বছরে দু’বার চলচ্চিত্র উৎসব করে দেখালো কলকাতা – কেমন কাটলো ২৮তম KIFF?

মাত্র ৮ মাসের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত হল ২৮তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

“চলচ্চিত্রের অন্যতম দক্ষতা হলো মানুষের মন বোঝার এবং তার সাথে যোগাযোগ করার ক্ষমতা এর রয়েছে।” কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আবহে ‘মাস্টার’ সত্যজিৎ রায়ের এই উক্তি মনে পড়তে বাধ্য। ২১ ডিসেম্বর, বুধবার কলকাতার নন্দন, রবীন্দ্রসদন চত্বরে সিনেপ্রেমীদের মুখে ছিল বিষাদের ছায়া। কারণ ২২ ডিসেম্বর ২৮ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (28th KIFF) শেষতম দিন। কোনও দেশে মাত্র ৮ মাসের ব্যবধানে ২ বার চলচ্চিত্র উৎসব হওয়া বিরল দৃষ্টান্ত। তাই-ই করে দেখালো ‘KIFF 2022’. এই বছরের চলচ্চিত্র উৎসব অনেক কারণেই বিশেষ হয়ে উঠেছিল। এই প্রজন্মের সিনেপ্রেমী, কর্মী এবং শিক্ষানবিশদের কাছে অন্যতম স্মরণীয় হয়ে থাকবে, এ কথা বলাই বাহুল্য। ১৫-২২ ডিসেম্বর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সিনেমা দেখা তার পাশাপাশি সিনে আড্ডা, আলোচনা, মাস্টার ক্লাস –সব মিলিয়ে কেমন ছিল কলকাতার এই চলচ্চিত্র উৎসবের এক সপ্তাহের জার্নি?

এবছর এপ্রিল মাসেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৭তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। মাঝে ৮ মাসের ব্যবধানেই তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর এবং KIFF কমিটি ২৮তম সংস্করণের আয়োজন করে। এবছর ৫৭টি দেশ থেকে ১,০৭৮টি ছবি জমা পড়েছিল। তারপর জুড়িদের বিচারে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয় ৪২টি দেশের মোট ১০৮টি ছবি। অন্যান্য বছরের মতো সেরা ছবিগুলিকে দেওয়া হবে রয়্যাল বেঙ্গল গোল্ডেন টাইগার ট্রফি, হীরালাল সেন মেমোরিয়াল ট্রফি, নেটপ্যাক অ্যাওয়ার্ড-সহ আরও নানান পুরস্কার। এমন মাপের চলচ্চিত্র উৎসব সারা ভারতে বিরল। KIFF-এর পুরস্কার মূল্যও সারা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

এবছর ছিল না কোনো ফোকাস কান্ট্রি। পরিচালক সুধীর মিশ্র খুব মূল্যবান সত্যজিৎ রায় স্মারক বক্তৃতা (Satyajit Memorial Lecture) দেন। চলচ্চিত্র গবেষকদের জন্য কিছু মাস্টার ক্লাস সেশনের আয়োজন করা হয়েছিল, যেগুলি পরিচালনা করেন পরিচালক শাজি এম করুন, চিত্রগ্রাহক সুদীপ চ্যাটার্জি এবং অভিনেতা নীরজ কবি।

KIFF-এর ২৮তম সংস্করণের স্লোগান ছিল ‘মিট দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাট দ্য ওয়ার্ল্ড অফ সিনেমা’ (Meet the World at the World of Cinema)। এই স্লোগানকে আরও স্মরণীয় করতে নন্দন চত্বর ও নজরুল তীর্থে প্রদর্শিত হয় জঁ লুক গোদারের (Jean-Luc Godard) নানান অবিস্মরণীয় কাজ। এছাড়াও শতবর্ষের শ্রদ্ধা জানাতে বিভিন্ন মঞ্চে প্রদর্শিত হয় দিলীপ কুমার, ভারতী দেবী, হৃষিকেশ মুখার্জি, অসিত সেন, অ্যালাইন রেসনাইস, পাওলো পাসোলিনি, মাইকেল ক্যাকোয়ানিস এবং কে আসিফের মতো কিংবদন্তিদের নানান কালজয়ী সিনেমা। এছাড়াও শ্রদ্ধা জানানো হয় এবছর প্রয়াত পরিচালক তরুণ মজুমদার, অভিনেতা প্রদীপ মুখার্জি এবং সন্তুর উস্তাদ পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা-কে। এই বিভাগের অন্যতম একটি অংশ হল ‘দ্য পিকচার অফ ডোরিয়ান গ্রে’-এর অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলা ল্যান্সবারি, যিনি এ বছর অক্টোবরে প্রয়াত হয়েছেন। হলিউড সিনেমার স্বর্ণযুগের শেষ কয়েকজন তারকাদের অন্যতম ছিলেন অ্যাঞ্জেলা।

