‘আদর্শ’ শব্দটাই খুব গোলমেলে : সাক্ষাৎকারে বলছেন তূর্ণা দাশ

তূর্ণা দাশ (Turna Das)। বাংলা প্রসেনিয়াম থিয়েটারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতা। প্রায় দেড় দশক ধরে অভিনয় এবং নির্দেশনায় সমৃদ্ধ করে চলেছেন বাংলা থিয়েটারকে। পাশাপাশি তিনি একজন সফল নাট্যশিক্ষকও বটে। গ্রুপ থিয়েটারে তূর্ণার প্রথম অভিনয় লোকনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় একুশ শতক দলের ‘ভারসাম্য’ নাটকে। এরপর একে একে দেবী সর্পমস্তা, নাগমণ্ডলম, মেফিস্টো, আন্তিগোনে, অথৈ, ক্যাপটেন হুররা, নাটকটার নাম কী? ইত্যাদি সাড়াজাগানো নাটকে অভিনয় করেছেন চুটিয়ে। তাঁর পথচলা, বর্তমানে থিয়েটারকে দেখা, তাঁর অভিনয়-সহ নানা প্রসঙ্গে তূর্ণা দাশের সঙ্গে কথোপকথনে বঙ্গদর্শন.কম-এর পক্ষ থেকে রাজর্ষি ধাড়া।

__________________________

রাজর্ষি: আপনার জন্য ‘আদর্শ নাট্য-চরিত্র’ বলে কি কিছু হয়? যদি হয়, সেটি কীরকম?

তূর্ণা: আদর্শ শব্দটাই আমার কাছে খুব গোলমেলে মনে হয়। কে বিচার করছে তার উপর অনেকটা নির্ভর করে যে আদর্শ তার কাছে কী। তার নিজস্ব অবস্থান, বেড়ে ওঠা, তার সমাজকে-পৃথিবীকে দেখার যে ধরন এই সব কিছুর উপরেই নির্ভর করে আদর্শ কথাটা নির্ধারিত হয়। সে জায়গা থেকে দেখতে গেলে আমি যদি ব্যক্তিগতভাবে আমার অবস্থান, আমার বোধ, বিচার করার ক্ষমতা থেকে ভাবি, তাহলে নাট্য-চরিত্রের ক্ষেত্রে একজন অভিনেত্রী বা নাট্যকর্মী হিসেবে আমি বলতে পারি, সমস্ত ধরনের চরিত্র, নাটকের কল্পনা আমার কাছে ভিন্ন ভিন্ন নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। যে চরিত্র যত বেশি আমাকে জটিল সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবে, সেই চরিত্র তত বেশি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, ফলে সেটা আদর্শ চরিত্র না হলেও আমার কাছে অত্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আদর্শ শব্দটা নিয়ে আমার খুব বেশি মাথা ব্যথা নেই, তার থেকে বেশি উৎসাহিত হব যদি আমি জটিল চরিত্রের মুখোমুখি হতে পারি।

আমাদের একটা বড়ো প্রতিবন্ধকতার জায়গা হচ্ছে, ভালো মঞ্চ পাওয়া। সবসময় আমাদের এক একটা নতুন নাটক তৈরি করে মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে যেতে হয়। এক একটা নতুন নাটক হয়তো একটা-দুটো শো করার পর কবে একটা ডেট বেরোবে, হল পাওয়া যাবে তারপরে আমরা আবার মঞ্চায়ন করতে পারব, এই অপেক্ষাটা আমাদের করতে হয়।

রাজর্ষি: যখন একটা চরিত্র আপনার কাছে আসে লেখা আকারে, সেটিকে কীভাবে অভিনয়ের জন্য প্রস্তুত করেন? কোনো বিশেষ অভিনয়রীতি কি অনুসরণ করেন আপনি?

