শুধু ভিড় নয়, বই বিক্রিতেও গত ৪৫ বছরের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা

পরের বছর থিম কান্ট্রি হচ্ছে কোন দেশ, কী জানালেন গিল্ড কর্তৃপক্ষ?

কোভিডের দাপটে গত বছর মেলা হয়নি। অন্যান্যবারের মতো সময়ে না হয়ে পিছিয়ে দেওয়া হয় এবছরের বইমেলার তারিখও। মার্চের শুরুতে শুরু হয় এবারের বইমেলা। তাই শহরবাসী তো বটেই সারা রাজ্যের বইপ্রেমীরা এবার তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছেন বইমেলা। শুধু ভিড় নয়, উল্লেখযোগ্যভাবে বই কেনাবেচার দিক থেকে আগের রেকর্ডকে ভেঙে দিল এবারের বইমেলা। বইমেলার সাফল্য নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে এই দাবি করেছে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড।

গিল্ডের পক্ষ থেকে এক সাংবাদিক বৈঠকে সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় ও সভাপতি সুধাংশুশেখর দে জানিয়েছেন, ২০২০ সালে প্রথম পাঁচদিনে আড়াই কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। আর গিল্ডের হিসেব বলছে, চলতি মেলায় প্রায় ১১ কোটির মাইলফলক ছাড়িয়েছে। এটা একটা রেকর্ড। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্টলের সামনে সেলফির হিড়িক নজরে এসেছে। ইদানিং তরুণ প্রজন্মকে একটা বদনাম প্রায়ই শুনতে হয়, তাঁরা নাকি মোবাইলে বুঁদ হয়ে থাকেন। তবে এবার যেন অন্য ছবি বইমেলায়। সেই তরুণ প্রজন্মই বই হাতে বুঁদ। মুখে তৃপ্তির হাসি। আর সেই হাসি ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বইমেলা জুড়েই। “রেসপন্স ভালো পেয়েছি। বই ভালোই বিক্রি হয়েছে। তবে প্রথম দিকে আমাদের স্টলের অবস্থান নিয়ে বেশ সমস্যা হচ্ছিল, পরে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ম্যাপ পয়েন্টিং ইত্যাদি করে সেটা মিটিয়ে নিই।” বলছিলেন ‘ধ্যানবিন্দু’ প্রকাশনার অভীক বন্দ্যোপাধ্যায়।    

লিটল ম্যাগাজিন ‘গ্রাফিত্তি’র শুভঙ্কর দাশের কথায়, “এতদিন পর বইমেলা হল, স্বাভাবিকভাবেই মেলায় জনজোয়ার দেখা গিয়েছে। কিন্তু, শুরু থেকে সেভাবে বেচাকেনা হচ্ছিল না। শেষ দু’দিন অবশ্য সেই অভাবও পূরণ হয়ে গিয়েছে। তবে আমার মনে হয়, লিটিল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়ন তিন ভাগ না করলে আরও ভালো হত।”

শনিবারে দুপুরে রোদ উপেক্ষা করে সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্ক তথা বইমেলা প্রাঙ্গণ যেন হয়ে উঠেছিল মহানবমীর কলকাতা। নামী-অনামী প্রকাশনীর স্টলের ভিতরে গিজগিজ করছিল মাথার ভিড় – জনপ্লাবন। স্টলের বাইরেও দীর্ঘ লাইন। তা সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন নিরাপত্তারক্ষীরা। ভিড় ঠেলে এক স্টল থেকে আরেক স্টলে যেতে অনেকটা সময় লাগছে। তাও উৎসাহিত বইপ্রেমীদের ঢল বাড়তে থাকল ক্রমেই। মেলার ভিড় যতই বাড়ল, রাস্তার ট্রাফিক সামলাতে ততটাই কালঘাম ছুটল বিধাননগর পুলিশের পদস্থ আধিকারিক থেকে সিভিক ভলান্টিয়ারদের। তবে, সুষ্ঠুভাবে মেলা আয়োজন করতে পেরে সরকারের সমস্ত দফতরকে কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। পুলিশ-প্রশাসন থেকে সব বিভাগের সহযোগিতা মিলেছে এই বইমেলায়। কলকাতা বইমেলা নিয়ে গর্ব করা যায় বলে দাবি করেন গিল্ডের সভাপতি।

