নাট্যনির্মাণ একটি জৈবিক প্রক্রিয়া : সাক্ষাৎকারে বলছেন অর্ণ মুখোপাধ্যায়

সমসাময়িক বাংলা থিয়েটার এবং চলচ্চিত্র জগতের এক অত্যন্ত প্রতিভাবান ও জনপ্রিয় অভিনেতা, নাট্যনির্দেশক ও চিত্রনাট্যকার অর্ণ মুখোপাধ্যায় (Arna Mukhopadhyay)। মঞ্চনাটকে অসাধারণ অভিনয় ও নির্দেশনার পর বর্তমানে তিনি বাংলা চলচ্চিত্র ও ওটিটিতেও নিজের এক দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছেন। বঙ্গদর্শন.কম-এর মুখোমুখি হয়ে অর্ণ এই সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সময়কে প্রশ্ন করা এবং নিজেকে শিল্পে রূপান্তর করাই নাট্যনির্মাণের মূল রসায়ন। জানিয়েছেন নাট্যভাবনা, সময়ের টানাপোড়েন, নতুনদের লড়াই ও থিয়েটারে বেঁচে থাকার গল্প।

_______________

প্রশ্ন: নাট্যনির্মাণের সময়ে সবথেকে বেশি কোন বিষয়টি আপনার গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়?

অর্ণ: এভাবে আলাদা করে বলা খুব মুশকিল। আমি বিশ্বাস করি নাট্যনির্মাণ একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। সময় কী চিহ্ন পাঠাচ্ছে নির্মাতাকে, সমাজ কী সংলাপ তৈরি করছে নির্মাতার ভিতরে এবং নির্মাতা কীভাবে কী কথা বলতে চাইছেন, সেটা তো সময়ই নির্ধারণ করে এবং সেটা খুব জৈবিক পদ্ধতিতে হয়। নাট্যনির্মাণে আমার কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ক্রাফট, আবেগ ও ভিতরে ঘটে চলা কোনো তীব্র রসায়ন। সময়কে এনকাউন্টার করতে চাওয়ার উদগ্র একটা বাসনা থেকে যখন কোনো নির্মিতি তৈরি হয়, কোনো আর্ট পিস তৈরি হয়, তখন তো সেটা সময়েরই দলিল। কোন সময়ে দাঁড়িয়ে কী কাজ করছি, সেটা যেহেতু নির্মাতার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেই কারণে আমার মনে হয় সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের সময়টায় নিজের মত করে বাঁচা; সময়টাকে চেনা ও প্রশ্ন করা। বেশিরভাগ সময়ই I don’t enjoy my time. যে সময়ে আমি বাঁচছি, সেই সময়টা আমার কাছে খুব উপভোগ্য নয়, আবার সেই সময়ই আমাকে একটি সন্তান উপহার দিয়েছে, আমাকে একটা অপূর্ব পরিবার দিয়েছে, এই সময়ই আমাকে একটা অসম্ভব দৃঢ় থিয়েটার সংঘ দিয়েছে, এই সময়ই আমাকে কিঞ্চিৎ যশ এবং অর্থ দিয়েছে। ফলে এই যে জুগপথ টানাপোড়েন, এই যে জীবনের গ্রে ম্যাটার, সেইটাকে শিল্পে রূপান্তরিত করা। সময়, জীবন এবং নিজেকে শিল্পে রূপান্তর করাটাই আমার কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: অভিনেতা অর্ণ এবং নির্দেশক অর্ণর মধ্যে কি কোনো দ্বন্দ্ব আছে? না কি একে অপরের পরিপূরক?

