“আমরা ভারতবাসী – হিন্দু হই বা মুসলমান, সংস্কৃত আমাদের অলংকার” – রমজান আলি

অধ্যাপক রমজান আলির একান্ত সাক্ষাৎকার

বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ফিরোজ খান নামের এক অধ্যাপককে নিয়োগ করার বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন বেশ কিছু পড়ুয়া, সেই সময়েই বেলুড়ের রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরে সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হলেন রমজান আলি। ছোটোবেলা থেকে তাঁর সংস্কৃতের প্রতি অনুরাগ। নীরবে ভারতীয় ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছেন প্রচারবিমুখ এই মানুষটি। তাঁর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় উঠে এল, কীভাবে প্রবল দারিদ্র ও অন্যান্য বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে এই ৩৪ বছর বয়সী অধ্যাপক সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের পাঠদানকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

•    সংস্কৃতের প্রতি আপনার ভালোবাসা কীভাবে জন্মাল?

আমার বাড়ি জলপাইগুড়ি জেলায়। পূর্ব শালবাড়ি গ্রামে। যখন শালবাড়ি হাইস্কুল পড়তাম, তখন ক্লাস সেভেন-এইটে প্রথম সংস্কৃত পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। ‘সুভাষিতানি’-তে একটা শ্লোক ছিল, “সুখমাপতিতং সেব্য দুঃখমাপতিতং তথা। চক্রবৎ পরিবর্তন্তে দুঃখানি চ সুখানি চ”।। এই শ্লোকটা যখন পড়েছি, মনে হয়েছে, জীবনের গতি পরিবর্তন থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ যে কিছু করতে পারে, তার শিক্ষা দেয় সংস্কৃত। আমার প্রয়াত বাবা আবদুল খালেক এই শ্লোকগুলো দেখিয়ে বলতেন, এইভাবেই আমাকে চলতে হবে। তিনিই আমাকে জীবনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তখন থেকেই আমার সংস্কৃতের প্রতি ভালোবাসা।

•    মাধ্যমিকে কি সংস্কৃত ছিল?

ক্লাস নাইন টেনে সংস্কৃত ছিল না। তাই বিষয়টা ভালোলাগা সত্ত্বেও আশাহত হয়েছিলাম। বাবা আবদুল খালেক ছিলেন ভবঘুরে। আমার যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, তখন তিনি মারা যান। বাড়িতে চরম দারিদ্রতা চলছে। অর্ধাহারের মধ্যেই মাধ্যমিকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। একাদশ শ্রেণিতে সংস্কৃত পড়ার জন্য বাড়ি থেকে ১০ মাইল দূরে ধূপগুড়িতে যাই। তখন মনে আছে, ভর্তি হওয়ার সময়ে এক শিক্ষক ফর্মটা কেটে ছিঁড়ে দিলেন। বললেন, “তুই তো মুসলমান। সংস্কৃত নিয়ে কি তুই পুজো করবি? বরং, তুই ভালো ছাত্র। জিওগ্রাফি নিয়ে পড়বি”। আমি আশাহত হয়েছিলাম, কিন্তু আমার ইচ্ছাকে সেই ঘটনা দমাতে পারেনি। তখনকার দিনে অর্থাৎ ২০০১ সালে তাঁর কথা স্বাভাবিকই ছিল। আমরা জানতাম, ডঃ শহীদুল্লাহ্‌-র জীবনেও তাই ঘটেছিল। সম্মান ও ভয়ের কারণে সেই স্যারকে কিছু বললাম না। আরেকজন শিক্ষক ছিলেন যতীন্দ্রনাথ সরকার। তাঁকে আমি ধরলাম, যেভাবেই হোক আমি সংস্কৃত নিয়ে পড়তে চাই, তিনি যেন ব্যবস্থা করে দেন। তার সহযোগিতায় আবার একাদশ শ্রেণিতে সংস্কৃত নিয়ে পড়ার সুযোগ পেলাম। উচ্চমাধ্যমিকে সংস্কৃতে ভালো ফল-সহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হই। তারপর অনার্স নেওয়ার সময় হল। একদিকে জিওগ্রাফির ঊর্দ্ধমুখী চাহিদা, অন্যদিকে, ধর্মের টানাপোড়েনের মধ্যে খানিকটা সংশয়ে ভুগছিলাম। তাড়াতাড়ি চাকরি পাওয়াকে প্রাধান্যে দিতে এবং পরিবেশের চাপে জিওগ্রাফি নিয়ে অনার্সে ভর্তি হলাম। 

•    তারপর আবার কীভাবে সংস্কৃতে ফিরে এলেন?

আমার অন্তঃকরণ কিছুতেই সংস্কৃতকে ছাড়তে চায়নি। তাই, জিওগ্রাফির স্যার বাবুলাল মজুমদারের পরামর্শে ও নিজের ব্যাকুলতায় সংস্কৃত নিয়ে জলপাইগুড়ির আনন্দচন্দ্র কলেজে ভর্তি হই।

•    ওই সময়ে সংস্কৃত পড়তে কোনো বাধা এসেছিল?

