এই প্রথমবার মঞ্চস্থ হলো মহাশ্বেতা দেবীর ছোটোগল্প ‘উর্বশী ও জনি’
ইতিহাস চেতনা এমন হওয়া বাঞ্ছনীয়, যা বর্তমান সময়কে বুঝতে সাহায্য করবে। শিল্পের জন্য শিল্প করার ক্ষমতা বা সাধ মহাশ্বেতাদেবীর কোনও কালেই ছিল না, করেননি। তিনি লিখে গেছেন, সোজাসাপটা। সাহিত্যকে নিছক বিষয়বস্তু, ভাষা, শৈলী ও আঙ্গিকের নিরিখে বিচার করতেন না। আধিপত্য বিস্তারকারী হেজিমনি (hegemony) সম্প্রদায় নয়, তাঁরই চেতনার লাল শালুকে গর্ভ হয়েছিল ঝাঁসির রানি’র, তিতুমীর-এর, হাজার চুরাশির মা-এর, চোট্টি মুন্ডা’র, ধানী মুন্ডা’র, হরমু, হুলকে’র। মানব-আবেগ ও সামাজিক পরিকাঠামোর এমন মিলমিশ বাংলা সাহিত্যকর্মের সম্পদ।

সেই মহাশ্বেতাদেবী’র গল্প অবলম্বনে দমদম ‘গোত্রহীন’ নির্মাণ করেছে মিউজিকাল ড্রামা ‘জনি আই লাভ ইউ’। মহাশ্বেতাদেবীর বিভিন্ন লেখা থেকে একাধিক নাটক-সিনেমা হলেও এই প্রথমবার মঞ্চস্থ হলো তাঁর ছোটোগল্প ‘উর্বশী ও জনি’, যা ইন্দিরা গান্ধির আমলে জরুরি অবস্থার প্রেক্ষিতে লেখা।
১২ মে, গিরিশ মঞ্চে গোত্রহীনের নতুন এই নাটকটা দেখতে গিয়ে মনে পড়ছিল ফিলিপিন্সের চলচ্চিত্র পরিচালক লভ দিয়াজের ‘হিস্ট্রি অফ হা’-এর কথা। ২০২১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে। ছবির গল্প ফিলিপিন্সের ভেন্ট্রিলোকুয়িস্ট বা পাপেটার হেরনান্দো আলামাদা-কে কেন্দ্র করে। তিনি একজন সুচিন্তক, সমাজ সংস্কারক হিসেবেই পরিচিত সে দেশে। ১৯৫৭, মার্চের ১৭ তারিখে, ৪৯ বয়সে প্লেন দুর্ঘটনায় মারা যান ফিলিপিন্সের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামোন ডেল ফিরো ম্যাগসাইসাই। হ্যাঁ, সেই ম্যাগসাইসাই যাঁর নামে Ramon Magsaysay Award। কথা সেটা নয়, এই ম্যাগসাইসাই মারা যাওয়ার পর ফিলিপিন্স তিক্ত, বিশৃঙ্খল সমাজতান্ত্রিক পরিকাঠামোর সম্মুখীন হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে হেরনান্দো তার গ্রামে ফিরে এসে দেখতে পায় সবকিছু বদলে গেছে, একদিন যে মানুষগুলো দারিদ্রতা সঙ্গে করেই হাসিমুখে দুবেলা খেতে পেত, আনন্দ পেত – সব পাল্টে গেছে। রাজনৈতিক হিংসা, অপরাধপ্রবণতা, গরীবীতে নিমজ্জিত এক অচেনা গ্রাম। এমনকী ফিরে এসে সে আবিষ্কার করে তার বহুবছরের সঙ্গিনী, তার প্রেমিকার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে গ্রামের এক মাতব্বরের সঙ্গে, শুধুমাত্র