অর্ণ: ভয়ঙ্কর দ্বন্দ্ব আছে। যখন কৈশোর পেরিয়ে আমি যৌবনে পড়েছি তখনই নির্দেশনা শুরু করেছি, তখন থেকেই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। অভিনেতা অর্ণ সবসময় নির্দেশক অর্ণকে শাসন করতে চেয়েছে, আবার যখন নিজের প্রযোজনা বা পরিচালনায় অভিনয় করেছি তখন অভিনেতা সত্তা বলেছে যে পরিচালক অর্ণ এইখানে যেটা চাইছেন, সেইটাকে আমি প্রশ্ন করতে পারি। যখন পরিচালক অর্ণ ভেবেছিলেন যে এই চরিত্রটি এইভাবে কথা বলবে, অভিনেতা অর্ণ যখন কাজ করতে শুরু করলেন কেউ একজন আন্ডারস্টাডি দিলো তার চরিত্র এবং তারপরে সে যখন দাঁড়ালো, তখন তার ইন্টারপ্রিটেশনটা একটু অন্যদিকে চলে গেলো, তখন পরিচালক অর্ণকে ভাবতে হলো। আবার অভিনেতা আর পরিচালককে মুখোমুখি হতে হলো। যখন অভিনেতা অর্ণ অন্য কারোর পরিচালনায় কাজ করে, তখন সম্পূর্ণ সুইচ অফ মোড-এ যেতে পারে না। যেটা অনেক পেশাদার অভিনেতাকে করতে দেখেছি, সেটা আমার পক্ষে খুব সমস্যার হয়ে দাঁড়ায়। সবটা নিয়ে মাথার মধ্যে ভাবনা কাজ করতে শুরু করে, শুধু নিজের অভিনয়টা নিয়ে নয়। এটা আমার নিজের প্রতি সবচেয়ে বড়ো দ্বন্দ্ব এবং বিরক্তি। তবে আমি পেশাদারিত্বের সীমা কখনও লঙ্ঘন করি না। যেহেতু অভিনয় আমার প্রথম প্রেম তাই যতদিন কণ্ঠ, শরীর এবং মন সজাগ সচল থাকবে, ততদিন অভিনয় করে যেতে হবে। এছাড়া উপায় নেই। কিন্তু, চল্লিশ অতিক্রম করে কখনও কখনও মনে হচ্ছে যে, পরিচালনার থেকে মহৎ কাজ বোধহয় কিছুই নেই। সেটাও একরকম দ্বন্দ্ব।

ভিট্টন নাটকে অর্ণ

প্রশ্ন: অভিনেতা হিসাবে দেবেশ চট্টোপাধ্যায়, অর্পিতা ঘোষ, ব্রাত্য বসু, সুমন মুখোপাধ্যায়, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় প্রমুখ অনেক পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন, সেই অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

