কানুপ্রিয়া : রতন থিয়ামের শেষ নাট্য-প্রযোজনা

রতন থিয়ামের প্রয়াণের পর প্রথমবার কোনও নাটক মঞ্চস্থ করলো তাঁর নাট্যদল

“যে পরামর্শ দিয়ে অর্জুনকে যুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছিলে, আমাকে সেই পরামর্শ একবার দাও”… ভারতীয় আধুনিক থিয়েটারে গুরুত্বপূর্ণ নাট্যকার ধরমবীর ভারতীর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘কানুপ্রিয়া’ অবলম্বনে, রতন থিয়াম-এর মণিপুরী নাট্য প্রযোজনা ‘কানুপ্রিয়া’য় ফানেক ও দীর্ঘ লাল উত্তরীয় পরিহিত যুদ্ধ-বিরোধী রাধা, কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে বলছে এই সংলাপ।

গামী এপ্রিলে (২০২৬) ইম্ফলের কোরাস রেপার্টরি থিয়েটারের গৌরবময় অর্ধ-শতবর্ষ পূর্ণ হবে, তার আগেই প্রয়াত হয়েছেন (২৩ জুলাই, ২০২৫) আন্তর্জাতিক ইন্দো-গ্রিক ফ্রেন্ডশিপ অ্যাওয়ার্ড ১৯৮৪ (গ্রীস) সম্মানে ভূষিত ভারতীয় আধুনিক থিয়েটারের প্রাণপুরুষ, কোরাস-এর প্রতিষ্ঠাতা রতন থিয়াম। থিয়েটার অফ রুটস্ আন্দোলনের পথিকৃৎ, বহুমুখী প্রতিভাধর এই নাট্য-পরিচালককে গত ১৭ নভেম্বর (২০২৫) আলতো শীতের সন্ধ্যায় নিউ দিল্লির কামানি অডিটোরিয়ামে সুমিত্রা চারাত রাম অ্যাওয়ার্ড ফর লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট সম্মানে ভূষিত করল শ্রীরাম ভারতীয় কলাকেন্দ্র (নিউ দিল্লি)। কোনও নাট্য ব্যক্তিত্বকে প্রথমবার এই সম্মান প্রদান করা হলো, এর আগে পণ্ডিত বিরজু মহারাজ, শ্রীমতি কিশোরী আমোনকার, পণ্ডিত যশরাজ, পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, উস্তাদ আমজাদ আলি খান, শ্রীমতি সোনাল মানসিং প্রমুখ প্রথিতযশা শিল্পীদের এই সম্মান প্রদান করা হয়েছে।

রতন থিয়ামের প্রযোজনা মঞ্চস্থ হয় দীর্ঘদিনের গবেষণামূলক যাত্রার (ল্যাবরেটরি প্রসেস) মধ্যে দিয়ে, কানুপ্রিয়া প্রযোজনাটির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

‘কানুপ্রিয়া’, রতন থিয়ামের শেষ প্রযোজনা। তিনি প্রয়াত হবার পর ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় প্রথমবার কোরাস রেপার্টারি থিয়েটার কোনও প্রযোজনা মঞ্চস্থ করে। অভিনয় করলেন কানুপ্রিয়া- ইন্দিরা, কানু-কৃষ্ণচন্দ্র, সখি- তরুণী, রোজিতা, রাশিয়া, রোশনি। প্রযোজনাটি মঞ্চস্থ হলো সহকারি-পরিচালক, রতন থিয়ামের পুত্র থাওয়াই থিয়ামের তত্ত্বাবধানে। সম্মাননা অনুষ্ঠান উপলক্ষে কামানির ফয়ারে রতন থিয়ামের প্রযোজনার একটি স্থিরচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।