পারিবারিক অনটন কাটাতে তার প্রেমিকাকে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে তার বাবা। মাথা ঠিক রাখতে পারে না হেরনান্দো, কিন্তু হিংসার বদলে সে শেষ পর্যন্ত প্রেমিকার কথা ভেবে গ্রাম ছেড়ে এক উদ্দেশ্যহীন যাত্রা শুরু করে। সঙ্গে নেয় তার পরম বন্ধু, অভিন্ন আত্মা ‘হা’-কে। হা হেরনান্দো’র পাপেট। দুঃখে জর্জরিত হেরনান্দো, নিজেকে দেখতে চায় না আর, কথা বলা বন্ধ করে দেয়। তার হয়ে কথা বলে হা। হেরনান্দো পুরোপুরি হা হয়ে উঠতে চায়। উদ্দেশ্যহীন পথে তার সঙ্গে দেখা হয় এক বৃদ্ধা সন্ন্যাসিনীর, এক বেশ্যা এবং একটি কিশোরের। তারা প্রত্যেকেই বেঁচে থাকা নামক এক স্বপ্নের সন্ধানে চলে। বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে হেরনান্দোর সেই সন্ধান বিদ্রোহ এবং নবজাগরণ পর্যন্ত জারি থাকে।
অন্যদিকে, এ দেশের জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপটে মহাশ্বেতাদেবী যে জনি-কে নির্মাণ করে গেছেন সেও এক ভেন্ট্রিলোকুয়িস্ট। সে ভালোবাসে তার পাপেট, তার ‘জান’ উর্বশীকে। বেজন্মা জনির এলোমেলো, অস্থায়ী জীবনের সঙ্গে পাল্লা দিতে তার কোনো অসুবিধা হয় না। জনি যা ভাবে সেও তাই। এর থেকে ভালো জীবনসঙ্গী সে আর কোথায় পেত, যার জীবনটাই একটা মাদারির খেলা! জনির ক্যানসার মানে উর্বশীরও ক্যানসার। তারা দুজনে একসঙ্গে মরে যাবে। ডাক্তারখানা থেকে সে বেরিয়ে আসে যেন সার্কাসের পোস্টার থেকে বেরিয়ে আসা জোকার। ছোটোবেলার বন্ধু রামান্যাকে হুকুম করে তারা মরে গেলে সারা এলাকা যেন ফুলের গালিচায় মুড়ে ফেলা হয়, ফুর্তি করবে সকলে। সে চিৎকার করে “এ খেলা ভালোবাসার খেলা। কলকাতা ভালোবাসতে ভুলে গেছে। একদিন জনিকেও ভুলে যাবে।”
নাটকের পরতে পরতে ফেলে আসা দিনের গান – বেদনা মিশ্রিত ভালোবাসার এক ধূসর ছবি। যে ভালোবাসা থেকে জনি কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারে না। আশা-আকাঙ্খাহীন ভালোবাসা, একমুখী কাল্পনিক ভালোবাসা। সে বিশ্বাস করতে পারে না কোনও মানবীকে মন দিতে পারে, তাই সে প্রত্যাখ্যান করে তার প্রতি মন উজাড় করে দেওয়া একাধিক নারীকে।