অর্ণ: অভিনেতা হিসেবে আমি সবার প্রথমে যাঁর পরিচালনায় কাজ করেছি, তিনি আমার মা সাধনা মুখোপাধ্যায় এবং আমার গুরু শিব মুখোপাধ্যায়। এই দুজনের নাম আমি সবার আগে উল্লেখ করতে চাই। বিশেষ করে শিব মুখোপাধ্যায়ের কথা বলবো কারণ, আমার যাবতীয় সঞ্চয়, যাবতীয় নির্মাণের ভিত্তি, যাবতীয় চর্চার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেওয়া, সবটাই শিব মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে। ফলে, যাঁদের নাম তুমি করলে, তাঁদের আগে আমি এঁকেই রাখবো। দেবেশ চট্টোপাধ্যায় আমার কাছে শিক্ষকের মতো। যখন আমি তাঁর নাটক দেখতাম, তখন সিনোগ্রাফি শব্দটা জানতাম না। অনেক পরে জেনেছি, খুব সম্ভবত দেবেশদার থেকেই। তাঁর নির্মাণ শৈলী দেখে মুগ্ধ হতাম, অনুপ্রাণিত হতাম। যখন কাজ করতে এলাম তখন মনে হলো, এই যে একটা যৌথ আর্ট ফর্ম, একটা কমিউনিটি, যেখানে একসঙ্গে অনেক কিছু ঘটছে, অভিনেতা, পরিচালক, লাইট ডিজাইন করছেন যিনি, মিউজিক বানাচ্ছেন যিনি… সবার মধ্যে একটা সাম্যাবস্থা তৈরি হওয়ার চেষ্টা, একটা থার্ড ফোর্স তৈরি করছে, এই আদানপ্রদানটা আমি দেবেশদার সঙ্গে কাজ করে সবথেকে বেশি বুঝতে পারি। এখনও পর্যন্ত তিনটে কাজ করেছি কিন্তু এখন এমনও হয় যে, আমি বুঝতে পেরে যাই দেবেশদা কী বলবেন এবং উল্টোটাও। দেবেশদার প্রসেসটা নিয়ে বলতে গেলে তো অনেকটা বলতে হয়, আমার মনে হয় যে ঠিক জায়গায় পৌঁছানোর প্রসেসটায় যখন আমি স্ট্রাগল করছি, দেবেশদা তখনই একটা আলো, মঞ্চ উপকরণ বা ছোট্ট দুটো কথা দিয়ে আমাকে ওই জার্নিটার মধ্যে সহজ করে দেয়। এই যে অনির্বচনীয় দেওয়া-নেওয়া, যেটা সবসময় ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, সেটা দেবেশদার সঙ্গে আমার কিঞ্চিৎ এগিয়ে গেছে। আগামীতেও নিশ্চিত দেবেশদার সঙ্গে কাজ করবো, ওঁর সঙ্গে কাজ করাটা আমার যুগপৎ আরামের, অস্বস্তির এবং চ্যালেঞ্জের। আমি ব্যক্তি সম্পর্কে বিশ্বাস করি, আমি মনে করি যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি না হলে পরিচালক এবং অভিনেতা, বিশেষ করে থিয়েটার-স্পেসে যে তৃতীয় শক্তির অপেক্ষা করি আমরা, ম্যাজিকাল কিছু একটা… সেইটা হয় না।

অর্পিতাদির সঙ্গে তো আগে কাজ করেছি, দেবেশদার সঙ্গে কাজ করার আগেই এবং দেবেশদা ওই প্রোজেক্টে সিনোগ্রাফির কাজ করেছিল। অর্পিতাদির সঙ্গে কাজ করে আমার একটা আশ্চর্য আরাম হয়। অর্পিতাদি ময়দান এবং ক্ষেত্র কোনোটাই ছেড়ে দেয় না। পরিচালক অর্পিতা ঘোষ প্রতিদিনই বিশেষ করে ‘রাজনৈতিক হত্যা’র সময় প্রত্যেকটা রিহার্সালে অভিনয় নিয়ে একটা ইনপুট দিতেন, যেটা নিয়ে আমি খুবই আনন্দ পাই। আমি তো জানি, যখন পরিচালনার কাজ করি তখন আমরা আর অভিনেতাদের দেখি না, নিজের সম্পূর্ণ নির্মাণটার মধ্যে যে ফর্ম, শেপ এবং গন্ধ বেরিয়ে আসছে সেইটায় কখনও বিমহিত হই, কখনও বিরক্ত হই। মানে, যে মাধ্যম, তাকে আমরা ভুলেও যাই এসবের মাঝে, কিন্তু অর্পিতাদির অভিনেতার প্রতি যত্নটা এমন যে উনি প্রত্যেকটা রিহার্সালে সমান যত্ন, সমান মনোযোগ দিয়ে দেখেন। ছোটো ছোটো চেঞ্জ করলেও নজর দেন এবং প্রতিদিনই খেয়াল রাখেন। অভিনেতা হিসেবে এটা আমার কাছে সত্যিই আনন্দের।