থিয়েটার একটি যৌথ শিল্পমাধ্যম, রতন থিয়াম-এর মতো শিল্পের প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রে নিবিড় চর্চা ও পারদর্শিতাকে পাথেয় করে নাট্য-প্রযোজনা করেছেন এমন পরিচালক বিশ্ব থিয়েটারে বিরল। রতন থিয়ামের প্রযোজনা মঞ্চস্থ হয় দীর্ঘদিনের গবেষণামূলক যাত্রার (ল্যাবরেটরি প্রসেস) মধ্যে দিয়ে, কানুপ্রিয়া প্রযোজনাটির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ধরমবীর ভারতীর মহাভারত আশ্রিত উল্লেখযোগ্য নাটক ‘অন্ধাযুগ’ ভারতীয় আধুনিক থিয়েটারকে বিশেষ প্রভাবিত করেছে। পরিচালক ইব্রাহিম আলকাজীরের অন্ধাযুগ (১৯৭৪) দিল্লিতে প্রযোজিত হবার পর ভারতীয় থিয়েটারে, মোহন রাকেশ পরবর্তী হিন্দি নাটককার ধরমবীর ভারতীর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব প্রত্যক্ষ করা যায়, পরবর্তীকালে অলকাজির প্রিয় ছাত্র রতন থিয়াম একেবারে ভিন্ন আঙ্গিকে অন্ধাযুগ (১৯৯৪) মঞ্চস্থ করেন। কালিদাসের ‘ঋতুসংহারম’ অবলম্বনে প্রযোজিত হয়েছিল আধুনিক বিশ্ব-থিয়েটারের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা ‘ঋতু’ (২০০৪)। প্রচলিত অর্থে ‘ঋতুসংহারম’ নাটক নয়, একটি আখ্যানমূলক কাব্য। কবি কালিদাস ছয়টি ঋতুকে এখানে অনেকগুলো পর্বে বিভক্ত করে ঋতুগুলিকে কাব্যিক সৌন্দর্যে দৃশ্যমান করে তুলেছেন। অর্থাৎ ‘কানুপ্রিয়া’র পূর্বেই কবিতার আধারে নাট্য প্রযোজনা করে ভারতীয় থিয়েটারকে সমৃদ্ধ করেছেন রতন থিয়াম।

ধরমবীর ভারতীর কানুপ্রিয়ায় রাধার দৃষ্টিতে কৃষ্ণকে আমরা দেখতে পাই, যার মাধ্যমে কবি রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের আধুনিক ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করেছেন। কানুপ্রিয়া (রাধা) মনে করে মহাভারতের যুদ্ধ নিষ্প্রয়োজন ছিল, সে যুদ্ধে কেউ জয়ী হতে পারেনি, অন্তে দুই পক্ষের পরাজয় হয়েছে – এমনই এক টেক্সটকে কবি রতন থিয়াম নিজস্ব আঙ্গিকে আক্ষরিক অর্থেই মঞ্চে দৃশ্যকাব্যে রূপান্তরিত করেছেন। টেক্সটের থিমেটিক কন্টেন্টকে মঞ্চে কীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, ভারতীয় থিয়েটারে রতন থিয়াম তার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন।

কানুপ্রিয়া (রাধা) মনে করে মহাভারতের যুদ্ধ নিষ্প্রয়োজন ছিল, সে যুদ্ধে কেউ জয়ী হতে পারেনি, অন্তে দুই পক্ষের পরাজয় হয়েছে – এমনই এক টেক্সটকে কবি রতন থিয়াম নিজস্ব আঙ্গিকে আক্ষরিক অর্থেই মঞ্চে দৃশ্যকাব্যে রূপান্তরিত করেছেন।

প্রযোজনার শুরু থেকেই কৃষ্ণকে একটি ফুল গাছের তলায় বসে থাকতে দেখা যায়, কৃষ্ণের কোনো সংলাপ না থাকলেও মঞ্চে বসেই সে বাঁশি বাজায়, পরিচালক বাঁশির সুরকে রাধার সংলাপের আবহ করে তুলেছেন। মঞ্চে কৃষ্ণ, রাধা ও তার পাঁচ সখীকে দেখা যায়। রাধা ও সখীরা সকলেই নৃত্য সংগীত ও অভিনয়ের বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তা বোঝা যায়। একটি দৃশ্যে মঞ্চের কেন্দ্রে ধীরে ধীরে আলো এলে দর্শক অভিমুখে একটি সারিতে সামনে রাধা ও পিছনে সখী, সখীদের মুখে একই সাদা মুখোশ, বুঝতে অসুবিধা হয় না, সমস্ত নারীর অন্তরের রাধার অস্তিত্বকে এই দৃশ্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন পরিচালক।

