জয়দেব-কেঁদুলির মেলা : বাউল গান ও ঐতিহ্যের মহা-মিলন

জয়দেবের মেলা শুরু হচ্ছে আগামী ১৪ জানুয়ারি

জয় নদের তীরে কেঁদুলিতে কবি জয়দেবের স্মৃতিতে প্রতি বছর আয়োজিত হয় বিশাল বাউল-ফকির মেলা, যা মূলত জয়দেব-কেঁদুলির মেলা (Joydev-Kenduli Mela 2026) নামে পরিচিত। দেশ-বিদেশের লক্ষাধিক মানুষের সমাগমে কয়েকটা পূর্ণ থাকে অজয়ের তীর। হাজার হাজার বাউল, ফকির, সন্ন্যাসীদের উজ্জ্বল উপস্থিতিতে অস্থায়ী আখড়াগুলো ভরে ওঠে বাউল গানের সুরে। প্রতি বছর মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে জয়দেব মেলা শুরু হয়, চলতি বছর জয়দেবের মেলা শুরু হচ্ছে আগামী ১৪ জানুয়ারি, মেলা চলবে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত।

বীরভূম ও বর্ধমানের সীমানায় কবি জয়দেবের স্মৃতিবিজড়িত এই মেলা কেবল কেনাকাটা বা বিনোদনের জায়গা নয়, বরং এটি বাংলার লোকগান, বিশেষ করে বাউল সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কিংবদন্তি অনুসারে, দ্বাদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত সংস্কৃত কবি জয়দেব গোস্বামী, যিনি অমর কাব্য ‘গীতগোবিন্দম্’ রচনা করেছিলেন, তাঁর জন্মস্থান এই কেঁদুলি গ্রাম। কথিত আছে, তিনি প্রতিদিন গঙ্গাস্নানে যেতেন, কিন্তু তাঁর ভক্তি ও বার্ধক্যের কথা বিবেচনা করে মা গঙ্গা নিজেই অজয় নদে অবতীর্ণ হন। সেই পুণ্যস্মৃতিতে প্রতি বছর মকর সংক্রান্তির দিন থেকে এখানে মেলা শুরু হয়।

 

এই মেলার প্রধান সম্পদ এখানকার আখড়াগুলি। মেলা প্রাঙ্গণে শত শত অস্থায়ী আখড়া তৈরি করা হয়, যেখানে দিন-রাত চলে বাউল, ফকির ও বৈষ্ণবদের গান। একতারা, ডুগি আর নূপুরের ছন্দে ভেসে আসে জীবন দর্শনের কথা। বাংলার দূর-দূরান্ত থেকে বাউলরা এখানে আসেন এবং তাঁদের জীবনদর্শন বিনিময় করেন। পর্যটকদের কাছে এই আখড়াগুলিই মেলার প্রধান আকর্ষণ। বাউল-ফকিরদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা ও গান শোনার সুযোগ থাকে এই মেলায়।

মেলার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দিক:
পুণ্যস্নান: মকর সংক্রান্তির ভোরে অজয় নদের পুণ্যতোয়া জলে হাজার হাজার মানুষ পুণ্যস্নান করেন।

রাধাবিনোদ মন্দির: ১৬৮৩ সালে বর্ধমানের মহারাজা কীর্ত্তিচাঁদ বাহাদুর এবং মহারানি ব্রজকিশোরী দেবী প্রতিষ্ঠিত পোড়ামাটির কারুকার্যময় রাধাবিনোদ মন্দিরটি এই মেলার ঐতিহাসিক কেন্দ্রবিন্দু।

মন্দিরের কারুকার্য: মন্দিরের উপরিভাগে নয়টি রেখ-শিখর নবরত্নের আকারে একটি মধ্যভাগে এবং নিম্ন দুটি ধাপের কোণায় বিন্যস্ত। মন্দির গাত্রের নকশি ইটে বিষ্ণুর দশ অবতার ও রামায়ণ-কাহিনিচিত্রের বর্ণনা পাওয়া যায়।

হস্তশিল্প ও গ্রামীণ বাণিজ্য: মেলায় বীরভূমের স্থানীয় হস্তশিল্প, মাটির হাঁড়ি-কুড়ি এবং গৃহস্থালির জিনিসের এক বিশাল সমাহার ঘটে।

বর্তমান আধুনিকতার যুগেও জয়দেব-কেঁদুলির মেলা তার প্রাচীন গৌরব ধরে রেখেছে। দেশি পর্যটকদের পাশাপাশি প্রচুর বিদেশি পর্যটকও এখানে আসেন বাউল গানের টানে। বর্তমানে সরকারি উদ্যোগে মেলার নিরাপত্তা ও পরিকাঠামোর যথেষ্ট উন্নতি করা হয়েছে, যাতে লোকশিল্পীরা স্বচ্ছন্দে তাঁদের শিল্প পরিবেশন করতে পারেন। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে জয়দেব-কেঁদুলির মেলা সম্প্রীতির বার্তা বহন করে। যতদিন বাংলার আকাশে বাউল গানের সুর ধ্বনিত হবে, ততদিন এই মেলার গুরুত্ব অম্লান থাকবে।

মেলা প্রাঙ্গণে শত শত অস্থায়ী আখড়া তৈরি করা হয়, যেখানে দিন-রাত চলে বাউল, ফকির ও বৈষ্ণবদের গান। একতারা, ডুগি আর নূপুরের ছন্দে ভেসে আসে জীবন দর্শনের কথা। বাংলার দূর-দূরান্ত থেকে বাউলরা এখানে আসেন এবং তাঁদের জীবনদর্শন বিনিময় করেন।

কীভাবে যাবেন
কেঁদুলি (জয়দেব) যাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হল ট্রেন বা বাসে করে দুর্গাপুর বা বোলপুরে গিয়ে সেখান থেকে বাস বা অটোতে করে মেলা প্রাঙ্গণে পৌঁছানো; দুর্গাপুর বা বোলপুর থেকে বাস, অটো বা ট্যাক্সি ভাড়া করে সরাসরি যাওয়া যায়, বিশেষ করে মেলার সময় দুর্গাপুর স্টেশন থেকে সরাসরি বাস পাওয়া যায়। ট্রেনে হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ধরে দুর্গাপুর অথবা বোলপুর স্টেশনে নামুন। অথবা দুর্গাপুর স্টেশন থেকে সরাসরি বাস, অটো বা ট্যাক্সি নিয়ে জয়দেব কেন্দুলির দিকে যেতে পারেন। বোলপুর থেকে বাস বা অটোতে করে মুচিপাড়া পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে কেঁদুলি যাওয়া যায়। দুর্গাপুর ও বোলপুর দুই জায়গা থেকেই কেঁদুলি প্রায় ২৫-৩০ কিমি দূরে, তাই যে কোনো একটি স্টেশন থেকে সংযোগকারী গাড়ি নিন।

কোথায় থাকবেন
জয়দেবে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগম (WBTDCL) পরিচালিত বাউল বিতান ট্যুরিজম প্রপার্টি। থাকা-খাওয়ার পাশাপাশি রয়েছে বাউল গান, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ বাংলার অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ।

বুকিং করার যোগাযোগ- ইমেইল: baulacademy2022@gmail.com, অনলাইন বুকিং: WBTDCL-এর ওয়েবসাইট।

Developed by DXDasia