কার্তিক ও সূর্য পরস্পরে সমাপতিত, ইতুপুজো আর কার্তিকপুজোর সম্পর্কও গভীর

একইদিনে পূজিত হন কার্তিক ও ইতু, কখনো একত্রেই

বাংলা পঞ্জিকায় আমরা দেখি, কার্তিক মাসের সংক্রান্তি দিন যমপুকুর ব্রতের সমাপন, কুমারীদের সেঁজুতি ব্রতের আরম্ভ, ইতুব্রতের শুরু, কাত‍্যায়ণী ব্রত (গোস্বামী মতে), আকাশে দীপদান ও সর্বজয়া ব্রত। আশ্চর্যের যে, পঞ্জিকা ইতুকে ‘শ্রী শ্রীমিত্রপূজা’ বলে উল্লেখ করছে। গোস্বামী মতে, তুলার্তকারাম্ভকল্পে নিয়মসেবা মানে কার্তিক ব্রতের সমাপন। এই দিনে আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর প্রথা। এই দিনটি তার শেষ দিন বা সমাপন।

এবার আশ্চর্যের যে জায়গাটি হল, বিভিন্ন ব্রতকথার বইগুলিতে ইতু পূজা নয়, ব্রত হিসাবে চিহ্নিত। এই ব্রত অনুষ্ঠিত হয় অগ্ৰহায়ণ মাসের প্রত‍্যেক রবিবার হয়ে সংক্রান্তির দিন পর্যন্ত। অর্থাৎ, অগ্ৰহায়ণ মাসের শেষ দিনে পুকুর বা নদীতে ইতু বিসর্জন দেওয়া হয়। কুমারীরা ও সধবা মহিলারা এই ব্রত করেন।

‘অষ্ট চাল অষ্টদূর্বা কলস্‌ পাত্রে থুয়ে।
শুন একমনে ইতুর কথা সবে প্রাণ ভরে।।
ইতু দেন বর।
ধন-ধান‍্যে, পুত্র-পৌত্রে বাড়ুক তাদের ঘর।।
কাঠি-কুটি কুড়াতে গেলাম ইতুর কথা শুনে এলাম।
এ কথা শুনলে কী হয়। নির্ধনের ধন হয়।।
অপুত্রের পুত্র হয়। অশরণের শরণ হয়।।
অন্ধের চক্ষু হয়, আইবুড়োর বিয়ে হয়, অন্তিমকালে স্বর্গে যায়।।’

এখানে উল্লেখ‍্য, ব্রতের ছড়াটিতে অন‍্য বিষয় বাদ দিলেও পুত্র-পৌত্র‍, অপুত্রের পুত্র, আইবুড়োর বিয়ে এধরনের বিষয়গুলো আসছে যা উর্বরতাবাদ বা প্রজননের কথা বলে। মানে, এই কথাগুলিই আমরা ষষ্ঠী ব্রতেও শুনেছি বা উল্লেখ পেয়েছি।

