতুর হয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বিলীন হয়ে যাওয়ার ছবি মানিকবাবুর মেঘ। অফিস কেটে প্রেম। নিত্যদিনের চারপাশ হারিয়ে শুধু দয়িতের সঙ্গে অভিসার। আসঙ্গবাসনায় ঘরদোর সব ছেড়ে মাতাল যাত্রা।
মানিকবাবু অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মরমী মানুষ। অভাব তাঁর সারা পরিসর জুড়ে। মাছের বাজারে স্বচ্ছল ক্রেতা যখন দামী রুই কাতলা কিনছে মানিকবাবু মাছ ও ক্রেতা দুই-ই জরিপ করে নেন। নিজের স্বাভাবিক লালসা তাঁর সারা অবয়ব ছেয়ে রাখে। বাজারি হুল্লোড় থেকে ফিরে তাঁর কড়ায় গাঙ মৌরলা রান্না করেন। সেই সব থালায় মেখে ঠিক যে ভাবে কোলের শিশুকে মা নিজের থালা থেকে ভাত মাখিয়ে খাওয়ায় মাণিকবাবু বাবাকে খাইয়ে দেন রোজ! পিতৃ বিয়োগের পরে রাস্তার সস্তা পাইস হোটেলে রোদের নিচে খাচ্ছেন সে মুহূর্তে অনুভব করেন একটা ছায়া তাঁকে তাপের থেকে আড়াল করছে। ক্ষৌরকারের প্রাকৃতিক ডাকে মস্তক মুণ্ডন প্রায় সম্পূর্ণ রেখে খানিক ছেড়ে যাওয়া মানিকবাবু পিতৃ বিয়োগে ছায়া হারিয়েছেন তাও বুঝতে পারি আমরা। এই ছায়া যে মেঘের! পুরুষ কি একটা ছায়ার আশ্রয় আকাঙ্খা করে প্রেমের বাঁধনে! আমাদের বাংলা গানে রবিবাবুর মেঘ নিয়ে বিস্তর গান, জনপ্রিয় আধুনিক গানে মেঘ ভরে আছে!
১৯৬৯-এ শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ভূপেন হাজারিকার বিহু নির্ভর সুরে রুমা গুহঠাকুরতার গাওয়া গান ‘এক খানা মেঘ ভেসে এলো আকাশে…’৷ এই এক খানা মেঘ আমাদের ছিল। বাকি সব গানে মেঘের পরে মেঘ! হ্যাঁ একলা মেঘ যখন খরাধ্বস্ত গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে (ফুটপাতের টিভি সেট জানায় মেঘের আসা না আসার বিজ্ঞপ্তি) এক আকুল প্রেমে পুরুষের জন্য ধাবিত হয় নাকি দগ্ধ ‘ধরা প্রকৃতি’ তেষ্টা নিবারণের জন্য ঘনঘোর গর্জনে মানিকবাবুর প্রেমিকা সেজে হাজির হয়! আহ্লাদে আশ্লেষে মানিকবাবুর মেঘশৃঙ্গার নিবিড় নিভৃত সম্মেলন! প্রেমিকা বসার বেঞ্চি থেকে বুকের খাঁজ থেকে বের করা প্রেমপত্রের ঘ্রাণ মানিকবাবু বয়সকালে প্রেম করলে হাতড়ে শুঁকে বুক ভরে নিতেন — সেই মানিকবাবু ঘুড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছেন মেঘের জঙ্গলিপ্সা চরিতার্থ করতে।

চেতনা থেকে চৈতন্য অর্জনের যাত্রার ছবি মানিকবাবুর মেঘ। আকুল প্রেমে ফতুর হয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বিলীন হয়ে যাওয়ার ছবি মানিকবাবুর মেঘ। অফিস কেটে প্রেম। নিত্যদিনের চারপাশ হারিয়ে শুধু দয়িতের সঙ্গে অভিসার। আসঙ্গবাসনায় ঘরদোর সব ছেড়ে মাতাল যাত্রা। সর্বত্রগামী সোশ্যাল মিডিয়ার নিরেট বাঁচার অতিব্যস্ত দিনের শেষে আমার মনে হয় কই কারো সঙ্গে কথা হল কি? সত্যিই কি কথোপকথন নাকি শব্দোচ্চারণ মাত্র! মানুষী প্রেমের শর্তবন্দি যাপনের চারপাশে মনের কথা বলতে পারি কার সঙ্গে…
অভিনয় নিয়ে কী বলি! প্রথম আমরা মানিকবাবুর ঘুমন্ত চেহারায় আস্তে আস্তে জেগে ওঠার দৃশ্য খেয়াল করি কিংবা বাড়িওয়ালার ঘর ছাড়ার তাগিদে ‘কিছু পেলে?’ উত্তরে প্রেমোন্মাদ মানিকবাবুর গদগদ অভিব্যক্তি। কালীদাকে বিদায় জানানোর ক্ষণে একটা ফুল বাড়িয়ে দিয়ে অবাঙমনসগোচর আবেগে ছেড়ে যাওয়া। ঠিক এই মুহূর্তে কালীদা আহ কালীদা কেমন করে তাকান! বাড়িওয়ালা অরুণ গুহঠাকুরতা, কালীদা দেবেশ রায়চৌধুরী, পঙ্গু অনড় বাবা নিমাই ঘোষ — এঁরা চন্দন সেন-এর মানিকবাবুকে পরিপূর্ণ করতে সাহায্য করেছেন। সুনীল গাওস্কারের শততম শতরানের পরে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনি এই কৃতিত্ব অর্জনের পরে কী বলবেন? সুনীল বলেছিলেন, আমার প্রত্যেকটা শতরানের সঙ্গে আমার সঙ্গী যে ব্যাটসম্যানরা ছিলেন তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ! চন্দন মনে হয় তাই-ই বলবেন। অভিনন্দন ব্যানার্জি ও বৌদ্ধায়ন মুখোপাধ্যায় সংলাপ রচনায় মিনিমাল এপ্রোচ রেখে নিদর্শন প্রতিষ্ঠা করলেন। ব্রাত্য বসু স্বকীয় চালে যা বলতে পারেন তার ডাক্তারি ভার্সানমাত্র! বাড়িওয়ালির অশালীন কদর্য চিৎকার যে আবহ ধ্বনি হয়ে উঠল, তার জন্য অভিনন্দন এবং শর্মিলা ঘোষকে সাবাস দিই!

অভিনন্দন ও ধন্যবাদ বৌদ্ধায়ন ও মোনালিসা মুখার্জির লিটল ল্যাম্ব ফিল্মসকে! এই সাহস, এই স্পর্ধা কেই বা দেখায়! অভিনন্দন ছাব্বিশের নির্মাণ দেখে প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিলেন! কেরল থেকে কলকাতা, ইরান, রাশিয়া, তালিন… ৩৮টা উৎসব কাঁপানো ছবি জানলে অনেকে ধরে নেবেন ‘আঁতেল ছবি’। শুধু এটুকু বলব, দিনের শেষে মানিকবাবু আপনি আমি আমরা সকলেই।