তূর্ণা: এক এক ধরনের চরিত্র বা এক এক ধরনের নাটকের ক্ষেত্রে এক এক ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয় আমাকে। পরিচালক কীভাবে নাটকটাকে দেখছেন এবং তার সঙ্গে আমার বোঝাপড়া সবটা নিয়েই গড়ে ওঠে চরিত্র। যেটা বারবার মনে করি যে অভিনেত্রী হিসেবে বা নাট্যকর্মী হিসেবে আমি পরিচালকের একজন ‘টুল’। পরিচালক যেভাবে চাইছেন আগে সেটাকে বুঝি, বিচার করি, তারপর আমার নিজস্ব কিছু বিশ্লেষণ থাকে। সেটা নিয়ে পরিচালকের সঙ্গে বারবার কথোপকথনের মাধ্যমে, বিতর্কের মাধ্যমে চরিত্রটা একটা কোনো জায়গায় খাড়া হয়। সেইভাবেই নাটকটা বা চরিত্রটা তৈরি করার চেষ্টা আমি করি। পরিচালক অনেকটা অংশ জুড়ে থাকেন আসলে, কারণ পরিচালক তো শুধু চরিত্র নিয়ে ভাবছেন না, গোটা নাটকটার ক্যানভাসটায় চরিত্রটাকে যেভাবে উনি দেখতে চাইছেন আমার কাছে সেটাই সবার আগে বিচার্য, তারপরে আমার নিজস্ব প্রসেসের ক্ষেত্রে মনযোগ দিই।

রাজর্ষি: আপনি অরুণ মুখোপাধ্যায়, দেবেশ চট্টোপাধ্যায়, সুমন মুখোপাধ্যায়, সোহাগ সেন থেকে শুরু করে অর্ণ মুখোপাধ্যায়, বিভিন্ন বয়সের নানান অভিজ্ঞতার নাট্য-নির্দেশকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। এতদিন পরে এসে এই ব্যাপক অভিজ্ঞতা নির্দেশক তূর্ণা এবং অভিনেতা তূর্ণা কীভাবে দেখেন?

তূর্ণা: অরুণ মুখোপাধ্যায়, সোহাগ সেন, সুমন মুখোপাধ্যায় আরও ছোটোবেলায় নিরঞ্জন গোস্বামীর কাছে আমার থিয়েটারের শিক্ষা। পরবর্তীকালে আরও কিছু নির্দেশকের সান্নিধ্য পেয়েছি। এগুলো সত্যিই আমাকে অনেকভাবে উপকৃত করেছে। আমি কোথাও হয়তো খুব স্পেসিফিক্যালি বা ক্যাটাগরিকালি বলতে পারবো না যে ঠিক কোন উপকরণগুলো আমার নাট্যক্রিয়ার মধ্যে কীভাবে মিলেমিশে রয়েছে, তবে এটা ঠিক যে সোহাগদির কাছে কাজ শেখার ক্ষেত্রে আমি যেমন চিনতে শিখেছি চরিত্রের ‘ইনার-সোল’-কে নিয়ে কীভাবে কাজ করা যায়। সেটার যেমন একটা দীর্ঘ প্রশিক্ষণ সোহাগদির কাছে পেয়েছি; আবার অরুণ স্যারের কাছে অর্থাৎ অরুণ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি উনি ভীষণভাবে চরিত্রের বাচনভঙ্গি নিয়ে কাজ করতেন, অনেকটা সময় দিতেন। সুমন মুখোপাধ্যায়ের কাজের ক্ষেত্রে এই সমস্ত শরীর এবং মনের যাবতীয় মেলবন্ধনের পর একজন অ্যাক্টরের বডি কীভাবে কাজ করছে সেই ক্ষেত্রটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গোটা থিয়েটারের স্ট্রাকচার, থিয়েটারের যে ক্যানভাসটা তৈরি হচ্ছে, যে ছবিটা আমরা মঞ্চে দেখতে পাচ্ছি তার সঙ্গে একজন অভিনেতার শরীর কীভাবে মিলেমিশে যাচ্ছে সেটার একটা দিক আমার সামনে খুলে দিয়েছেন সুমন মুখোপাধ্যায়। ঊষা গাঙ্গুলির কাছে হিন্দি নাটকের অভিনয় করার ট্রেনিং হয়েছে, আর সৌরভ পালোধির সঙ্গে কাজের মাধ্যমে শিখেছি অনেক জটিল বিষয়কে কত সহজ আঙ্গিকে পরিবেশন করা যায়।

