মনমননে বাংলা ভাষাই পয়লা। ভাষার আন্দোলনেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ
বাংলা ভাষার বয়স কত? কোনও পণ্ডিত, গবেষক তারিখ, সাল সঠিক নির্ধারণ করতে পারেননি এখনও। খুব দরকার আছে কি? নেই। ভাষার জন্ম এথনিক কালচার থেকেই।
অখণ্ড ভারতে, তথা ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে, বঙ্গে, বহু বিদেশী রাজা, শাসক দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী ছিলেন, কিন্তু সংস্কৃত, আরবি, হিন্দি, উর্দু জনমানসে ঠাঁই পায়নি, সাধারণ মানুষ আত্তীকরণ করেনি। বরং দূরে ঠেলেছে। ভগবানের ভাষা, ঈশ্বরের ভাষা, আল্লাহর ভাষা পুরোহিত, ধর্মযাজক, মোল্লাপুরুত ভয় দেখিয়েও সুবিধে করতে পারেনি, সফল হয়নি। বাংলা ভাষার মাহাত্ম্য, গৌরব এখানেই। কবি বলেছেন, বিনা স্বদেশী ভাষায় মেটে না আশা।

ভারত যদি অখণ্ড থাকত, রাজনৈতিক কারণেই, বাংলা ভাষার অস্তিত্ব নিয়ে আশঙ্কার কথা বলেছেন অনেকেই। ভারত ভাগের পর যেমন জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে। খোদ কলকাতায় দেখুন, ৫৩ ভাগ অবাঙালি, হিন্দিভাষী। মধ্য-উত্তর কলকাতার বিস্তর অঞ্চলে ইংরেজি, হিন্দি সাইনবোর্ড (অফিসে, বিপণীবিতানে)। ইংরেজি স্কুলের ছড়াছড়ি। হিন্দি স্কুলও গজিয়েছে নানা জায়গায়। বাংলা স্কুল প্রায় লুপ্ত। মাতৃভাষা বাংলা না শেখানোর যুক্তি – ভারতের অন্যান্য রাজ্যে, বিশ্বের অন্যত্র, অন্য দেশে বাংলা ভাষা অচল। চাকরি নেই, ব্যবসা নেই। কলকাতায় বা পশ্চিমবঙ্গে আছে কি?
বলছিলাম রাজনৈতিক বিভাজনের কথা, ভারত ভাগের কথা। ভারত দুই খণ্ড হলো, এক খণ্ড পাকিস্তান। পাকিস্তানের আবার দুই অংশ, পূর্ব এবং পশ্চিম। অখণ্ড বঙ্গের কপালেও কাটাছেড়া। যেমন পাঞ্জাব।
পূর্ব বাংলা থেকে পূর্ব পাকিস্তান। ইতিহাসের রসিকতা, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ আলি জিন্নাহ উর্দুভাষী নন, পাকিস্তানের (পশ্চিম পাকিস্তানের) পাঁচ ভাগ মানুষ উর্দুভাষী, ঘোষণা করলেন পাকিস্তানের ভাষা উর্দু হবে। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে, পল্টন ময়দানে জনসভায় ঘোষণা করলেন, ভুলে গেলেন সাত কোটি মানুষের বাংলা ভাষা। বিরোধ শুরু হলো, অতঃপর ইতিহাস। এই ইতিহাস থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষের স্বাধিকার আন্দোলনের সূত্রপাত। মনমননে বাংলা ভাষাই পয়লা। ভাষার আন্দোলনেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ। তার ২৪ বছর পরে বাংলাদেশ স্বাধীন, মুক্তিযুদ্ধে, ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে কয়েকজনের মৃত্যু, হত্যা করা হয়, ভাষা আন্দোলনে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। ভাষা এথনিক কালচারের সূতিকা, কিন্তু বিশ্বের নানা এথনিক কালচার থেকে প্রতিদিন দেড় হাজারের বেশি শব্দ বিলুপ্ত হচ্ছে, বাংলা ভাষা থেকেও হচ্ছে। ভিনদেশি ভাষা ঢুকে পড়ছে।
বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রীয় ভাষা, অথচ সরকারি কাজকর্মে, অফিস আদালতে এখনও ইংরেজি। অলিগলিতে গজিয়ে উঠছে ইংরেজি স্কুল। অন্যদিকে ইসলাম ধর্মের নামে আরবির বাড়ন্ত, যত্রতত্র মাদ্রাসা, সরকারি অর্থে। সৌদি আরব তো আছেই, অঢেল পেট্রো ডলার ছড়াচ্ছে।

বাংলাদেশে একুশে উপলক্ষ্যে গোটা ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে বইমেলা। বিশ্বের বৃহত্তর বইমেলা। বিশ্বের সর্বত্র বাঙালীর আস্তানা ক্রমশ বাড়ছে। বাংলা সংস্কৃতি প্রসারিত হচ্ছে। নিশ্চয় সুখের, আনন্দের।
২১ ফেব্রুয়ারি মূলত শোকের। কিন্তু এখন উৎসবের, ভাষার উৎসব। রসিকতা করে বলি, বাংলা ভাষার সমান বয়সী আমি। কিংবা বাংলা ভাষা আমার বয়সী। বলার হেতু, জন্মেছিলুম ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা।
