
স্রষ্টা মহাশ্বেতা জীবন ভ্রষ্ট নন, তাই সধর্ম পালনে তিনি বিচ্যুত হননি কখনওই
‘আমি/আমার লেখা’তে বড়ো অকপট উচ্চারণ সাহিত্যিক মহাশ্বেতাদেবীর। তিনি বলছেন, “সাহিত্যের দাবি জীবনের দাবির সঙ্গে যেন এক হয়ে গেল, এক হয়েই আছে আজও। মানুষ হিসেবে যদি আমি সততা, প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা, প্রতিবাদে বিশ্বাসী হই, সাহিত্যে কী করে আমি অন্য কথা বলি।” জীবনই সাহিত্য – এই বিশ্বাসে প্রত্যয়ী মহাশ্বেতা জীবন ও সাহিত্য দুই জায়গাতেই তাই সর্বক্ষণ ‘এক’ কথা বললেন। বলা ভালো জীবন তার প্রতি পদক্ষেপে যে যে অভিঘাতের মধ্যে দিয়ে তাঁকে নিয়ে গেছে, সেই কথাই বলেছেন মহাশ্বেতা তাঁর লেখায়। সময়ের দলিলীকরণে দক্ষ ঔপন্যাসিক মহাশ্বেতার লেখা যেন জীবনের ইতিহাস ও ইতিহাসের জীবনকে যুগপৎ মন্থন করে চলে।
বাংলা সাহিত্যে দলিত মানুষের রূপকার, কথাসাহিত্যিক ও সমাজকর্মী মহাশ্বেতাদেবীর পারিবারিক পরিমণ্ডল এবং বিপুল পড়াশোনার অভ্যাস তাঁকে লেখার জগতে এনেছিল একথা অবশ্য স্বীকার্য। আবার এ-ও সত্য যে প্রচলিত পথের পাথরগুলি কুড়িয়ে নিয়ে লিখতে লিখতে বুঝে নিয়েছিলেন, তিনি কী লিখবেন বা কেন লিখবেন। প্রবাদপ্রতিম চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের ভাইজি এবং সাহিত্যিক দম্পতি মণীশ ঘটক ও ধরিত্রী দেবীর মেয়ে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী, মহাশ্বেতা ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, অধ্যাপক। একসময় অবধারিতভাবে তিনি এগিয়ে গেলেন অপ্রাতিষ্ঠানিক লেখার দিকে, প্রান্তিক মেধা ও মনন আবিষ্কারের দিকে, বিকল্প বয়ান ও বিকল্প নান্দনিক প্রস্তাবনার অন্বেষণে। অথচ, তাঁর শুরুটা এইরকম এত স্পষ্ট জীবনবাদী ছিল না হয়তো।
মহাশ্বেতার প্রথম উপন্যাস ‘ঝাঁসির রাণী’। নিজের সাহিত্যজীবন শুরুর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইতিহাসের চরিত্র রানি লক্ষ্মীবাঈ-এর জীবন, তাঁর সুমহান আত্মত্যাগ জানবেন বলেই বইয়ে পড়া তথ্যের পাশাপাশি তিনি প্রত্যক্ষ জীবন অন্বেষণ শুরু করেছিলেন রানীর দেশ ঝাঁসি-গোয়ালিয়র থেকেই। জীবনের কথা বলার শুরু সেই তখন থেকেই। কিন্তু যত সময় গেছে মহাশ্বেতার লেখায়, তত বেশি করে ইতিহাসের জীবনের পাশাপাশি আপাত ঘটনার বিশ্লেষণ ও সময়ের নির্মম সত্য কে তুলে ধরার আন্তরিক, নিরপেক্ষ প্রয়াস লক্ষ্য করেছেন পাঠক। তাই, সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলনের ভয়াবহ যন্ত্রণার গাঁথা তিনি লেখেন ‘হাজার চুরাশির মা’ কিংবা ‘অগ্নিগর্ভ’-তে। সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রশক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে