নিছক ফটোগ্রাফার নয়, এক ‘অ্যাক্টিভিস্টের’ গল্প

ক্যামেরাই অস্ত্র শহিদুল আলমের। ছবি তাঁর কাছে নিছক সাবজেক্ট নয়…

“তোমায় নিয়ে যদি কেউ কেউ অস্বস্তিতেই না পড়ে, তাহলে বুঝবে তুমি নিশ্চয়ই কোনও ভুল করছ।” এটাই শহিদুল আলমের জীবনদর্শন। বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফটোগ্রাফার। শুধু এটুকু বললে তাঁর সম্পর্কে কিছুই বোঝানো যাবে না।

মহেশখালিতে খাবারের লাইন

ফটোগ্রাফির আন্তর্জাতিক মানচিত্রে বাংলাদেশকে প্রায় একার হাতে যুক্ত করেছেন আলম। গত শতাব্দীর আশির দশক থেকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিকতম ছাত্র-আন্দোলন— আলমের ক্যামেরা এই গোটা ইতিহাসের সাক্ষী। তাঁর হাতের ক্যামেরা গল্প বলে, কখনও ছবিও আঁকে। কখনও দর্শককে ভিতর থেকে নাড়িয়েও দেয় শিকড়-শুদ্ধ। এবং এইসূত্রে আলমের ধর্ম নিছক নিরাসক্ত শিল্পীর নয়। তিনি অবজেক্ট’কে বিচ্ছিন্নতার দূরত্ব থেকে ফ্রেমে সাজান না। শিল্পের প্রকরণকে সর্বাঙ্গীন মান্যতা দিয়েও যাঁর দায়িত্ব আরও বড়। ছবির মধ্যে দিয়ে প্রতিবাদ, ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা, সংঘর্ষ ও নির্মাণ। শহিদুল আধুনিক ফটোগ্রাফারদের বিশ্বে তাই বড় ব্যতিক্রম। যিনি নিজেকে মনে করেন গণতন্ত্রের একজন অ্যাক্টিভিস্ট। বলা ভালো যোদ্ধা। যাঁর হাতে অস্ত্র বলতে ক্যামেরা।  

কাশ্মীরের ভূমিকম্প

শুধু ছবি নিয়ে পড়ে থাকলে তাঁকে নিয়ে এত সমস্যা হত না হয়ত ক্ষমতাসীনদের। কিন্তু, শহিদুলকে বিপজ্জনক মনে হয়। তিনি বারবার অস্বস্তিতে ফেলেন ‘কাউকে কাউকে’। ফেলতে চান। তাই তো গত বছর, বাংলাদেশের উত্তাল ছাত্র-আন্দোলনকে ক্যামেরাবন্দি করতে নেমে পড়েন রাস্তায়। এতেই না থেমে গত ৫ আগস্ট, আল জাজিরাকে দেওয়া লাইভ অনলাইন সাক্ষাৎকারে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে দাঁড়িয়ে তীব্র সমালোচনাও করেন সরকারের। ঐদিনই রাত সাড়ে দশটায় তাঁকে ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে ধরে এনে আটক করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সরকারের নামে মিথ্যে অপবাদ দিয়েছেন। জামিন পেলেও তথ্য প্রযুক্তি আইনে আলম আপাতত বিচারাধীন। আলম সংবাদ-মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তাঁর ওপরে শারীরিক নির্যাতন চলছে। আলমের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য শিল্পী, মানবাধিকার কর্মীরা। আলমকে মুক্ত করার জন্য তোলপাড় হয়েছিল বাংলাদেশ। 

