KIFF-এর একাল-সেকাল
কলকাতা, দিল্লি, কেরালা সব মিলিয়ে ৪০-৪৫ বছর ধরে চলচ্চিত্র উৎসব দেখছি। ১৯৯৫ সালে যখন প্রথম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হয়, তখন থেকেই দেখছি। তখন আমি জাতীয় বীমা কোম্পানির বিজ্ঞাপন ও প্রচার দপ্তরে চাকরি করি। দোলাচলের জীবন। চাকরি ছেড়ে দেবো ভাবছি। সেই চাকরির সূত্রেই জানতে পারি যে, এরকম একটা উৎসব হচ্ছে। আমাদের কোম্পানির কিছু স্পনসরশিপ ছিল। আমন্ত্রণ পত্র পেয়েছিলাম। এখনকার মতো শুধুমাত্র কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ঘিরে এত উন্মাদনা ছিল না তখন। তার কারণ কলকাতায় চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হওয়ার অনেক আগেই, ১৯৫২ সালে আইএফএফআই (ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অফ ইন্ডিয়া)-এর মতো চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছিল। কেরালা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বা বুসান শুরু হয়েছিল ১৯৯৬-এ।

১৯৫২ সালে ভারতে যে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সূচনা হয়েছিল, তা প্রধানত দিল্লির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে এই উৎসব ভারতের অন্যান্য শহরেও হয়। কলকাতায় মোট তিনবার এই আইএফএফআই-র আয়োজন করা হয় : ১৯৮২ সালে ‘ফিল্মোৎসব ৮২’, ১৯৯০ সালে এবং ১৯৯৪ সালে। ১৯৯৪-এ খুব বড়ো করে আইএফএফআই অর্থাৎ জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসব হয়। উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নিজের রেট্রোস্পেকটিভে মাইকেলেঞ্জেলো আন্তোনিওনির উপস্থিতি। বহু বিশ্ববরেণ্য পরিচালকরা এ দেশে এসেছিলেন এই চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে। কলকাতার দর্শক এভাবেই পৃথিবীর সেরা পরিচালকদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিল। এর পরের বছরই শুরু হল কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব। তখনও তা ‘আন্তর্জাতিক’ তকমা পায়নি। ২০০১ সালে সপ্তম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের নাম বদল হয়। নতুন নাম হয় ‘কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’। ২০১২ সালে, ১৮তম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের নাম বদলে হয় ‘কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ (KIFF)। ফোকাস ছিল ‘আফ্রিকা (নাউ এন্ড দেন)’। ইরানি পরিচালক আসগর ফরহাদির ছবি ‘নোদের অ্যান্ড সিমিন, এ সেপারেশন’ দিয়ে উদ্বোধন হয়।
শুরুর বছরে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথম বছর কী কী ছবি দেখেছিলাম এখন আর মনে পড়ে না। তবে যতদূর জানি, প্রথম ক্যালকাটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল দেব বেনেগালের ছবি ‘ইংলিশ আগস্ট’ দেখানো হয় এই উৎসবের উদ্বোধনী সিনেমা হিসেবে। রেট্রোস্পেক্টিভ বিভাগে দেখানো হয় আকিরা কুরোসাওয়ার দশটি ছবি; জঁ রেনোয়া-র দুটি ছবি এবং মার্তা মেসজারোস-এর দুটি ছবি। এই বিভাগে দেখানো হয় উত্তমকুমার অভিনীত ২০টি ছবিও। হোমেজ বিভাগে শ্রদ্ধা জানানো হয় সলিল চৌধুরীকে।
সারা পৃথিবীর নামকরা সব ডিরেক্টরা এসেছেন এই চলচ্চিত্র উৎসবে। পল কক্স, ফারনান্দো সোলানাস, পাসোলিনি, নুরি বিল সিলান, মারিয়ান হ্যানসেন, আমোস গিতাই, জাফার পানাহি, মাজিদ মাজিদি, এঁদের মতো চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরা এসেছেন।

সারা পৃথিবীর নামকরা সব ডিরেক্টরা এসেছেন এই চলচ্চিত্র উৎসবে। পল কক্স, ফারনান্দো সোলানাস, পাসোলিনি, নুরি বিল সিলান, মারিয়ান হ্যানসেন, আমোস গিতাই, জাফার পানাহি, মাজিদ মাজিদি, এঁদের মতো চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরা এসেছেন। যেকোনও চলচ্চিত্র উৎসবের একটা ফরম্যাট আছে। যেমন- ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অনেক সময় অনেককিছু আবিষ্কার করা যায়। পথের পাঁচালি যখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছিল তখনকার সময় আর এখনকার সময়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। তখন ভারতীয় ছবির সঙ্গে আন্তর্জাতিক দর্শক পরিচিত ছিল না। তাদের কাছে সেটা ছিল নতুন কিছু আবিষ্কার করার মতোই। ঠিক যেমন ভাবে একটা সময় কিয়েসলস্কি, তারকোভস্কি-কে আমরা এখানে আবিষ্কার করি। ফেস্টিভ্যালের সময় আমাদের সময় উত্তেজনা ছিল এবার কাকে আবিষ্কার করবো, কোন ‘মাস্টার’ পরিচালক আসবেন -এসব নিয়ে। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে এখনও কিছু না কিছু আবিষ্কার করার সুযোগ থাকে। আশা করছি এ বছরও থাকবে। চলচ্চিত্র উৎসবের আরেকটা ভাগ হল প্রশ্নোত্তর পর্ব, যেটাকে আমরা বলবো ছবি দেখা এবং মূল্যায়ন করা। আর একটা অ্যাকাডেমিক দিক থাকে, যেমন- পরিচালক কী ভাবছেন, কীভাবে দেখছেন ইত্যাদি। এছাড়াও সাংবাদিক বৈঠক, বিভিন্ন কর্মশালা তো আছেই। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবও এই ফরম্যাটেই চলে আসছে। বেশিরভাগ চলচ্চিত্র উৎসবই কিন্তু সাধারণ দর্শকদের কথা মাথায় রেখে হয় না, যারা ‘ফিল্ম-বাফ’ তাদের জন্যই মূলত হয়। না হলে অত মানুষকে জায়গা দেবে কী করে। ২০১১ সালের ১৭তম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব ছিল মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিকল্পনায় প্রথম চলচ্চিত্র উৎসব। নতুন সরকার আসার পর মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর সৌজন্যে, প্রচারের মাধ্যমে সাধারণের মধ্যেও চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতি একটা আকর্ষণ তৈরি হয়। তবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গিয়েছে অনেক কিছুই। দর্শকের মান পড়েছে। আগে যে উন্মাদনা আমাদের সময়ে ছিল, এখন আর নেই! কে দেখবে ধৈর্য্য ধরে তারকোভস্কি বা বেলা তার? শেষপর্যন্ত সেই সিনেমাপাগল ছাড়া কেউ তো এসবের খোঁজ করবে না। চলচ্চিত্র উৎসব আসলে নিরলস সিনেমা চর্চার এক প্রসারিত ক্ষেত্র, ভালো-মন্দ নিয়েই তার প্রতিফলন ঘটে চলেছে আমাদের শহরের এই ঐতিহ্যবাহী চলচ্চিত্র উৎসবে।