মঞ্চের সামনের উইংস থেকে উইংসে, মেঝের উপর নীল মশারি জালের একটি রেখা নদী হয়ে আছে। রাধা ও সখীরা যমুনায় জল নিতে এসেছে, এই দৃশ্যে রতন থিয়ামের দৃশ্যায়নের ম্যাজিকে মশারির জাল মুহূর্তে আমাদের নদীর গভীরে নিয়ে যায়, আমরা যমুনায় আনন্দ সাঁতার দিতে দেখি রাধা ও সখীদের। অন্য একটি দৃশ্যে নীল পাগড়ি হাতে কৃষ্ণের জন্য বিলাপ করে রাধা, দৃশ্যটির শেষে রাধা নিজেই সেই পাগড়ি পরে কৃষ্ণের বংশীবাদক ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকে, এইভাবে দৃশ্যটিকে মঞ্চ থেকে মুছে দিয়ে কৃষ্ণের প্রেমে রাধাকে বিলীন করে দেন পরিচালক। রতন থিয়াম রবীন্দ্রনাথকে বাংলায় পড়েছেন, রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্র চিত্রকলা তার অন্যতম প্রিয় বিষয়, বারবার তার প্রযোজনায় অনায়াস প্রবেশ করেছে রবীন্দ্রনাথের গানের সুর, ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে’ গানটির সুরে হামিং করতে করতে মণিপুরী নাচের মুদ্রায় সখীদের সঙ্গে নৃত্যরত রাধা, সুর ও কোরিওগ্রাফিকে অবলম্বন করে পরিচালক রাধার প্রেমকে ধীরে ধীরে পূজার পর্যায়ে নিয়ে যায়।

শেষ দৃশ্যে সাদা কেশ ও শুভ্র শাড়ি পরে মঞ্চের সামনের ডান দিকের উইংস থেকে বার্ধক্যে পৌঁছে যাওয়া রাধা মঞ্চে প্রবেশ করে এগিয়ে যায়, মেঝেতে লুটিয়ে পড়া তার দীর্ঘ সাদা আঁচলে ফেলে আসা সময়কে ফিরে দেখে রাধা। ঠিক তখন পিছনে পূর্ণচন্দ্রের নিচে রাসের পোশাকে ও মুদ্রায় দেখা যায় চার নারীকে, কৃষ্ণ একইভাবে বাঁশি হাতে, ফুল গাছের নিচে বসে থাকে। অপেক্ষা আর সময় রাধাকে বার্ধক্যে নিয়ে গেছে, কিন্তু আজও একইভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে রাসলীলা। রতন থিয়ামের অন্যান্য প্রযোজনার তুলনায়, এই প্রযোজনায় মঞ্চসজ্জায় অনেক বেশি শূন্যতার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যাওয়ার সময় তার ‘পেইন্ট এন্ড ইরেজ’ পদ্ধতি প্রত্যক্ষ করা গেলেও, একটি দৃশ্যে পরিচালক সচেতনভাবে ব্যাকস্টেজের শিল্পীদের সেট পরিবর্তন করার মুহূর্তকে দৃশ্য হিসাবে দর্শকদের দেখান। কানুপ্রিয়ার মঞ্চসজ্জায় অনুভূমিক ডিজাইন লক্ষ্য করার মতো। কানুপ্রিয়ায়, মঞ্চ-কবিতার নৈসর্গে আমাদের সঙ্গে নিয়ে হাঁটেন রতন থিয়াম।
 

Developed by DXDasia