ক্রসফায়ার

শহিদুল আলম এমনই একজন মানুষ। অসমসাহসী, স্পষ্টবক্তা। এবং অসামান্য ফটোগ্রাফার। প্রকৃতি যাঁর ফ্রেমে পদ্যের মোহর হয়ে ওঠে, আবার ভূমিকম্প বিধ্বস্ত কাশ্মীরও নিজের গল্প খুঁজে পায়। ছবি তোলার সূত্রপাত লন্ডনে। লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে অর্গানিক কেমিস্ট্রি নিয়ে তখন গবেষণা করছেন আলম। এখানেই ১৯৮৩তে তিনি ফটোগ্রাফির হার্ভে হ্যারিস ট্রফি জিতে নেন। ফটোগ্রাফার হিসেবে পেশাদার জীবনের শুরুও লন্ডনেই, ‘ইয়ং রাস্কেলস স্টুডিও’তে। কিন্তু, নিজের ছবির দুনিয়াকে বিলেতে স্থায়িত্ব দিতে চাননি শহিদুল। তাই ১৯৮৪-তেই ফিরে এলেন দেশে। বাংলাদেশে তখন ফটোগ্রাফির সুযোগ, পরিসর প্রায় নেই বললেই চলে। শুধু ক্যামেরা কাঁধে ছবির খোঁজে খোঁজে ঘোরা নয়, বাংলাদেশে ফটোগ্রাফিকে একটা শক্ত জমি দেওয়ার জন্যও তাই চেষ্টা চালাতে হয়েছিল শহিদুলকে।

মসজিদের অন্দরমহল

তাই, বাংলাদেশে অনেক ‘প্রথম’-এর জন্মদাতা শহিদুল। বাংলাদেশের প্রথম ফটোগ্রাফির সংস্থা ‘দৃক ফটো গ্যালারির’ প্রতিষ্ঠাতা তিনিই। ১৯৯৮ সালে শুরু করেন বাংলাদেশের প্রথম ফটোগ্রাফির স্কুল– ‘পাঠশালা’। এর আগে আলমের হাত ধরেই চালু হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম ই-মেইল নেটওয়র্ক। এখানেই শেষ নয়, এশিয়ার সর্বপ্রথম ফটোগ্রাফির উৎসব ‘ছবি মেলা’র জন্মদাতাও শহিদুল। প্রতিটা নামকরণেই বাংলার স্পর্শ। তাঁর ছবির পৃথিবীর একটা বড় জায়গা জুড়েও বাংলাদেশের জনজীবন, ল্যান্ডস্কেপ, আন্দোলন, বিবর্তন। অথচ ক্যামেরার ভাষায় শহিদুল বারবার পেরিয়ে যান সীমারেখা। সেখানে তিনি আদ্যন্ত আন্তর্জাতিক।

তবে, এই আলমকে, তাঁর ফটোগ্রাফিকে চেনাই যাবে না তাঁর অ্যাক্টিভিস্ট সত্তার কথা না বললে। দেশে ফেরার পরই যাঁর ক্যামেরায় উঠে এসেছিল উত্তাল বাংলাদেশ। এরশাদ-বিরোধী গণআন্দোলনের একের পর এক সাদাকালো ফ্রেম তখন বাংলাদেশের আনাচ-কানাচ থেকে তুলে আনছেন আলম। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক নানা বাঁকবদলের কথক তাঁর ক্যামেরা। একইসঙ্গে ক্যামেরা কাঁধে ছুটে গেছেন ’৮৮ সালের ভয়ঙ্কর বন্যা-আক্রান্তদের মধ্যে, ভয়াবহ সাইক্লোনে ক্ষতিগ্রস্তদের ছবিও তুলেছেন। ভূমিকম্পের সময় ছুটে গেছেন কাশ্মীর। তাঁর ছবি অসংখ্য মানুষের নিস্পৃহ শান্তির জীবনকে ধাক্কা দিয়ে গেছে হঠাৎ হঠাৎ। মসজিদের অন্দরমহল নিয়ে বিখ্যাত সিরিজ ‘এমব্রেসিং দ্য আদার’-এ তাঁর ক্যামেরা একইসঙ্গে কথা বলে উঠেছে বিশ্বব্যাপী ইসলামোফোবিয়া এবং ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে। ইসলাম নিয়ে এই দুই নেতির মাঝে এক ইতির চরের সন্ধান করেছেন শহিদুল। তাঁর ছবিগুলোর গায়েও যেন সেই অনাঘ্রাতা ইতির আলো মাখানো।

