আসামে ‘বাঙালি খেদাও’-এর পিছনে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি?
আসামে অনুপ্রবেশ নিয়ে বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদীর সরকার অনেকদিন থেকেই তৎপর। নতুন করে রাষ্ট্রীয় জনগণনাপঞ্জী তৈরি করার কাজে হাত দেবার উদ্দেশ্য সেটাই। তার জন্য আসামের সাড়ে তিন কোটি মানুষকে সমন ধরানো হয়েছিল। আসামের বর্তমান বিজেপি সরকারের অধীনে সেই কাজ শুরু হয়েছে। তাতে দেখা গেল আপাতত তালিকায় চল্লিশ লক্ষ লোকের নাম নেই। অর্থাৎ, সন্দেহভাজনদের মধ্যে তিন কোটি দশ লক্ষ মানুষ খাঁটি ভারতীয় নাগরিক। অর্থাৎ সমন ধরানো মানুষদের সাতভাগের ছয়ভাগই আধমার্কা ভারতীয়। বাকি চল্লিশ লক্ষও বিদেশি নয়। কারণ তাঁরাও নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য পুনরায় আবেদন করতে পারবেন। তাহলে সাতমণ তেল পুড়িয়ে রাধা এতদিন নাচল কেন?
আসামে ‘খেদাও আন্দোলন’ নতুন কিছু নয়। ১৯৬০ সালে শুরু হয় হিন্দু বাঙালি খেদাও আন্দোলন। তখন মুসলমানরা বিবেচনায় আসেনি, কারণ আসাম প্রদেশ কংগ্রেসে স্তম্ভ ছিলেন তইমুল হক চৌধুরী এবং ফগরুদ্দিন আলি আহমেদ। ১৯৮০ সালে অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (ASU) প্রফুল্ল মহান্ত আর ভৃগু ফুকনের নেতৃত্বে যে আন্দোলন শুরু করে, তার পিছনে বিজেপির পুরো মদত ছিল। তখন স্থির হয় ১৯৭১ সালের পরে যারা আসামে ঢুকেছে তাদের বিদায় করা হবে। চুক্তি হল, আসু ক্ষমতায় এল। প্রফুল্ল মুখ্যমন্ত্রী হলেন, ভৃগু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু তারপরে কাউকেই আর খেদানো হল না।
আরও পড়ুন
নকশাল আন্দোলনের দুর্বলতা
১৯৬০ সালে হিন্দু-বাঙালিদের আতঙ্কিত করা হয়েছিল, যাতে তারা বামেদের দিকে না ঝুঁকে কংগ্রেসকে ভোট দেয়। ১৯৮৫ সালের পর প্রফুল্ল-ভৃগুও বুঝলেন তারা ভয় পেয়েছে, তারা আসুকেই ভোট দেবে। ২০১৮ সালেও এই ভয় পাওয়ানোর ট্র্যাজিক ট্র্যাডিশনটাই অব্যাহত রয়েছে। যে তিন কোটি নাগরিক, নাগরিকত্বের পরীক্ষায় এবারে পাশ করে গেছে তারা বুঝেছে, আসামে বাস করে বিজেপির সঙ্গে বিবাদ করা ঠিক নয়। এক্ষমান চল্লিশ লক্ষ এই বিষয়ে অবশ্যই আরও বেশি আতঙ্কিত।
ঠিক একই ছকে কিছুদিন আগে বেঙ্গালুরুতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষকে খেদানো হয়। কারণ তারা নাকি মোঙ্গলীয়, ভারতীয় নয়। মহারাষ্ট্রে দুই বছর আগে বিহারি খেদাও অভিযান শুরু করার কারণ তারা মারাঠি নয়। অতিসাম্প্রতিক ক্ষুদ্র রাজ্য মেঘালয়েও শিখ ও নেপালিদের খেদানো শুরু হয়েছে।

এইসব খেদানোর পিছনে সবসময় দেশীয় সীমান্ত পার করে দেবার অভিসন্ধি থাকে না। প্রতিটি এলাকার ঘটনার পিছনে পৃথক পৃথক রাজনৈতিক ছক তৈরি হয়। তার থেকে যে কেবল রাজনৈতিক দল ফায়দা তোলে তা নয়। দলকে মদত দেয় যে স্বার্থান্বেষীরা, তারাও তার থেকে লাভবান হয়। আসামে ১৯৬০ সালে ‘বঙ্গাল খেদানো’র পিছনে ধর্মীয় আবেগ অবশ্যই ছিল। কিন্তু মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালিদের বিষয়-সম্পত্তি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য গ্রাস করা। আশির দশকে মুসলমান খেদানো ছিল ভোট ব্যাঙ্কের দুশ্চিন্তা। বেঙ্গালুরুতে মোঙ্গলীয়দের খেদানোর কারণ চাকরির বাজারে তাদের প্রাধান্য। মুম্বাইয়ে বিহারি খেদানোর পিছনে ছিল শিবসেনার ভোট কমে যাবার ভয়। মেঘালয়ে শিখ আর নেপালিরা শিলঙের এমনসব জমিতে বসত গড়ছে যা সোনার চেয়েও দামি। সুতরাং তাদের খেদানো দরকার। গোধরা দাঙ্গার পুরোটাই চালনা করেছে জমি হাঙররা। এবারে আসামে যে গণনা সেটাও একমাত্র ভোটব্যাঙ্ক সংহত করার তাগিদেই।
বিজেপি নেতারা এখন বলছেন এবার নাকি পশ্চিমবঙ্গেও তেমন গণনা শুরু হবে। তারও মূল লক্ষ্য হবে ভয় দেখিয়ে ভোটব্যাঙ্ক সংহত করা। রবীন্দ্রনাথের রাখি বন্ধন উৎসব উদযাপন করে এদের তেমন পোষাবে না। এইজন্য তারা এবার ১৯৪৬ সালে হাসান শাহিদ শারোয়ার্দি কলকাতায় যে দাঙ্গা বাঁধিয়েছিলেন, সেটাকেই স্মরণ করবার উদ্যোগ নিচ্ছেন। যদিও, ১৯৪৬ সালে ভারতীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ বলে কোনও সমস্যা ছিল না। কারণ, তখনও দেশটা ভাগই হয়নি।
ছবি সূত্র- ফ্রি প্রেস জার্নাল