এবার যদি সূর্যপুজোর দিকে তাকানো যায় দেখব, সূর্যপুজো প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। নৃতাত্ত্বিক অতুল সুর উল্লেখ করছেন- “ভূমিকর্ষণের ওপর সৌরশক্তির প্রভাব মানুষ বরাবরই লক্ষ‍্য করেছে। এ কারণেই কৃষির প্রাচীন কেন্দ্রসমূহে আমরা মাতৃকাদেবীর পূজার সঙ্গে সূর্যপূজার সংযোগ লক্ষ‍্য করি। সূর্যের প্রতীক চিহ্ন– চক্র ও স্বস্তিক– আমরা মহেঞ্জোদারোয় প্রাপ্ত কয়েকটি সীলমোহরের ওপর দেখতে পাই। প্রাগার্য সূর্যপূজা এখনও হিন্দু লোকায়ত ধর্মের মধ‍্যে জীবিত আছে। বিহারের ছটপুজা ও বাঙলার ইতুপূজা ও রালদূর্গার ব্রত তার প্রমাণ। বৈদিক আর্যগণের মধ‍্যে সূর্যপূজার প্রচলন থাকলেও, এ সকল লোকায়ত পূজা সম্পূর্ণ ভিন্ন।” অতুল সুর সূর্যপুজোর প্রাগার্যযোগ খুঁজেছেন। এখানে উল্লেখ‍্য যে, বাংলায় ইতুপুজোয় যে দুটি ঘট ব‍্যবহৃত হয় তাতে চক্র ও স্বস্তিকা (বিবর্তিত রূপ) চিহ্নের ব‍্যবহার রয়েছে। অন‍্যদিকে, উনি মাতৃকাদেবীর সঙ্গে সূর্যপুজোর সংযোগের কথাও বলেছেন। লক্ষ‍্যনীয়, ইতুকে ব্রতকথায় ইতুলক্ষ্ণী বলা হয়েছে। আসলে এই ব্রত কিছু কিছু জায়গায় উমনো-ঝুমনো ব্রত নামেও পরিচিত। তাহলে কি এই ব্রত পক্ষান্তরে ষষ্ঠীর বা দেবসেনার কথাই বলছে!

এবারে তাকাই ব্রাহ্মণদের ব‍্যবহৃত ‘বিশুদ্ধ নিত‍্যকর্ম পদ্ধতি’-র দিকে। তাতে শ্রীরামদেব স্মৃতিতীর্থ ‘ইতু পূজা’ সম্বন্ধে উল্লেখ করছেন— “অগ্ৰহায়ণ মাসের প্রতি রবিবারে প্রচুর শস‍্যসম্পতিকামী প্রতি গৃহস্থেরই এই পূজা করা উচিত। ইহা মিত্র বা সূর্যদেবের পূজা; এইজন‍্য রবিবারে পঞ্চশস‍্য ছড়াইয়া তাহার উপর ঘট স্থাপন করিয়া এই পূজা করিতে হয়। সূর্যের ধ‍্যান ও আবাহন করিয়া ‘ওঁ মিত্রায় নমঃ’ এই মন্ত্র বলিয়া পূজা করিতে হয়। মিত্রস্থানে মিতু পরে ইতু দাঁড়াইয়াছে।”

শব্দটির বুৎপত্তি খেয়াল করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে– মিত্র>মিতু>ইতু। কার্তিকপুজোয় কার্তিকঠাকুরের সামনে ইতু-সরায় ইতু-ঘট সহ পুজোর ব‍্যবহার চোখে পড়ে। বাঁশবেড়িয়ার বিখ‍্যাত কুণ্ডু পরিবারেও ইতুর সরা কার্তিকের সঙ্গে পুজিত হন। হুগলি সহ রাঢ়ের বহু স্থানে একটি খোদা-সরার মধ‍্যে গঙ্গামাটি দিয়ে ধান, কচু, ছোলা, মটর, সুশনি শাক বসানো হয়। দেখে মনে হয়, ছোট্ট চাষের ক্ষেত। মূলত রাঢ়ের মধ‍্যে ইতুব্রত হয়। তবে, চব্বিশ পরগনা ও অন‍্যত্রও এই ব্রতের ব‍্যবহার রয়েছে। ইতুপুজোয় শস‍্যপূর্ণ ঘট বা মনসাঘটও  পূর্ণগর্ভের প্রতীক স্বরূপ দেওয়া হয়। সন্তান কামনায় উর্বরতাবাদ, গূহ‍্য-জাদুশক্তির প্রভাব ঘটের সঙ্গে জড়িত।