এবারই প্রথম ভার্চুয়াল মাধ্যমে সম্প্রচারিত হয়েছে আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা। সেখানেও ভালই প্রতিক্রিয়া পাওয়া গিয়েছে বলে গিল্ড সূত্রে খবর। সম্পাদক বলেন, দেশ-বিদেশের বহু মানুষ দেখেছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ফেসবুক, ইউটিউব মিলিয়ে মোট ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ মানুষ দেখেছেন বইমেলার ভার্চুয়াল সংস্করণ। মোবাইলের সর্বগ্রাসী হানার মধ্যেও প্রিয় বইয়ের জন্য বইমেলায় ভিড় জমিয়েছিলেন অনেকেই। গিল্ডের তথ্য অনুসারে এখনও পর্যন্ত ১৩ লক্ষ মানুষ বইমেলায় এসেছেন। সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। আর বুধবার পর্যন্ত প্রায় ১১ কোটি টাকারও বেশি বই বিক্রি হয়েছিল কলকাতা বইমেলায়, শনি-রবি মিলিয়ে যা প্রায় ২২ কোটিতে গিয়ে পৌঁছয়। হিসাব বলছে গত ৪৫ বছরে এত বই এর আগে বিক্রি হয়নি। কার্যত বই বিক্রির নিরিখে গত ৪৫ বছরের রেকর্ড ভেঙে দিল বইমেলা। আগামীকাল রেকর্ড ভিড় এবং রেকর্ড বিক্রির আশায় বুক বেঁধেছিলেন প্রকাশকরা। এক সংবাদমাধ্যমে দেবসাহিত্য কুটিরের দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় বইমেলা প্রসঙ্গে জানান, “এতদিন ধরে স্টল দিচ্ছি, এত সাফল্য আগে দেখা যায়নি”।

বইমেলার প্রাণকেন্দ্র বলা চলে লিটিল ম্যাগাজিন প্যাভালিয়নকে। সেই প্যাভলিয়নই আলাদা আলাদা জায়গায় ভাগ করে দেওয়ায় শুরু থেকেই তর্কবিতর্ক হচ্ছিল। লিটল ম্যাগাজিন ‘গ্রাফিত্তি’র শুভঙ্কর দাশের কথায়, “এতদিন পর বইমেলা হল, স্বাভাবিকভাবেই মেলায় জনজোয়ার দেখা গিয়েছে। কিন্তু, শুরু থেকে সেভাবে বেচাকেনা হচ্ছিল না। শেষ দু’দিন অবশ্য সেই অভাবও পূরণ হয়ে গিয়েছে। তবে আমার মনে হয়, লিটিল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়ন তিন ভাগ না করলে আরও ভালো হত।”

জানা যাচ্ছে, বইমেলার সুবাদে পাল্টে যেতে পারে সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্কের মেলার মাঠ। মেলার মাঠের পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখে, ধুলোর সমস্যা যাতে না বাড়ে, সে দিকে লক্ষ রেখে আন্তর্জাতিক মেলার উপযোগী পরিকাঠামো আরও ভাল ভাবে গড়তে তৎপর হচ্ছে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড। বইমেলার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত পরিকল্পনা কার্যকর করতে রাজ্য নগরোন্ন্যন দফতর ও বিধাননগর পুরসভার সঙ্গে আলোচনায় বসবেন বলে জানিয়েছেন গিল্ডকর্তারা। কলকাতায় সায়েন্স সিটির কাছে মিলনমেলায় একটি আন্তর্জাতিক মানের মেলা প্রাঙ্গন গড়ে উঠলেও, সাধারণ মানুষের উৎসাহ যাচাই করে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেন্ট্রাল পার্ক মেলা প্রাঙ্গনকে ‘বইমেলা প্রাঙ্গন’ হিসেবে ঘোষোণা করেন। এবার থেকে সেখানেই বসবে বইয়ের আসর।

সমাপ্তি অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই আগামী বছরের থিম কান্ট্রির নাম জানিয়ে দেওয়া হয়। আগামী বছর থিম কান্ট্রি হচ্ছে স্পেন। ২০০৬ সালে বইমেলায় থিম কান্ট্রি ছিল স্পেন। তখন বইমেলা বসত ময়দানে। এবার একেবারে অন্য পরিবেশে নিজেদের সাহিত্য সম্ভার নিয়ে প্যাভিলয়ন সাজাবে স্পেন। এদিনের অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন স্পেনের রাষ্ট্রদূত হোসে মারিয়া। স্পেনকে এই সুযোগ দেওয়ার জন্য তিনি আপ্লুত। তাঁর মতে, কলকাতার সঙ্গে স্পেনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্য সেই সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন। সব মিলিয়ে জমে উঠেছিল বাঙালির চতুর্দশ পার্বন, আর সেকারণেই বইমেলার শেষ ঘণ্টার ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে চোখে খুশির জল নিয়ে সাহিত্যকর্মীরা সকলেই একত্রে বলে উঠেছিলেন, ‘আসছে বছর আবার হবে’।

 

Developed by DXDasia