প্রতিদিনই চলচ্চিত্র উৎসবে শুরু থেকে শেষ অবধি সিনেমা দেখেছেন ডানলপের আইন-শিক্ষানবিশ দীপরঞ্জন রায়। তিনি বঙ্গদর্শন-কে জানান, “শহরের মধ্যে এত কাছে চলচ্চিত্র উৎসব, বিগত সাত-আট বছর ধরেই আসছি। সিনেমা দেখতে প্রচণ্ড ভালোবাসি। সকাল ন’টা থেকে শুরু করে সন্ধ্যের শেষ শো, যতগুলো সম্ভব হয় সিনেমা দেখি ফেলি। এত বছর আসছি বলে শুধুমাত্র ফেস্টিভ্যালকে কেন্দ্র করে কত মানুষের সঙ্গে পরিচিতি তৈরি হয়েছে, একটা বন্ধুগোষ্ঠী তৈরি হয়ে গিয়েছে। এ বছর দু’বার ফেস্টিভ্যাল হওয়ায় আমি তো দারুণ খুশি। গোদার আগে অনেকবারই ফেস্টিভ্যালে দেখানো হয়েছে, বড়ো পর্দায় বারবার দেখতে ভালোই লাগে। তবে এ বছর গোদারের সঙ্গে পাসোলিনি, মাইকেল ক্যাকোয়ানিসের ছবিও ছিল শতবর্ষ উপলক্ষ্যে। তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছি। জাফার পানাহি ইরানে গৃহবন্দি, চলে গিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমাস্টার কিম-কি দুকও। তাঁদের দু’জনেরই সাম্প্রতিকতম কাজ দেখার সুযোগ ছিল এবার। ফিলিপিনের পরিচালক লভ দিয়াজও আমার কাছে বরাবরই আকর্ষনের কেন্দ্রকবিন্দুতে থেকেছে। সব মিলিয়ে দারুণ উপভোগ করেছি।”

ভালো চরিত্র নাকি স্টারডম? নন্দনে জমজমাট সিনে-আড্ডা

আন্তর্জাতিক সিনেমার পাশাপাশি এ বছর ভারতীয় ভাষার ছবি বিশেষত, ‘আনহার্ড ইন্ডিয়া : রেয়ার ল্যাঙ্গুয়েজ ফিল্ম’ বিভাগের বেশ কিছু ছবি, নতুন সংযোজিত ‘গেম অন’ বা খেলা বিভাগ, বেশ কিছু তথ্যচিত্রও নজর কেড়েছে। এবছর অমিতাভ বচ্চনের ৮০তম জন্মদিন উদযাপন করে KIFF। সেই উপলক্ষে প্রদর্শিত হয়েছে অমিতাভ অভিনীত ৯টি ছবি, ছিল একটি বিশেষ প্রদর্শনীও।

শুধুমাত্র সিনেমা দেখার জন্য নদিয়া জেলা থেকে এসেছিলেন পঞ্চাশোর্ধ কল্পনা চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “আমি পেশায় শিক্ষিকা। প্রত্যেক বছর আসতে পারি না, তবে মন পড়ে থাকে এখানে। সিনেমা দেখতে ভীষণ ভালো লাগে। কত দেশের কত কথা জানা যায়। এরকম শক্তিশালী মাধ্যম খুব কমই আছে। এবারে দুবার হল চলচ্চিত্র উৎসব। প্রথমটায় আসতে পারিনি। দ্বিতীয়টায় এলাম কিন্তু অন্যবারের মতো এবার দুটো বরিবার পেলাম না। যে রবিবারটা পেলাম সেদিন তো সারাদিনই ছবি দেখেছি, এছাড়াও একদিন ছুটি নিয়ে এসছিলাম আমার বন্ধু অভিজিৎ চক্রবর্তীর ‘সুন্দরবন – সাগা অফ হাংরি টাইডস’ তথ্যচিত্রটা দেখবো বলে। এদিনই দেখলাম রাজবংশী ভাষার ছবি ‘মানসাই’। দারুণ অভিজ্ঞতা।”

এবছর KIFF-এর অন্যতম আকর্ষণ ছিল পাকিস্তানের ছবি ‘জয়ল্যান্ড’, বাংলাদেশের ‘হাওয়া’। দুটি ছবিকে কেন্দ্র করে দর্শকদের উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। প্রেক্ষাগৃহও ছিল কানায় কানায় পরিপূর্ন। ‘জয়ল্যান্ড’ পাকিস্তানে নিষিদ্ধ ঘোষণা হওয়ার পরও কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে তা দেখানোর সিদ্ধান্তকে অনেকেই কুর্নিশ জানাচ্ছেন। তরুণের ভাষা, নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থান উঠে আসছে সিনেমা মাধ্যমে। KIFF সেই কণ্ঠস্বরকেই প্রাধান্য দিতে চেয়েছিল এই উৎসবে।     

শুক্রবার রবীন্দ্র সদনে অনুষ্ঠিত হয় শেষবেলার অনুষ্ঠান। তারকা খচিত সন্ধেয় পুরস্কার তুলে দেওয়া হয় সেরা ছবি, সেরা পরিচালকদের হাতে।

ইন্টারন্যাশনাল কমপিটিশন : ইনোভেশন ইন মুভিং ইমেজেস

সেরা ছবি (Best Film)

আপন এন্ট্রি (Upon Entry)

পরিচালক – আলেজান্দ্রো রোজাস, জুয়াঁ সেবেস্তিয়ান ভাস্কুয়েজ

দেশ- স্পেন

সেরা ছবি (Best Film)

কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া (Kura Pokkhir Shunye Ura)

পরিচালক- মুহাম্মদ কাইউম

দেশ- বাংলাদেশ

সেরা পরিচালক (Best Director)

হিটলার'স উইচ (Hitler's Witch)

পরিচালক- ভিরনা মলিনা, আর্নেস্তো আরদিতো

দেশ- আর্জেন্টিনা

স্পেশাল জুরি মেনশন (Special Jury Mention)

সাইলেন্ট গ্লোরি (Silent Glory)

পরিচালক- নাহিদ হাসানজাদে

দেশ- ইরান

গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায় অমিতাভ বচ্চন-বিশেষ প্রদর্শনী

কোনও জিনিস শুরু হতে যত সময় লাগে শেষ হতে তার অর্ধেকও লাগে না। বিদায়ী সুর নিয়েই ২৯ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের দিন গোনা শুরু করলেন বাংলার আপামর সিনেপ্রেমীরা।

Developed by DXDasia