ভেসে যায় ব্রতী কিংবা সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় পাগল হতে বসা সুজাতারা। ‘সাহিত্য জগতে মাইলস্টোন হিসাবে চিহ্নিত মহাশ্বেতার ‘অরণ্যের অধিকার’, ‘তিতুমীর’, ‘রুদালি’ সেই সময়ের কথাই বলে, সর্বার্থেই মানুষের বাস্তবিক জীবনকে ছুঁয়ে লেখা হয় এই আখ্যান। মহাশ্বেতা বিশ্বাস করতেন, রক্তাক্ত সময়ের কারণ আসলে নিহিত চাষী ক্ষেতমজুর, বর্গাদার আদিবাসী জঙ্গলজীবী, বর্ণধর্ম নির্বিশেষে মানুষকে নির্লজ্জ শোষণের মধ্যে, তাই শুধু তাঁদের কথা লিখলেনই না মহাশ্বেতা, নিজের জীবন-মৃত্যু উপেক্ষা করে যেকোনো মুহূর্তে তাদের পাশে থাকায় অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন প্রান্তিক মানুষের ভালোবাসার ‘মারাং দাই’ অর্থাৎ মা মহাশ্বেতা। তাঁর কলম হয়েই নিম্নবর্গীয় মানুষের যন্ত্রণা পৌঁছেছিল শহরবাসীর কাছে। তাঁদের হয়ে লড়াই করেছেন, তাঁদেরকে লড়াই করতে শিখিয়েছেন মহাশ্বেতা। উপযুক্ত ডকুমেন্টেশন স্বরূপ তাঁদের লড়াইয়ের গল্প পাঠক শুনতে বাধ্য হয়েছে ‘আঁধারমানিক’, ‘চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তির’ কিংবা ‘কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু’র মতো লেখায়।
প্রতিবাদের ভাষ্য লেখক মহাশ্বেতা শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় রবীন্দ্রনাথকে দেখেছিলেন। মানুষের ধর্মে আস্থাবান রবীন্দ্রনাথের আদর্শ নিশ্চয় সারাজীবন তাঁর পাথেয় ছিল। তাই হয়তো, মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াই-ই মহাশ্বেতাকে রাষ্ট্রশক্তির চোখরাঙানি অথবা স্তাবকতার কাছে মাথা নোয়াতে দেয়নি। রাজনৈতিক সচেতনতা কখনও হারাননি তিনি, নানা রঙের দলাদলি থেকে আপসহীন ও নির্ভীক দূরত্ব বজায় রেখেছেন চিরকাল। বেস্টসেলার হওয়ার জন্য নয়, জীবনের ‘বেস্ট টেলার’ হওয়ার জন্যই যেন মহাশ্বেতারা কখনও সখনও আসেন পৃথিবীতে। আর বলেন আত্মতুষ্টির সময় নয় এটা। বলেন, “দায়িত্ব পালন না করলে চলমান সংগ্রামের মানুষগুলি এইসব লেখককেও ক্ষমা করবেন না। যাদের কাছে আশা করার কিছু নেই, তাদের দোষারোপ করে চলা নিজেকে অপচয় করা মাত্র। এ একটি মধ্যবিত্ত অভ্যাস। এতে নিজের ভূমিকা পালন না করার দোষ ক্ষালন হয় না।” স্রষ্টা মহাশ্বেতা জীবন ভ্রষ্ট নন, তাই সধর্ম পালনে তিনি বিচ্যুত হননি কখনওই। দেশের মানুষ ও সময়ের কাছে নিজের দায়িত্ব পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মহাশ্বেতা দেবীর আজ ৯৫তম জন্মদিন।
তথ্য ঋণঃ
আমি/আমার লেখা – মহাশ্বেতা দেবী
উপন্যাসের ভিন্নপাঠ – তপোধীর ভট্টাচার্য