আমার থিয়েটার জীবনের গোড়ার দিকে সবথেকে বেশি প্রভাব যদি কোনো মানুষের থেকে থাকে, তিনি ব্রাত্য বসু। সেটা শুধু পরিচালক ব্রাত্য বসু নয়, লেখক, বক্তা, আড্ডাবাজ, ফুটবলপ্রেমী, প্রাবন্ধিক এবং অধ্যাপক। আমি ব্রাত্য বসুর সঙ্গে দুটি নাটকে অভিনয় করেছি। একটি আমার দলের বা সঙ্ঘের বাইরে প্রথম কাজ ‘হেমলাট: দি প্রিন্স অফ গরানহাটা’। সেটা একটা দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা। তখন আমার বিএ দ্বিতীয় বর্ষ। তারপরে ‘একুশ গ্রাম’, মাঝখানে আর কাজ করা হয়নি। যখন ‘একুশ গ্রাম’ করছি তখন মন্ত্রিত্বের যে ‘বাবল’, তার মধ্যে ব্রাত্যদা ঢুকে গেছেন কিন্তু তা সত্বেও কাজের প্রতি তাঁর যে প্যাশন এবং থিয়েটারের প্রতি যে কমিটমেন্ট, আমাকে খুবই মুগ্ধ করেছিল। ব্রাত্যদা আগামী দিনে থিয়েটার করবেন কি না জানি না, ওঁর সঙ্গে আমার শেষ কথোপকথন অনুযায়ী ‘করবেন না’ এরকমই বলেছেন, সেটা আমাদের পক্ষে বড়ো ক্ষতি। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ব্রাত্য বসুর থেকে পরিচালক ব্রাত্য বসু এবং থিয়েটারের ব্রাত্য বসু আমার কাছে অনেক বেশি দৃঢ় মানুষ এবং সেই ব্রাত্য বসুর সঙ্গে কাজ করাটা আমি চিরকাল মনে রাখবো।

আবহমান নাটকে অর্ণ

সুমন মুখোপাধ্যায়ের কাজ আমি দূর থেকে বেশি দেখেছি ছাত্র-দর্শক হিসেবে। ‘মেফিস্টো’তে অভিনয় করেছি কিন্তু সেইটাতে পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়কে যথাযথভাবে আমার পাওয়া হয়নি, সেটা আমার একটা আফশোস। একটা পুরনো প্রযোজনার ছাঁচে ঢুকে গেলে পরিচালককে খুব আপন করে পাওয়া যায় না, ফলে পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায় এবং অভিনেতা অর্ণ মুখোপাধ্যায়ের সম্পর্ক সেভাবে গড়ে ওঠেনি।

কমলদার সঙ্গে এটা আমার প্রথম কাজ (সিজার), সব দিক দিয়েই। ওঁর নাটক লেখার যে প্রক্রিয়া, ফার্স্ট রিডিং’এর পর আমার মনে হয়েছিল এবং আশ্চর্য লেগেছিল যে ব্যাকরণগতভাবে নিয়ম মেনে এইভাবে নাটক লেখা এবং এত পড়াশোনা, একটা নাটক লেখার পেছনে এতটাই ইতিহাস চর্চা, এতটা সিরিয়াসনেসের জায়গা থেকে থিয়েটারকে দেখা, বিরল। বাকিদের সঙ্গে কাজ করে যা অভিজ্ঞতা হয়েছে, কমলদার প্রসেসটা একেবারেই অন্য। বিভিন্ন অভিনেতার সঙ্গে কমলদার কমিউনিকেশনের ধরন বিভিন্ন রকম। ‘সিজার’-এর গোটা রিহার্সাল এবং যেহেতু ব্রুটাস আমার অন্যতম পার্শ্বচরিত্র ফলে অনেকগুলো সিনেমা বসে দেখার সুযোগ হয়েছে বহুদিন পর কোনো নাটকে, তো সেইটা দেখতে দেখতে আমি খুবই নজর করছিলাম যে বিভিন্ন অভিনেতার সঙ্গে বিভিন্নভাবে কমিউনিকেট করছেন এবং সেটার মধ্যে একটা ম্যান ম্যানেজমেন্ট স্কিল আছে এবং তার সঙ্গে প্রতিটা অভিনয়ের সংলাপের মুহূর্তের পিছনের যে ইতিহাস, সেইটা বলে বলে যাওয়া, অভিনেতাদের শিক্ষিত হতে বাধ্য করা, সেটা আমার চমৎকার লেগেছে। আমার সেই মানুষগুলোর সঙ্গে কাজ করতে ভালো লাগে, যাদের সঙ্গে কাজ করলে সব দিক দিয়ে একটা কনস্ট্যান্ট গ্রোথের মধ্যে নিজেকে ফেলা যায়। সেইরকম একজন নির্দেশক হচ্ছেন কমলদা।

