শীতের মরশুমে ২৩ জেলার ৭,০০০ স্টল নিয়ে জমজমাট ‘হস্তশিল্প মেলা’

শুরু হয়েছে ‘পশ্চিমবঙ্গ হস্তশিল্প মেলা’ ২০২২-২৩, চলবে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত

উত্তর থেকে দক্ষিণ – রাজ্যের প্রায় সবকটি জেলার হস্তশিল্পীরা এই মেলায় অংশগ্রহণ করেছেন। মেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দ্রব্যাদিগুলোর মধ্যে অবশ্যই থাকবে মাদুর, মসলিন, বেত, দড়ি, কাঠ, কাচ, পোড়ামাটি, উল-এর হাতের তৈরি কাজ।

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ – এই তেরো সংখ্যাটা নিমিত্তমাত্র – চৌদ্দ, পনেরো, ষোলো হয়ে এগোতেই থাকে। কারণ বাঙালি প্রধানত উৎসবমুখর। আর শীতের দিনগুলোয় শহরের নানান প্রান্তে রকমারি পসরা বসবে – এমন দৃশ্য চিরায়ত বাংলার নিজস্ব সম্পদ। কলকাতা তিলোত্তমা যেন মেলার মরশুমকে গাইড করে আরও একধাপ এগিয়ে দেয়। বইমেলা থেকে খাদ্যমেলা – পিঠে পার্বণ থেকে গান মেলা – পর্যটন মেলা থেকে হস্তশিল্প মেলা – প্রতি বছর তিলোত্তমা সেজে ওঠে তার অপরূপ শোভা নিয়ে।

গত ২৫ নভেম্বর থেকে নিউটাউন-ইকোপার্কে শুরু হয়েছে ‘পশ্চিমবঙ্গ হস্তশিল্প মেলা’ ২০২২-২৩, চলবে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। উত্তর থেকে দক্ষিণ – রাজ্যের প্রায় সবকটি জেলার হস্তশিল্পীরা এই মেলায় অংশগ্রহণ করেছেন। নিজেদের হাতের তৈরি জিনিস নিয়ে পসরা সাজিয়েছেন শিল্পীরা। এই মেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দ্রব্যাদিগুলোর মধ্যে অবশ্যই থাকবে মাদুর, মসলিন, বেত, দড়ি, কাঠ, কাচ, পোড়ামাটি, উল-এর হাতের তৈরি কাজ। প্রত্যেকটি জেলার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন – মুর্শিদাবাদের সিল্ক, বর্ধমানের ডোকরা, নদিয়ার মাটির পুতুল, পূর্ব মেদিনীপুরের পটচিত্র, পুরুলিয়ার ছৌ শিল্প, দার্জিলিংয়ের উলের জামা ইত্যাদি। হস্তশিল্প মেলায় জায়গা করে নিয়েছে সবকিছুই। ছোটো-বড়ো মিলিয়ে প্রায় সাত হাজার স্টল হয়েছে এই মেলায়। অংশগ্রহণ করেছেন ২৩ জেলার শিল্পীরা।

পূর্ব মেদিনীপুর পিংলা থেকে পটচিত্র নিয়ে এসেছেন শিল্পী সনকা চিত্রকর এবং তাঁর পরিবার। সনকা বঙ্গদর্শন-কে জানান, তাঁরা সারাবছর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে থাকেন, কিন্তু কলকাতার হস্তশিল্প মেলার মতো ভালো বিক্রি আর কোথাও তেমন হয় না। তিনি আরও বলেন, “আমাদের পটচিত্রে প্রধানত পুরাণকাহিনি বর্ণিত থাকে। মহিষাসুরমর্দিনী, রামায়ণ, মহাভারত, মনসামঙ্গল, অন্নদামঙ্গল কাব্যের নানান চিত্র আমরা গল্পচ্ছলে বর্ণনা করি। আট থেকে আশি – সকল ক্রেতাদের খুবই পছন্দ হয় আমাদের কাজ।”

অন্যদিকে বাঁকুড়া বিষ্ণুপুর থেকে পোড়ামাটির কাজ নিয়ে পসরা সাজিয়েছেন সুজাত পাল। সেখানে পাওয়া যাচ্ছে পোড়ামাটির শাঁখ, প্রদীপ, পুতুল, ঘর সাজানোর নানান সৌখিন দ্রব্যাদি। চব্বিশ বছর বয়সী শিল্পী সুজাতর এটাই পারিবারিক ব্যবসা। তাঁর দাদুর হাত ধরে শুরু হয়েছিল পোড়ামাটির কাজ তৈরি করা। সেই ধারা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সুজাত। তিনি জানান, “কলকাতা থেকে বিষ্ণুপুর অনেকখানি রাস্তা। তবুও এই মেলার খবর এলে ট্রেনে করে যখন কলকাতা আসি, অদ্ভুত কেমন একটা আনন্দ হয়। কারণ আমি জানি, আমাদের কষ্টের এই কাজগুলো মানুষ পছন্দ করবেন এবং সঠিক মূল্য দেবেন। আর আমরাও যেন ক্রেতাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারি। তাঁদের জন্যেই তো আমাদের কাজ করে যাওয়া।”

ইকোপার্কের ১ নম্বর গেট ধরে প্রায় ৫০টি প্যাভিলিয়ন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটিতে রয়েছে ৪০টি করে স্টল। এছাড়াও খোলা মাঠে আরও ৩০০০ হাজার স্টল রয়েছে। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে বেতের বোনা ধামা-কুলো, শোলার তৈরি বাহারি ফুল, আবার কোথাও জঙ্গলমহলের টেরাকোটার কাজ, বর্ধমানের তালপাতার সেপাই-ভেপু। রাজ্যের ক্ষুদ্র, ছোটো ও মাঝারি উদ্যোগ এবং বস্ত্র দপ্তর আয়োজিত এই হস্তশিল্প মেলা থেকে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের বাছাই করে পুরস্কৃত করা হয়। এরপর দিল্লির জাতীয় মেলায় শিল্পীরা বাংলার গৌরব শিল্পকলা তুলে ধরেন এবং জাতীয় স্তরের স্বীকৃতি অর্জন করেন বাংলার বহু শিল্পী। ছোটোবড়ো মিলিয়ে প্রায় সাত হাজার স্টল নিয়ে শুরু হয়েছে শীত মরশুমের এই প্রথম মেলা।

____

ছবি – নিজস্ব

Developed by DXDasia