অন‍্যদিকে, ‘বিশুদ্ধ নিত‍্যকর্ম পদ্ধতি’ বইতে কার্তিক ‘পূজা’ ও ‘ব্রত’ বলে উল্লেখিত হয়েছে। কারণটা এই যে, বৈষ্ণব গোস্বামীরা এইসময় কার্তিক ব্রত করেন। এখানে কিন্তু কার্তিকপুজো ব্রতকথা হিসাবে পরিচিত। কার্তিকপুজোর অনেকগুলি মন্ত্র। তার মধ‍্যে একটি মন্ত্রে বলা হয়েছে, “…ওঁ ষষ্ঠ‍্যৈ নমঃ,…ওঁ সূর্যায় নমঃ… ওঁ কোমার্য নমঃ”। কাজেই বোঝা যাচ্ছে যে, ষষ্ঠী ও সূর্যের সঙ্গে কার্তিকের সংযোগ আছে। আবার কৌমার্যের কথাও রয়েছে। কারণটা এই রকম,  কার্তিককে বলা হয় দেবসেনাপতি। শব্দটিকে যদি ভাঙি তাহলে দেখব দেবসেনা+পতি= দেবসেনাপতি। এখানে দেবসেনা হলেন কার্তিকের স্ত্রী। ষষ্ঠীদেবীর অপর নাম দেবসেনা। ঋষি ব্রহ্মার কন‍্যা। দেবসেনা মানে ষষ্ঠী হলেন উর্বরতা ও প্রজননের, শিশুর রক্ষাকারী দেবতা।

আবার কার্তিক উর্বরতা ও প্রজননের দেবতা, শিশুর রক্ষাকারী দেবতা, যোদ্ধজাতিদের ও নৌ-জীবীদের পূজিত দেবতা। একইসঙ্গে শস‍্যদেবতা, সূর্যরূপে, কামুক, জ্ঞানী ও যোগী হিসাবে পরিচিত। হিন্দু পুরাণ অনুসারে কার্তিকের অনেকগুলি নাম, যথা- স্কন্দ, কার্তিকেয়, বিশাখ, শাখনৈগমেয়, মহাসেন প্রমূখ। অভিধান অনুসারে, কার্তিক শব্দটি একটি গ্ৰামীণ শব্দ। কলহন রচিত ‘রাজতরঙ্গিনী’ গ্ৰন্থ থেকে জানা যায়, পুণ্ড্রবর্ধনে, মানে উত্তরবঙ্গে, খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকে কার্তিকপুজো হত। দক্ষিণবঙ্গে মূলত বণিক বা ব‍্যবসায়ীদের উদ‍্যোগে কার্তিকপুজোর প্রচলন ঘটে। যার প্রমাণ বাঁশবেড়িয়া, চুঁচুড়া ও কাটোয়ার মতো জায়গা।

ইতুপুজোয় ছোট্ট দু’টি ঘট পূর্ণগর্ভের প্রতীক স্বরূপ ব‍্যবহৃত হয়। ঠিক তেমনই হুগলির বাঁশবেড়িয়ায় একটি বটো ঘটের পাশে ইতুপুজোর ঘটের মতো ছয়টি ঘট ষষ্ঠীর প্রতীক স্বরূপ, ছয়টি রিপুর প্রতীক স্বরূপ পুজিত হন। এমনটাই বলেন এখানকার ব্রাহ্মণরা (অবিনাশ ভট্টাচার্য প্রমুখ)। অন‍্যদিকে, আশুতোষ ভট্টাচার্য তাঁর ‘বঙ্গীয়লোকসংগীত রত্নাকর’ (২য় খণ্ড) গ্ৰন্থে উল্লেখ করছেন- “প্রাগজ‍্যোতিষভুক্ত অঞ্চলে প্রচলিত নানা দেবদেবীর পূজার অঙ্গ হিসাবে নগ্ন নারীদের নৃত‍্যগীত পরিবেশনের রীতিটি কার্তিকপূজার গোপন উপাচার হিসাবে সম্ভবত পাল রাজত্বকালে গৃহীত হয়।” এই নৃত‍্যগীত শস‍্য-উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত, যা কার্তিক পুজোয় সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। উর্বরতাকেন্দ্রিক জাদু-আচারের নির্দশন এই নৃত‍্য। ঠিক এই রকম নৃত‍্য উত্তরবঙ্গে কোচবিহার, জলপাইগুড়ির ‘হুদুমদেও’ ব্রতে দেখা যায়, যাও উর্বরতার সঙ্গে যুক্ত।