প্রশ্ন: আপনাদের দল ‘নটধা’ কলকাতাতে তো বটেই, হাওড়ায় রামগোপাল মঞ্চকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময়ে একটি নাট্যচর্চার ঐতিহ্য নির্মাণ করেছে, এই বিষয়ে কিছু যদি বলেন…

অর্ণ: নটধার লক্ষ্য ছিল ভালো করে ভালো থিয়েটার করবো এবং সেটা শিব মুখোপাধ্যায় চিরকালই মনে করে এসেছেন। অঞ্চলে অঞ্চলে থিয়েটার না বাঁচলে থিয়েটারের সামগ্রিক মান উন্নয়ন এবং সামগ্রিক প্রসার-প্রচার হয় না। ফলে অঞ্চলে থিয়েটার চর্চাটা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যে যেই মাটির, যে যেই অঞ্চলের তাকে সেখানে থিয়েটারের শিকড়কে আরও গভীরে নিয়ে যেতে হয়। রামগোপাল মঞ্চের ঐতিহ্য কিভাবে বলবো আমি জানি না, তবে একটা দীর্ঘ ইতিহাস তো আছেই। প্রায় ৫২ বছরের একটা ইতিহাস। মূলত হাওড়া রামগোপাল মঞ্চকে কেন্দ্র করেই নটধার থিয়েটারের বাইরেও নাট্যপত্রিকা তৈরি করা, স্কুলে স্কুলে কাজ করা, আন্ডারপ্রিভিলেজডদের মধ্যে গিয়ে থিয়েটারকে শিক্ষার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা। এছাড়াও শিশু উৎসব করা ‘সৃষ্টি উৎসব’ নাম দিয়ে, জনপ্রিয় নাটকের মেলা করা, জেলা নাটকের মেলা করা, ব্রেখটকে নিয়ে থিয়েটার উৎসব করা। ফলে যদি কখনও হাওড়ার সংস্কৃতির ইতিহাস লেখা হয়, তাহলে নটধার অধ্যায়কে বাদ দেওয়া সম্ভব হবে না বলেই আমার মনে হয়। সেক্ষেত্রে ঐতিহ্য বলা যেতে পারে এবং সেইটা নিয়ে আমাদের কিঞ্চিৎ কেন, যথেষ্ট পরিমানেই শ্লাঘা আছে।

প্রশ্ন: ভারতবর্ষের থিয়েটারচর্চার নিরিখে বাংলা ভাষায় গড়ে ওঠা থিয়েটারকে কীভাবে দেখবেন? বাংলা থিয়েটারে কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে, থাকলে কতটা?