আমরা যারা রোজ রোজ হাজার দুঃখ কষ্টের মধ্যে সুখ, আনন্দ খোঁজার চেষ্টা করি, সেই চেষ্টার মধ্যে অর্থনৈতিক শ্রেণীবিভাগের যে অবস্থান, তা আমাদের মাঝে বিভাজনের কাঁটাতার তুলে দেয়। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে সকল স্তরের মানুষের সুখের জন্য তাদের নিজস্ব মাধ্যম থাকে। প্রত্যেকের সুখের খোঁজ, তার মূল্য একরকম নয়। এক শ্রেণী স্বপ্ন দেখেই শুধু নয়, তা কেনার ক্ষমতা রাখে। অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এখনও সামাজিক ক্ষমতার হস্তান্তর হয়। আর এক শ্রেণী, যাদের সংস্পর্শে পুঁজিবাদের পচা দুর্গন্ধ নেই। মাদারির খেলা দেখিয়ে বা দেখে দুঃখ খানিকক্ষণের জন্য ভুলে থাকে যারা। তবে, একজন শিল্পীই পারে এই শ্রেণী বিন্যাস মুছিয়ে দিতে। নিজেকে প্রতিনিয়ত ক্ষয় করতে করতে সামাজিক বাঁধন যে ধরে রাখে, প্রতিনিয়ত যে সমাজের সামনে আয়না নামক এক বোধ তুলে ধরে, সেই যথার্থ শিল্পী। তা সে গায়ক হন, আঁকিয়ে হন, খেলোয়াড় হন, নাট্যকর্মী হন বা লেখক হন। জনিও সেই শিল্পীদের একজন, যার বৃহৎক্ষেত্রে সমাজের প্রতি একটি দায়বদ্ধতা রয়েছে কিন্তু জীবন নেই। সমাজে যারা বাতিল, জনি তাদের দলে। একজন প্রকৃত পারফরমারের মতো তার মৃত্যু হয় পারফরমেন্সের মধ্যে দিয়েই।
এই নাটক দর্শক-মনে প্রশ্ন তৈরি করে, কে ঠিক করে দেবে জরুরি অবস্থা? কে ঠিক করে দেবে ভালোবাসার সমীকরণ?
সুপ্রতিম রায়ের অন্যতম সেরা মঞ্চ উপস্থাপনা এটি, এ কথা বলাই যায়। নাট্যরূপ, সংগীত পরিকল্পনা, জনি রূপে অভিনয় ও নির্দেশনা সুপ্রতিম অভিজ্ঞ হাতেই সামলেছেন। নাটকটা দেখার সময় জনি ছাড়া তাঁকে অন্য কিছু ভাবার উপায় ছিল না। ভালো লাগে সুপ্রতিমের নির্দেশনায় অভিনেতাদের মাঝেমধ্যে চরিত্র থেকে বেরিয়ে সমবেত ভাবে মঞ্চে ঢুকে পড়া। লাল রঙা ব্যান্ডপার্টির পোশাক চড়িয়ে কখনও কথক হিসেবে, কখনও একসঙ্গে গান গেয়ে ওঠা। শুভ্রাংশু, দেবশ্রী, রাহুল, সমর, শুভজিৎ, শ্রবণা, রাতুল, সৌম্য –কেউ দক্ষ, কেউ এখনও অপটু হলেও অভিনেতারা সকলেই সমবেত ভাবে চেষ্টা করেছেন। দৃশ্যায়ণে কস্তুরী চট্টপাধ্যায় ও সৌমেন চক্রবর্ত্তীর আলো তারিফ যোগ্য। মঞ্চ ভাবনাও যথাযথ। নেপথ্য কণ্ঠে মধুমিতা, উর্বশীর কণ্ঠে সুতানুকা মানানসই।

ভালো লাগলো, নাটকের শেষে দুচার কথার মধ্যে পরিচালক এও ইচ্ছাপ্রকাশ করলেন যে, এই নাটক তিনি প্রসেনিয়ামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে ইচ্ছুক নন বরং তিনি চান, রাস্তা-মাঠে-ময়দানের মুক্তমঞ্চে উর্বশী বলে উঠুক ‘জনি আই লাভ ইউ’।
আসলে, কে এই জনি?