আবারও নিরঞ্জন গোস্বামীর কথা না বললেই নয়। যখন আমি একেবারে ছোটো, আমরা থিয়েটার বলতে কিছুই প্রায় বুঝি না, তখন থিয়েটারের বীজ বুনে দিয়েছেন মনের মধ্যে, সেই সুযোগটা করে দিয়েছেন নিরঞ্জন গোস্বামী। অর্ণর সঙ্গে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি, পরবর্তীকালে একসঙ্গে কাজ করেছি, থিয়েটার নিয়ে বারবার বিভিন্ন আলোচনা বিতর্ক এবং পারস্পরিক বন্ধুত্বের জায়গা থেকে সমস্তটা মিলিয়ে মিশিয়ে আমরা কাজ করেছি। আবার দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করেছি, তাঁর কাছে হঠাৎ করে অভিনয়ের একেবারে নতুন একটা দিক খুলে গেছে। একটা ক্লাসিককে যখন আমি বিশ্লেষণ করতে চাইছি এখনকার সময়ের নিরিখে, ওই ক্লাসিকের বাচনভঙ্গি থেকে ভেঙে বের করে আজকেরই কিছু কথা বলার চেষ্টা করছি অথচ তার ধাঁচটা ক্লাসিকেই রয়েছে, সেটাকে কীভাবে ট্রিট করা উচিত সেটা কিন্তু আন্তিগোনে নাটক করতে গিয়ে দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে নতুনভাবে শিখলাম। আমার নিজস্ব কাজের ক্ষেত্রে, পরিচালনা করার ক্ষেত্রে কিংবা অভিনয় করার ক্ষেত্রে এই সমস্ত দান, সমস্ত আদান প্রদান আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এতগুলো মানুষের কাছ থেকে এত কিছু পাওয়া আমার কাছে সত্যিই বিরাট একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।

রাজর্ষি: আপনার মতে, আধুনিক বাংলা থিয়েটারের সবচেয়ে প্রধান সীমাবদ্ধতা কী?

তূর্ণা: আমি গোটা থিয়েটার সম্পর্কে বলার অধিকার রাখি না, আমার যাবতীয় যেটুকু অভিজ্ঞতা সমস্তটাই প্রসেনিয়াম থিয়েটার কেন্দ্রিক। সেই জায়গা থেকে আমাদের একটা বড়ো প্রতিবন্ধকতার জায়গা হচ্ছে, ভালো মঞ্চ পাওয়া। সবসময় আমাদের এক একটা নতুন নাটক তৈরি করে মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে যেতে হয়। এক একটা নতুন নাটক হয়তো একটা-দুটো শো করার পর কবে একটা ডেট বেরোবে, হল পাওয়া যাবে তারপরে আমরা আবার মঞ্চায়ন করতে পারব, এই অপেক্ষাটা আমাদের করতে হয়। এটা থিয়েটারের পক্ষে, সেই প্রযোজনার পক্ষে খুব ক্ষতিকারক। অনেক সময়ই হয় যে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু নাটক আমাদের প্রথম মঞ্চায়নের পর অপেক্ষা করে থাকতে হয় আবার কবে আরেকটা ডেট পাওয়া যাবে। মাঝে যদি একটা মাসের গ্যাপ পড়ে যায় তাহলে বুঝতেই পারছো নাটকটা কিন্তু প্র্যাকটিসের বাইরে চলে গেল, অর্থাৎ একটানা রিহার্সালের পর প্রথম শো’টা হল এবং তারপরে আবার একটা লম্বা একমাসের গ্যাপ। আমাদের আরও বেশ কিছু সমস্যা আছে, তবে মঞ্চ পাওয়াটা এই মুহূর্তে বড়ো সমস্যা বলে মনে হচ্ছে।

রাজর্ষি: ক্যামেরায় প্রায় কাজ না করা, এইরকম একটা সিদ্ধান্তে কীভাবে এসেছিলেন? এখন এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে কী মনে হয়?

তূর্ণা: ক্যামেরার সঙ্গে আমার কোনো ঝগড়া নেই। অনেকক্ষেত্রে হয় যে, একটা মানুষ দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে সেই কাজটাতেই মগ্ন হয়ে থাকে, অন্য কোনো দিকে তাকানোর খুব ইচ্ছেও হয় না, লোভও হয় না। সেভাবেই চলে যায়, সেরকম ভাবেই সে আছে।

একেবারে যে ধনুক ভাঙা পন করেছিলাম সেরকম কিছু ব্যাপার নয়। তবে থিয়েটার করতে ভালো লাগছে, আপাতত সমস্যা হচ্ছে না। সিনেমা না করলে বা ক্যামেরার সামনে কাজ না করলে যে আমার খুব দুঃখ হচ্ছে এমনও নয়, আবার কোনোদিন করব না এরকম কোনো ঝগড়াঝাটিও নেই। দেখা যাবে। পরের কথা পরে ভাবা যাবে।

রাজর্ষি: ইচ্ছেমতো’তে আপনি অভিনেতা এবং নির্দেশক, দুভাবেই কাজ করছেন। আবার নব পর্যায়ে বাইরের বিভিন্ন দলে কাজ করছেন। রমরমার নতুন প্রযোজনায় কাজ করছেন। যদিও প্রশ্নটা খুব আপেক্ষিক, আপনি এক্ষেত্রে দলকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না ব্যক্তিগত শিল্পচর্চাকে?