অর্ণ: এটা আমি বলার কেউ নই। ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করছে যে ভারতে থিয়েটারচর্চার মানচিত্রে বাংলা বা পশ্চিমবঙ্গ কতটা ভূমিকা রেখেছে এবং আজও আমার মনে হয়, সারা ভারতবর্ষে নিশ্চিত থিয়েটার এগিয়েছে, কিন্তু এখনও আমার মনে হয় বাংলাকে একটা বিশেষ স্থান দেওয়া হয়। সেটা কাজের কারণেই দেওয়া হয়, অন্য কোনো কারণে তো নয়! বাংলায় শম্ভু মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, শিশির ভাদুরি, গিরিশ ঘোষ এবং তার আগের মানুষদের আমি নাম করছি না, লম্বা তালিকা হয়ে যাবে। সেইসময় যে থিয়েটারের ইতিহাস আমরা দেখতে পাই সেখান থেকে উৎপল, অজিতেশ, রুদ্রপ্রসাদ, অশোক, বিভাস, অরুণ হয়ে আজকে সুমন, ব্রাত্য, দেবেশ, কৌশিক হয়ে যাঁরা কাজ করছেন, এই যে বিবর্তনের ইতিহাস এবং সে ইতিহাস আজ দেবাশিস পর্যন্ত বা তার পরে আমাদের জেনারেশনের কথাও বলতে পারি… সময়ের দাবীতে বাংলা থিয়েটার যে অবস্থানে আছে তাতে গুণগত জায়গায় এবং সংখ্যাতত্ত্বের বিচারেও সামগ্রিক চিত্রটা দেখি, তাহলে আমার মনে হয় যে বাংলা থিয়েটার এখনও তার জায়গায় আছে। কিন্তু এ সত্ত্বেও যে কথাগুলো বলা উচিৎ বলে আমার মনে হয়, ইতিহাসের ফাঁকফোকরে আরও অনেকগুলো কথা বাকি থেকে যায়। যদি আমি খুব সংক্ষেপেই বলি, থিয়েটারের সংগঠন, থিয়েটার নির্মাণের পিছনে তো একটা সংগঠিত শ্রম থাকে এবং ক্রিয়েটিভ প্রসেসটার বাইরেও আরও অনেক কিছু জিনিস জড়িয়ে থাকে, যেটা সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত বা সমাজের অন্তর্বর্তী বিষয়। সেইটা যদি আমি ভাবি তাহলে আমার মনে হয় যে, সেই জায়গাটা বিনির্মিত হতে হতে আজকে এই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে। আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার মতো ভাগাড়ের উপর দাঁড়িয়ে আছি… মানে, সব দিক থেকে, রাজনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে এবং শিল্পর গুণগত দিক থেকেও সবটা মিলিয়ে আমার মনে হয় যে, ইতিহাসের ফাঁক গোলে একটা খুব অন্ধকার সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। বিচ্ছিন্নভাবে ভালো থিয়েটার, খারাপ থিয়েটার দুটোই ঘটছে আমাদের এখানে। আমি ভবিষ্যৎ অর্থেই বলছি, যে বর্তমানের উপর দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে দাঁড়িয়ে একটা চমৎকার ভবিষ্যৎ আশা করা যায় না। সেটা শুধু থিয়েটার কেন, আমার মনে হচ্ছে শিল্পগতভাবে সৃষ্টির জায়গা থেকেই একটা দেউলিয়াপনা আমাদের জাতির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে বিগত কয়েক বছর ধরে। আমার মনে হয়, আমি নিজেকে যুক্ত করেই বলছি, আরও আরও অন্ধকারের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রকট হচ্ছে বলে আমার মনে হয়। তবে এটাও ঠিক, পাশাপাশি যখনই অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে তখনই তো বাউন্স ব্যাক করেছে শিল্প, শিল্পীরা। গুণগত জায়গা থেকে শিল্প নির্মিত হয়েছে, জোয়ার এসেছে। সেই আশায় বসে থাকাই যায়, তবুও আমি বলবো যে, এখন যে সময়ের মধ্যে আমরা দাঁড়িয়ে আছি তাতে আমার মনে হয় সমস্যা, পীড়া, যন্ত্রণা, বিশাদ, অবসাদ এমনভাবে জেঁকে বসেছে ব্যক্তি জীবনে, সমাজ জীবনে, কোনো উৎসব, কোনো ভোট রাজনীতি, কোনো চাপানো উন্মাদনা, কোনো ভুলে থাকা দিয়েই সেটাকে এনকাউণ্টার করা যাবে না। এনকাউণ্টার তো এগুলো দিয়ে করা যায়ও না, শিল্প দিয়েই করা যায়। আমার মনে হয় যে, সেটা ভুলে থাকা বা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। আর সেটা পার্ট অফ দ্যা জার্নি। এবার থিয়েটারকে এটার সঙ্গে লড়তে হবে। যারা সৎভাবে যত্ন নিয়ে থিয়েটারের প্রসেসটাকে লালন করে বেঁচে থাকতে চায়, তাদের লড়াইটা অনেক অনেক কঠিন।