অনার্স চলাকালীন অশুভ বুদ্ধিসম্পন্ন কিছু মানুষ “সংস্কৃত না পড়ে জিওগ্রাফি পড়লে অনেক ভালো করতিস”, এরকম পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু আমি প্রলোভনের ফাঁদে পা না দিয়ে সংস্কৃত নিয়েই এগিয়ে চলি। মন্দিরা ঘোষ নামের এক শিক্ষিকা তখন আমায় বিনা পয়সায় টিউশন পড়িয়েছেন। আর যতীন্দ্রনাথ স্যার বইপত্র কিনে দিতেন। অনার্সের পর এমএ করতে বর্ধমান ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হই। কিন্তু তখন অর্থাভাবে সেখানে পড়া সম্ভব হয়নি।

•    সেই সমস্যার সমাধান কীভাবে হল?

বাবুলাল মজুমদার স্যারের অর্থসাহায্যে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম এমএ পড়ার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হই। তখন ইউনিভার্সিটির স্টাডি সেন্টার আমার সাফল্যের পুরস্কারস্বরূপ অতিথি অধ্যাপক হিসেবে ২০১০ সালে এমএ-র ক্লাস নেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়।

•    আপনার শিক্ষক জীবন আরম্ভ হল তাহলে এভাবেই?

২০১০ সালের ২ আগস্ট তারিখে আলিপুরদুয়ারের ফালাকাটা মহাবিদ্যালয়ে আংশিক সময়ের অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করি। এছাড়া ফালাকাটা লছমনডাবরী হাইস্কুলে ডেপুটেশন পোস্টে শিক্ষকতা এবং কুচবিহারে গোসকাডাঙ্গা বীরেন্দ্র মহাবিদ্যালয় অতিধি অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেছি।

•    রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরে কীভাবে এলেন?

আমার দাদা, বর্তমানে কুচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাবলু বর্মনের অন্যপ্রেরণায় নেট ও সেট পরীক্ষায় বসি। ২০১৫ সালে সেট এবং ২০১৬ সালের জুলাই মাসে নেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ করা সুযোগ পেয়েছি। ডাব্লুবিসিএসসির প্যানেলে আমি সেভেন র‍্যাংক করলাম, তখন রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির কলেজে সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হলাম। 

•    বিদ্যামন্দিরের পরিবেশ আপনার কেমন লাগছে?

এখানকার পরিবেশ অত্যন্ত শান্ত। এখানে আমার খুবই ভালো লাগছে। শিক্ষক, ছাত্র, সন্ন্যাসীরা খুবই আন্তরিক। তবে সব পরিবেশই ভালো। বাংলার সংস্কৃতিই এই রকম।

•    সংস্কৃত পড়তে গিয়ে আপনার পরিবার থেকে কোনো বাধা আসেনি?

পরিবারে আমাকে বাধা দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। বাধা বলতে ছিল অর্থাভাব, অনাহার ও অর্ধাহার। আমরা তিন ভাই। চরম দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে মা নূরজাহান বেগম আমাদের মানুষ করেছেন। উনি লোকের বাড়ি বাড়ি ধোয়ামোছার কাজ করতেন। এইভাবে কোনোদিন তিনি একবেলা অন্ন জোগাতেন, আবার কোনোদিন পারতেন না। মায়ের ছিল অসহনীয় ক্ষমতা। তাঁর ইচ্ছা ছিল, ছেলেকে মাধ্যমিক পাশ করাবেনই। তিনি চাইতেন, আমরা যেন শিক্ষিত হই। যে বিষয় নিয়েই আমরা পড়াশোনা করি না কেন, আমরা যেন স্বশিক্ষিত হই, সেটাই ছিল তাঁর ইচ্ছা। অর্থের অভাবে আমিও দিনমজুরি করেছি। পাট, আলু, ধানের চাষ করেছি। মাছ ধরে, ঘাস কেটে বিক্রি করেছি। একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে গৃহশিক্ষকের কাজ শুরু করি। এভাবেই আমি আর মা মিলে ভাই দু’জনকে বড়ো করেছি। এক ভাই এখন জুলজি নিয়ে এমএ বিএড। আরেকজন বাংলা নিয়ে এমএ করেছে।

•    শেষ প্রশ্ন, কোনো নির্দিষ্ট ভাষা কি একটি ধর্মের নিজস্ব সম্পত্তি হতে পারে?

সংস্কৃত অবশ্যই একটি ভাষা, তবে তার বিশালতার জন্য সে শুধু ভাষা নয়, একাধারে বিজ্ঞান ও মহাকাব্য, এবং ভারতবর্ষের সংস্কৃতিও বটে। তাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের ভাষা বললে সংস্কৃতকে ছোটো করা হবে। কোনো ভাষা যদি সেই দেশের সংস্কৃতি বহন করে, তাহলে, সেই দেশের সমস্ত নাগরিকের কাছেই ভাষাটি এক অমূল্য সম্পদ। আমরা ভারতবাসী – হিন্দু হই বা মুসলমান, সংস্কৃত আমাদের অলংকার।

Developed by DXDasia