তূর্ণা: থিয়েটারের দুটো দিক আছে। একটা হচ্ছে সংগঠনগত দিক আর একটা হচ্ছে শিল্পগত দিক। এবার সংগঠনগত দিকটা বড়োই জটিল। শিল্পগত দিকটাও জটিল, কিন্তু সেটা কোথাও গিয়ে আমার নিজস্ব শিল্পচর্চার জায়গা, সেইখানে বহু বছর ধরে কাজ করছি, বড়ো সমস্যা কিছু হয়নি। সবটাই আমার প্রাপ্তির দিক, শেখার দিক, নতুন নতুন চরিত্র হয়ে নাট্যচর্চার দিকগুলোকে উন্মোচন করার দিক। সংগঠন আমায় অনেক শিক্ষা দিয়েছে। যদিও সংগঠনের ক্ষেত্রে একটা খুব বড়ো সমস্যা আছে।

নির্দেশক দু-রকমের হন, একটা সংগঠনের নির্দেশক আর একটা সেই সংগঠনের যে নাটকটি হচ্ছে সেটার নির্দেশক। সেখানে একটা ক্ষমতায়নের জায়গা থাকে, গণতান্ত্রিকতা বা অগণতান্ত্রিকতা ইত্যাদি প্রশ্নগুলো চলে আসে। ওই সংঘাতগুলো বড়ো ব্যথিত করে আমায়। ফলে এতদিন থিয়েটারচর্চার ক্ষেত্রে আমার মনে হয়, সংগঠনের সঙ্গে চলার যে মুন্সিয়ানা সেটার সঙ্গে আমি এখনও পুরোপুরি খাপ খাইয়ে উঠতে পারিনি। কোথাও একটা ব্যক্তিগত চলন আমাকে স্বস্তি দেয়। যদিও যাঁরা সংগঠনকে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারেন, তাঁদের আমি প্রণম্য মনে করি, কিন্তু সেটা হয়তো আমার পথ নয়।

নির্দেশক দু-রকমের হন, একটা সংগঠনের নির্দেশক আর একটা সেই সংগঠনের যে নাটকটি হচ্ছে সেটার নির্দেশক। সেখানে একটা ক্ষমতায়নের জায়গা থাকে, গণতান্ত্রিকতা বা অগণতান্ত্রিকতা ইত্যাদি প্রশ্নগুলো চলে আসে। ওই সংঘাতগুলো বড়ো ব্যথিত করে আমায়।

রাজর্ষি: বিভিন্ন কারণে (থিয়েটারের টিকিটের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, এক শ্রেণির থিয়েটারের প্রতি বিমুখতা, শো টাইম এবং প্লেস নিয়ে অভিযোগ) আপনার কি মনে হয় নাট্য অভিনেতাদের সঙ্গে দর্শকদের একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরি হচ্ছে? সেক্ষেত্রে বাজার অর্থনীতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে থিয়েটারের ক্ষেত্রে?

তূর্ণা: এখনও পর্যন্ত যে থিয়েটার আমি করছি, তাতে দর্শকদের সঙ্গে কমিউনিকেশন গ্যাপ হচ্ছে, এরকম কিছু আমার অভিজ্ঞতা নেই। যে ব্যাপারটা তুমি বলছো, টিকিটের দাম বৃদ্ধি হয়েছে, অস্বাভাবিক বৃদ্ধি তো সমস্ত জায়গাতেই হয়েছে, সমস্ত সেক্টরেই। খরচ ও চাহিদার একটা বিরাট পরিবর্তন এসেছে। থিয়েটার তো তার বাইরে নয়, তার বাইরে লড়তে পারবে না।