অথৈ নাটকে অনির্বাণ ও অর্ণ

প্রশ্ন: সিনেমায় সুযোগ পেতে নয়, খ্যাতি এবং অর্থের বিপরীতে হেঁটে নতুন প্রজন্মের যারা থিয়েটার করতে আসছে, তাদের উদ্দেশ্যে কী বার্তা দেবেন?

অর্ণ: এটা তো পার্সপেক্টিভ। সিনেমা থিয়েটারের মধ্যে যে পারস্পরিক লড়াই বা বিবাদমূলক সম্পর্ক, এইটাতে আমি একেবারেই বিশ্বাস করি না। দুটো স্বতন্ত্র শিল্প মাধ্যম এবং সেক্ষেত্রে যাত্রাকেও জুড়ে দেওয়া যায়, অন্য আর্ট ফর্মকেও জুড়ে দেওয়া যায়। এটার মধ্যে একটা অবাধ যাতায়াত বা আদান-প্রদান যদি কোনো শিল্পী ব্যালেন্স করে করে ফেলতে পারেন, তাহলে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান হওয়া উচিৎ বলে আমার মনে হয়। সিনেমায় খ্যাতি, যশ এবং অর্থ যেহেতু তুলনায় অনেক বেশি, তাই দেড়শো বছরেরও কম ইতিহাস হওয়া সত্ত্বেও পাঁচ হাজার বছরের শিল্পকে সে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তখন কোথাও গিয়ে থিয়েটারের মানুষদের অভিমান হয়। এই কারণেই একটা বিবাদমূলক সম্পর্ক। কিন্তু হ্যাঁ, বহু মানুষ আছেন যাঁরা সিনেমা করতেই চান না, শুধুমাত্র থিয়েটার করতে চান। আমি বলার কেউ নই, এটা সম্পূর্ণ ব্যাক্তিগত পছন্দ। নতুন প্রজন্মের যাঁরা থিয়েটার করতে আসছেন, আমি মনে করি যে ঘটনাই ঘটুক, যে উদ্দেশ্যেই আসুন, এরকম একটা সময়ে দাঁড়িয়ে থিয়েটার প্র্যাকটিস করার চেষ্টা করছেন, সেটা রেভোলিউশনের থেকে কম কিছু নয়। রাজনৈতিক প্রতিবাদের মধ্যে বিপ্লব লুকিয়ে থাকে নিশ্চিত কিন্তু এইটাও একটা মুভমেন্ট বলে আমি মনে করি। এই সময় দাঁড়িয়ে যাঁরা সিরিয়াস থিয়েটার চর্চার সঙ্গে যুক্ত হতে চাইছেন বা পারছেন, যে উদ্দেশ্য নিয়েই আসুক, সেইটা একটা আন্দোলন। ফলে তাঁদেরকে আমার সেলাম। আমরা যে সময়ে থিয়েটার করা শুরু করেছিলাম তার থেকে সময়টা এখন অনেক বদলে গেছে। আমাদের সময়ের থিয়েটার প্র্যাকটিসের থেকে এই সময় থিয়েটার প্র্যাকটিস আলাদা। যাঁরা সিরিয়াসলি থিয়েটার করতে আসছেন তাঁরা অনেক গ্লোরিফায়েড বলে আমার মনে হয়। আমরা অনেক প্রিভিলেজেড অবস্থান থেকে থিয়েটার করেছি, তখন সমাজে একটা মূল্য দেওয়ার, একটা দর দেওয়ার জায়গা ছিল কিন্তু এখন থিয়েটারের যে অবস্থান আমার মনে হয় নতুন প্রজন্মের যাঁরা থিয়েটার নিয়ে ভাবছেন, তাঁরা গভীর মনের মানুষ। যে উদ্দেশ্য নিয়েই আসুন না কেন, তাঁদের আমি ভালোবাসা জানাতে পারি, স্নেহ শুভেচ্ছাই জানাতে পারি।