কল্পনার লেখা ডায়েরির পাতায়

তবে, সবকিছুই যে ইতিবাচক হতে পারে না, তাও আলম জানেন। এ-দেশে যা এনকাউন্টার, বাংলাদেশে তাই ‘ক্রসফায়ার’। আলমের একটি বহুবিতর্কিত সিরিজের নামও ‘ক্রসফায়ার’। একটা ছবি তোলপাড় ফেলেছিল। ময়নাতদন্তের টেবিলের সামনে স্ট্রেচার-ট্রলি। সেখানে সাদা কাপড়ে মোড়ানো মৃতদেহ। নাম নেই, মুখ নেই, পরিচয় নেই। মৃত্যুর যথাযথ কারণও নেই। ‘ক্রসফায়ার’-এর ভিতরের গল্পগুলো আসলে এমনই।

কল্পনার শেষ গল্পের সাক্ষী গাছের পাতার ম্যাগনিফায়েড ছবি

এই প্রদর্শনী প্রশাসন বন্ধ করে দিয়েছিল দ্রুতই। কিন্তু আলমের ক্যামেরাকে আটকানো যায়নি। বাংলাদেশের পাহাড়ি আদিবাসি-আন্দোলনের নেত্রী কল্পনা চাকমা। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন তাঁকে তাঁর গ্রামের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় বাংলাদেশ আর্মি। অথচ এই ঘটনার নাকি কোনও সরকারি প্রমাণ নেই। কেউ জানে না, কারা তাঁকে কোথায় নিয়ে গেছে, তাঁর কী হয়েছে। যে রাষ্ট্রীয়-অপহরণের, হত্যাকাণ্ডের কোনও প্রমাণই সরকারি স্তরে নেই, নিজের ঘরানা ভেঙে সেই প্রমাণেরই এক অদ্ভুত ইমেজ-সারি তৈরি করেছিলেন শহিদুল। সেখানে জুম লেন্সে উঠে এসেছিল কল্পনার জুতোর সেগমেন্ট, ওড়নার সুতোলি ঢেউ, কল্পনার শেষ গল্পস্থল বাজারের পাশে পড়ে থাকা পাতার ম্যাগনিফায়েড ভিউ, কল্পনার ডায়েরিতে লেখা ‘ভয়’… নিজের ভাষাকেও কীভাবে ভেঙেচুরে নতুন করে নিতে হয়, আলম তা জানেন। তাঁর কাঁধের ক্যামেরা এই সব সংঘর্ষ, হত্যা, আন্দোলন, ঢাল-উপুড়ের সাক্ষী। নিজের বই ‘মাই জার্নি অ্যাস আ উইটনেসে’ও এই শিল্পদর্শনের কথাই বলেছেন শহিদুল। একজন ফটোগ্রাফার নিজেই একজন প্রমাণ। কারণ, ছবি কখনও মিথ্যে বলে না। শত চাপেও না।

বাংলাদেশের ল্যান্ডস্কেপ

আবার এই আলমই কবিতার মতো খুঁজে পেয়েছেন বাংলাদেশের মায়াবি ল্যান্ডস্কেপ। সেখানে তাঁর ক্যামেরার ভাষা এক্কেবারে আলাদা। কিন্তু, নিজের দর্শনের জমি থেকে এখানেও সামান্য সরেন না আলম। বাংলাদেশের প্রকৃতির চিরায়ত সত্যিটাই তাঁর ফ্রেম। আটপৌরে সৌন্দর্যের সবুজ, আকাশের অগাধ নীল, সাদাকালো ফুলের রঙ। পরাবাস্তবতা ছুঁয়েও কী সত্যি! 

শহিদুলের গ্রেপ্তারি

আলম জানেন ফটোগ্রাফারের জীবন সত্যদ্রষ্টার জীবন। তাঁর দেখার চোখ ভুল করতেই পারে কখনও, কিন্তু, জীবনধর্মে একচুলও টাল পড়বে না। আমরা জানি না, শহিদুল সত্যিই কতখানি দোষী সাম্প্রতিক ঘটনায়। আমরা জানি না, ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়িয়ে সরকারের সমালোচনায় কতখানি রাজদ্রোহ, বিশ্বাসঘাতকতা মিশে আছে। আমরা শুধু জানি, শহিদুল একজন আদর্শ শিল্পী। অলীক কথক। ফ্রেমের অবজেক্টকে তিনি নিজের দায়িত্বের পৃথিবীর বাইরে রেখে দেখতে শেখেননি। ক্যামেরার চোখ আর নিজের দর্শনকে আলাদা করতে শেখেননি।

ও হ্যাঁ, আজ বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস। 

Developed by DXDasia