সেই পরিবর্তনটাই যুঝিয়ে থিয়েটার চলছে, ফলে আলাদা করে শুধুই থিয়েটারের টিকিটের দাম বেড়ে যাচ্ছে এটা বলা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না। এটাও সত্যি, যখন একটা থিয়েটার তৈরি করতে হয়, তখন আমাদের নিঃশ্বাস উঠে যায় টাকা তুলতে এবং সেটা একমাত্র উঠতে পারে টিকিটের বিনিময়ে। প্রসেনিয়াম তো অন্য কোনো ফর্মের মতো থিয়েটার নয়, এটি খরচসাপেক্ষ, টিকিটের টাকা থেকেই খরচ তুলতে হয়। এবার যদি কেউ বলেন ‘প্রসেনিয়াম করার কী দরকার? তুমি অন্য কিছু করো, কম দামের থিয়েটার করো…’ এগুলো বলা যায়। হ্যাঁ, এটা একটা পথ। যাঁরা সেটা করেন, তাঁরা সেটা পারেন। কিন্তু আমি যদি ক্রিকেট খেলাই শিখে আসি, আর সেটা একটু খরচের খেলা হয়, তাহলে সেই ক্রিকেটারকে তো বলা চলে না— ‘তুমি ক্রিকেট খেলতে গিয়ে এত খরচ করছ, যাও, ফুটবল খেলো!’ সেটা তো হয় না।

অন্যদিকে দর্শক কিন্তু টিকিটের টাকাটা দিচ্ছেন। ‘উইলিংনেস টু পে’, এই ব্যাপারটা দেখা যাচ্ছে দর্শকদের মধ্যে। যাঁরা একটা জীবন্ত শিল্পরূপ দেখতে যাচ্ছেন, তাঁরা টাকা দিতে চাইছেন। সবথেকে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, সবচেয়ে দামি সিট যেমন পূর্ণ হচ্ছে, তেমনই কম দামের সিটগুলোও পূর্ণ হচ্ছে। ফলে সবধরনের মানুষ আসছেন এটা বলাই যায়। এর পরেও একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, প্রসেনিয়াম থিয়েটার কিন্তু সব শ্রেণির মানুষের জন্য কোনোকালেই ছিল না। তার গঠনের মধ্যে, তার ইতিহাসের মধ্যেই তো এই বিষয়টা থেকে গেছে। এ বিষয়ে আলোচনা চলতেই পারে।

আর ‘কমিউনিকেশন গ্যাপ’-এর কথা যদি বলো, আমার তো তেমন কোনো অভিজ্ঞতা হয়নি এখনও। এক একটা সন্ধ্যায় বহু সংখ্যক নাটক হচ্ছে, সেখানে প্রচুর সংখ্যক নাট্যকর্মী অংশ নিচ্ছেন। প্রতিটি নাটকে যতজন মানুষ যাচ্ছেন, হতে পারে কিছু নাটক হাউসফুল হচ্ছে, কিছুতে কম দর্শক আসছেন, কিন্তু গোটা সংখ্যা যদি আমি যোগ করি, তাহলে সে সংখ্যাটা নেহাৎ কম নয়।

এবার থিয়েটারে দর্শকের বিমুখতার কথা যেটা বলা হচ্ছে, তাতে ইতিহাসে কোনো সময়ে আমরা যে ধরনের থিয়েটারের কথা বলছি, প্রসেনিয়াম থিয়েটার, সিরিয়াস থিয়েটার, তা দেখতে কাতারে কাতারে মানুষ লাইন দিয়ে আসবে, এটা ভাবাও হয় না। সমাজের একটা বিশেষ শ্রেণির মানুষই মূলত এখানে আসেন। ফলে এটা কোনও কমিউনিকেশন গ্যাপ নয়, বরং ফর্মটার বৈশিষ্ট্য। প্রসেনিয়াম থিয়েটারের এটাই বৈশিষ্ট্য।

রাজর্ষি: পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের নাট্যমঞ্চ কোনো এক অজ্ঞাত কারণে প্রসেনিয়াম থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। অল্টারনেটিভ স্পেস, স্পেস স্পেসিফিক, ব্ল্যাক বক্স এমনকী থার্ড থিয়েটারের সঙ্গেও খুব একটা সম্পর্কে স্থাপিত হয়নি আমাদের দর্শকদের। এক্সপেরিমেন্টাল কাজ করার সেভাবে কোনো জায়গা নেই এখনও। আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে অ্যাক্টিং স্পেসকে এবং অল্টারনেটিভ থিয়েটারকে কীভাবে দেখেছেন?