প্রশ্ন: অথৈ, মহাভারত ২, নক্ষত্র শিকার, বিজনে বিষের নীল, আবহমান, এই লিস্টের আগামী নামটি কী?

অর্ণ: আমাদের কিঞ্চিৎ গ্রান্ট-নির্ভর থিয়েটার হয়ে গেছিল, এই মুহূর্তে সেটা নেই। আমাদের রাষ্ট্র মনে করেছে তারা আর মদত করবে না এবং কোনওরকম কারণ না দর্শীয়েই, যে অর্থে কিছু মানুষের সংসার এবং আমাদের থিয়েটারের হেঁশেলটা চলতো, সেই অর্থটা শূন্য করে দেওয়া হয়েছে। ফলে, অনেক কিছু ভাবতে হচ্ছে। আমি হ্যামলেট করতে চাই, আমি আ মিডসামার নাইটি’স ড্রিম করতে চাই, আমার নিজস্ব একটি নাটক লেখা আছে সেটা করতে চাই, আমি আবার বিসর্জন নতুন করে করতে চাই। আমি অনেক নাম বলতে পারি কিন্তু, সেই নাম বলায় তো কিছু এসে যায় না। তবে হ্যাঁ, আমার মনে হয় যে সময় আমার মধ্যে দিয়ে শেষ একবছরে একটা নতুন ধরনের সংলাপ তৈরি করাতে চাইছে, নতুন বলবো না মানে ক্লাসিকের মোড়কেই অনেক কিছু, ‘মহাভারত ৩’ লেখা হয়ে গেছে, করাতে চাইছে, সেগুলো আমি নিশ্চিত একটু একটু করে করবো। এই থিয়েটার নির্মাণ ছাড়া তো কোনো গতি নেই, থিয়েটার নির্মাণের মধ্যেই তো একটা সেলফ আইডেন্টিফিকেশন লুকিয়ে আছে তো সেইটার জন্যে আমি নিজেও অপেক্ষা করি। আমার মনে হয়, যদি ব্যক্তি অর্ণ মুখোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করা হয়, তাহলে একটা থিয়েটার নির্মাণের প্রসেসের মধ্যে যে আনন্দ, সেই আনন্দ তো আমি কোথাও কিছুতেই পাই না, ফলে সেইটা তো আবার নিশ্চয়ই ঘটবে। সে অর্থ থাকুক আর না থাকুক। নতুন থিয়েটার নির্মাণের প্রসেস তো ঘটবেই। এই মুহূর্তে স্পেসিফিক্যালি একটা নাম বলা খুব মুশকিল, কারণ অনেকগুলো থিয়েটারের ভাবনা এমনকি কিছু কিছু থিয়েটারের মঞ্চ ভাবনা, আবহ ভাবনা, তার অভিনয়ের প্যাটার্নের ভাবনা সবগুলোই ভাবনার স্তরে প্রস্তুত হয়েই আছে, ফলে যেকোনো একটা তো হবেই… এবছরই হবে!

Written by
Developed by DXDasia