আবহমানকাল ধরে চাষিরা বিশ্বাস করে এসেছেন, উর্বরতার মূলে রয়েছে সূর্য। ‘স্কন্দপুরাণে’র ‘কাশীখণ্ডে’ কার্তিকেয় স্তবে রয়েছে—

“নমোহস্তুতে ব্রহ্মবিদ‍্যাং রবায় দিগম্বরায়াম্বর সংস্থিতায়।
হিরণ‍্যবর্ণায় হিরণ‍্যবাহবে নমো হিরণ‍্যায় হিরণ‍্য রেতসে।।”

এখানে হিরণ‍্যবর্ণা, হিরণ‍্যবাহু ইত‍্যাদি সূর্যের অপর নাম। এরই সমর্থন যোগেশচন্দ্র রায় বিদ‍্যানিধির উল্লেখে—“ ঋগবেদে সবিতা হিরণ‍্যদ‍্যুতি, হিরণ‍্যপাণি। তাঁহার রথ হিরন্ময়।” ‘সবিতা’ বলতে তিনি বলছেন—“উত্তরায়ণ আরম্ভের পরের দুই মাসের সূর্যকে সবিতা বলিতেন।” লোকসংস্কৃতিবিদ সন্দীপকুমার সোম লিখছেন—“সূর্যোপাসনা হয়েছে তার প্রাচীন উপাসনা, সূর্যসম্ভব কার্তিকেয়ও যুক্ত হয়েছেন উর্বরতাবাদের সঙ্গে। প্রসঙ্গত উল্লেখ‍্য, অনান‍্য ভারতীয় দেবতার পূজা যেখানে চান্দ্রতিথিনির্ভর, কার্তিকপূজা অনুষ্ঠিত হয় সৌরতিথি অনুসরণ করে। আরো আশ্চর্য মেয়েলি ব্রতগুলির মধ‍্যে যেগুলির সম্পর্ক মূলত গর্ভধারণ, সুপ্রসব, ফলোৎপাদন প্রভৃতির সঙ্গে, সেগুলিই সাধারণত সৌরতিথি অনুসারী।”

কাজেই, কার্তিকের সঙ্গে সূর্যের সংযোগ পাওয়া গেল। অন‍্যদিকে ইতুব্রতও সূর্যের সঙ্গে সংযুক্ত। ইতু ও কার্তিক পুজো একইদিনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, কখনো কখনো কার্তিকের পাশেই পূজিত হচ্ছেন ইতু। দুটি জায়গাতেই প্রজনন ও উর্বরতার বারবার সংযোগ ঘটেছে। এখানেই ইতুব্রতের সঙ্গে কার্তিকপুজোর সংযোগ-সেতু তৈরি হয়।

গ্ৰন্থঋণ:
১. বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা, সন ১৪২৬

২. বৃহৎ বারোমেসে মেয়েদের ব্রতকথা, কালীকিশোর বিদ‍্যাবিনোদ

৩. বিশুদ্ধ নিত‍্যকর্ম পদ্ধতি, শ্রীরামদেব স্মৃতিতীর্থ

৪. বঙ্গীয়লোকসংগীত রত্নাকর (২য় খণ্ড), আশুতোষ ভট্টাচার্য

৫. ভারতীয় শিল্পধারা প্রাচ‍্য ভারত ও বৃহত্তর ভারত, দেবপ্রসাদ ঘোষ

৭. পূজা-পার্বণ, যোগেশচন্দ্র রায় বিদ‍্যানিধি

৮. হিন্দু সভ‍্যতার নৃতাত্ত্বিক ভাষ‍্য, ড.অতুল সুর

৯. বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস

১০. লোকসংস্কৃতি গবেষণা, কার্তিক ও লোকসংস্কৃতি সংখ‍্যা, সনৎকুমার মিত্র সম্পাদিত

Developed by DXDasia