তূর্ণা: আমার খুব মনে হয় যে, রামায়ণ-মহাভারত আমাদের ভারতীয়দের সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সেই গল্প বলার ধরনটা আমরা এখনও খুব ভালোবাসি। সেটায় আমি নিজেকেও বাদ দেব না। সত্যিই, খুব সুন্দর গল্পওয়ালা সিনেমা বা নাটক দেখতে কার না ভালো লাগে!

দেখো, আমি মনে করি তুমি আমার কাছে যে ধরনের থিয়েটার নিয়ে প্রশ্নগুলো করছো, মানে সিরিয়াস থিয়েটার, সেই থিয়েটার যে সমাজের সমস্ত মানুষের জন্য, তা কিন্তু নয়। প্রাথমিকভাবে গতানুগতিক সমাজের কাছে সেটাই একটা অল্টারনেটিভ।

আবার সেখান থেকে যখন আমি ‘সো কল্ড’ গল্পওয়ালা থিয়েটারের বাইরে আরও অল্টারনেটিভ কিছু করতে চাই, সেটা স্পেস নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট হতে পারে, বক্তব্য নিয়ে, অভিনয় পদ্ধতি নিয়ে, স্ক্রিপ্ট নিয়ে, সব দিক দিয়েই এক্সপেরিমেন্ট করার চেষ্টা আমরাও করেছি। সেই প্রসেসগুলো খুব ইন্টারেস্টিং। যখনই আমরা সেই ধরনের কাজ করেছি, নিজেদের খোঁজা, দর্শকের সঙ্গে সেই খোঁজার আদানপ্রদান করা, সেই প্রক্রিয়াটা দুর্দান্ত হয়। শিল্পী হিসেবে সেটা খুব ভালো লাগে।

কিন্তু এটা ঠিক যে ‘আপামর জনগণ’-এর কাছে (‘আপামর’ বলতে আবারও আমি বলছি, থিয়েটারের যতটুকু পরিসর, সেই খানকার আপামর, আপামর বলতে কিন্তু ‘আসমুদ্রহিমাচল’ সমস্ত ভারতবাসীর কথা বলছি না) থিয়েটারের যে গণ্ডি, সেই জনগণের মধ্যেও আবার অল্টারনেটিভ বা এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারের ধরনটা অনেকের কাছেই কঠিন মনে হয়। আমরা এখনও সেই রাজা-রানির গল্প বলার ধরনে অভ্যস্ত হয়ে রয়েছি। লিনিয়ার কাঠামোতে দর্শক অভ্যস্ত। নন-লিনিয়ার কাঠামোতে এখনও কাজ করতে চাইলে সেটায় কোথাও একটা বাধার সৃষ্টি হচ্ছে।

সেখানে এক্সপেরিমেন্টাল, অল্টারনেটিভ এগুলো জায়গা করে নিতে বোধহয় আরও একটু সময় লাগবে। তবে আমি কিন্তু এমন বলছি না যে, সব কাজ সমস্ত মানুষের জন্য হবে। খুব বেশি লোক দেখলো না, তাতে তো কাজটা মিথ্যে হয়ে যায় না। একদমই না।

ফলে সব ধরনের কাজই হোক। কিছু কাজ হলে যদি একটু বেশি দর্শক আসে, যদি তারা নিজেদের সঙ্গে কানেক্ট করতে পারে, সেটাও যেমন গুরুত্বপূর্ণ; আবার কিছু কাজ যদি এমন হয়, একটু অল্টারনেটিভ, একটু ছোটো জায়গায় হচ্ছে, কম দর্শক নিয়ে কাজ করছে, সেটা হলেও মন্দ নয়। হ্যাঁ, আমাদের স্পেসের খুব সমস্যা আছে, কিন্তু তার মধ্যে দিয়েই তো কত রকমের কাজ বেরিয়ে আসছে। কত ছেলে-মেয়ে কাজ করছে, কত রকমের এক্সপেরিমেন্ট করার তো চেষ্টা চলছে।

এই যে তুমি আমায় প্রশ্নগুলো করছো, তার মানেই তো এই ভাবনাগুলো আমাদের মগজে কুরে কুরে খাচ্ছে! তাই তো তুমি প্রশ্নগুলো করছো আর আমি তার একটা যথাযোগ্য উত্তর দেওয়ার চেষ্টাও করছি। অতএব আমরা ভাবছি, ভেবে চলেছি। কাজ করার চেষ্টা করছি বলেই তো ভাবছি।

Written by