যখন সকলে ‘সেলেব’ হতে চায়, জনি চায় সুখের ফেরিওয়ালা হতে—

জনি এমন সব মলিন সুখস্মৃতি ফিরিয়ে আনে, যা বাস্তবে অচল। জনিরা কখনওই মর্জি মতো বেঁচে থাকার অধিকার পায় না, পিছিয়ে পড়া সময়ের মধ্যেই উড়তে থাকে তাদের ‘সুখ কি চিড়িয়া’। সেই চিড়িয়া গান গায়। তার গলায় জীবন ও মৃত্যুর মতো অনিবার্য হয়ে ওঠে ডি এল রায়, শচীন দেব বর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, শাকিল বাদাউনি, মজরুহ সুলতানপুরী, কিশোর কুমার, মহম্মদ রফি, গহওর জান, শাহির লুধিয়ানভি, কাইফি আজমি, মুকেশ, লতা মঙ্গেশকর, গীতা গত্ত, গুরু দত্ত – ফেলে আসা এক খণ্ড ভারতবর্ষ। যেখানে একতা ছিল, বিভেদহীন শিল্পের আরাধনা ছিল, প্রেম ছিল, সরলতা ছিল, হাজারটা ভুলের ভিতর রোমান্টিকতা ছিল। স্নায়ুভেদী অশান্তির ভিতর দুদণ্ড শান্তি দিতে পারতো জনিরা।
অস্বীকার করার জায়গা নেই, চ্যাটজিপিটির এই বাজারে ‘উর্বশী ও জনি’ বেমানান। আর এখানেই বোধহয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে গোত্রহীন-এর এই উদ্যোগ। সব জেনেশুনেই ‘রিস্ক’ নিয়েছে এই নাট্যদল।

জনি ‘সেলিব্রিটি’ নয়, তুষার রায়ের ‘ব্যান্ডমাস্টার’—
“আমি অঙ্ক কষতে পারি , ম্যাজিক/ লুকিয়ে চক ও ডাস্টার/ কেননা ভারী ধুন্ধুমার ট্রাম্পেটবাদক ব্যান্ডমাস্টার,/ তখন/ প্রোগ্রাম হয়নি শুরু – সারাহ্ টেম্পল নাম্নী ক্যাবারিনা/ তখন এমনি বসে ডায়াসের কোণে,/ আমি ড্রামে কাঠি/ দেওয়ামাত্র ওর শরীর ওঠে দুলে,/ ড্রিরি-ড্রাঁও স্ট্রোকেতে দেখি বন্যা জাগে চুলে,/ তিন নম্বর স্ট্রোকের সঙ্গে নিতম্বেতে ঢেউ/ চার নম্বর স্ট্রোকেতে ঝঞ্ঝা ওঠে গাউনের ফ্রীলে/ নম্বর পাঁচে শরীর আলগা, বুকের বাঁধন ঢিলে,/ আমি তখন ড্রাম বাজিয়ে নাচাই ওকে/ মারি এবং বাঁচাই ওকে,/ ড্রামের কাঠির স্ট্রোকে স্ট্রোকে/ যেন গলাই, এবং ঢালাই করি/ শক্ত ধাতু নরম করার কাস্টার,/ কেননা, ভারী ধুন্ধুমার ট্রাম্পেটবাদক ব্যান্ডমাস্টার।/ আবার বাজাই যখন স্যাক্সো-চেলো/ ক্যাবারিনার এলোমেলো/ ডিভাইস্-এ দ্বন্দ্ব এলো।/ আমার বাঁশির সুরের সুতোয়/ দেহের ফুলে মালা/ ট্রা রালা লি রালা লা/ ঠিক চাবি হাতে দেখি খুলে যায় তালা”
উর্বশী ও জনিরা অখণ্ড পৃথিবীর ভালোবাসা – যাদের জন্মের ঠিক নেই, মৃত্যু যাদের পায়ে পায়ে ঘোরে।
এই নাটকের চরিত্ররা জাঁ পল সার্ত্র’র Nausea গ্রন্থের সেই হতভাগ্য ‘হিউম্যানিস্ট’রা, যাঁদের প্রয়োজন আজকে ফুরিয়ে গেছে, যাঁরা চিরদিনের মতো নির্জনতার রাজ্যে প্রবেশ করেছে—হঠাৎই আজ তাঁদের সামনে সব ভেঙে পড়েছে। ভেঙে পড়েছে সংস্কৃতির স্বপ্ন, মানুষের সঙ্গে মানুষের পরিচয় ও প্রীতির সব স্বপ্ন।
“That poor humanist whom men don’t want any more…now he has entered into solitude—forever. Everything has collapsed at once, his dreams of culture, his dreams of an understanding with mankind.” Jean-Paul Sartre.