“আর্ট কলেজে পড়ুয়াদের প্রোডাকশন ডিজাইনের কেরিয়ার সম্পর্কে বলাই হয় না”

অমিত রায়ের সাক্ষাৎকার, দ্বিতীয় তথা শেষ পর্ব

‘সুপার ৩০’-র সেট 

বলিউডে প্রায় দশকখানেক ধরে একের পর এক ব্লকবাস্টার ছবির সেটে জাদু দেখিয়ে আসছেন অমিত রায় এবং সুব্রত চক্রবর্তী। ২০১৫ সালে ‘হায়দার’ ছবিতে সেরা শিল্প নির্দেশনার জন্য আইফা পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, সেই বছরই ‘দেড় ইশকিয়া’ ছবিতে সেরা শিল্প নির্দেশনার জন্য গিল্ড পুরস্কার, ২০১৭ সালে ‘২৪’ ছবিতে সেরা প্রোডাকশন ডিজাইনের জন্য জাতীয় পুরস্কার, ২০১৮ সালে ‘রাজি’ সিনেমায় সেরা প্রোডাকশন ডিজাইনের জন্য স্ক্রিন পুরস্কার রয়েছে তাঁদের ঝুলিতে। তবে এগুলো কেবলই উদাহরণ। বলিউডে শিল্প নির্দেশনা (অথবা প্রোডাকশন ডিজাইন)-এর জগতে এই জুটি এমন এক ধারা তৈরি করেছেন, যা অন্য কারো সঙ্গে মেলে না। নামজাদা পরিচালকরাও তাঁদের সঙ্গে কাজ করতে ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করেন। গুজব শোনা যায়, এই জুটির পারিশ্রমিক নাকি সুপারস্টার অভিনেতাদেরও হার মানায়।

অমিত রায় 

যেমন ধরা যাক বিকাশ বহলের ব্লকবাস্টার ছবি ‘সুপার ৩০’ (২০১৯)-এর কথা। সুব্রত এবং অমিত এমন বাস্তবের অনুসারী সেট তৈরি করেছেন, খুব কাছ থেকে দেখলেও ধরা যাবে না আসল কি নকল। প্রত্যেক সিনেমাতেই মায়া ফুটিয়ে তোলেন দু’জনে। অমিত রায় দুঃখ করে জানালেন, শুটিংয়ের পর সেট যখন সরিয়ে নেওয়া হয়, সেই সময় বিষাদে ভরে ওঠে তাঁদের মন। “সেট ভাঙার সময় আমি বা সুব্রত কেউই হাজির থাকি না। খুবই বেদনাদায়ক সেই দৃশ্য।”

বঙ্গদর্শনের সঙ্গে কথোপকথনে সুব্রত চক্রবর্তী এবং অমিত রায় জানিয়েছেন তাঁদের জার্নি, প্রথম জীবনের সংগ্রাম, হাড়ভাঙা পরিশ্রম, অসীম ধৈর্য এবং অভূতপূর্ব সাফল্যের কাহিনি। এই সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বে অমিত রায় অকপটে বললেন, কিংবদন্তি শিল্প নির্দেশক এবং প্রোডাকশন ডিজাইনার সমীর চন্দের কাছে তাঁরা কীভাবে বছরের পর বছর ধরে কাজ শিখেছেন। সমৃদ্ধ হয়েছেন। ২০১১ সালে সমীর চন্দ প্রয়াত হলে দু’জনে স্বাধীনভাবে নিজেদের ভাগ্য গড়ার দিকে এগিয়ে যান।

প্রচণ্ড সংগ্রামের মধ্যে অমিত রায়ের পাশে সর্বদা থেকেছেন তাঁর স্ত্রী এবং পরিবার। এখনও রয়েছেন। হয়ে উঠেছেন তাঁর সাফল্যের ভিত্তিপ্রস্তর। অমিত এবং সুব্রত একই সঙ্গে তিন-চারটি ছবির কাজ হাতে নেন। এখন যেমন ‘গাঙ্গুবাই’, ‘মহারাজা’, ‘তেজস’ এবং ‘গুডবাই’-এর কাজ চলছে। কিন্তু এত কিছু সামলান কীভাবে? অমিত বললেন, “আমরা কাজ ভাগ করে নিই। বেশিরভাগ সময়ে সুব্রত দেখে সৃজনশীল দিক, আমি দেখি সংগঠন এবং লজিস্টিকসের দিকটা। তবে ব্যতিক্রমও আছে।”

পরিচালক ডঃ চন্দ্রপ্রকাশ দ্বিবেদীর সঙ্গে অমিত রায় এবং সুব্রত চক্রবর্তী 

কথোপকথনে উঠে আসে, সিনেমার কর্মকাণ্ডে প্রোডাকশন ডিজাইনারের ভূমিকা কত গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা গোটা ছবির লুকটাই বদলে দিতে পারেন। ‘বিহাইন্ড-দ্য-সিন’-এ যেসব মানুষ কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে অবহেলার শিকার হন অনেকেই। অমিত বলেন, “হলিউডে, এমনকি দক্ষিণ ভারতেও টেকনিক্যাল ক্রিউদের যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, বলিউডে তা মেলে না। যতদিন না বুঝতে পারলাম যে আমরা পুরোপুরি প্রোডাকশন ডিজাইনার হয়ে উঠেছি, আমরা নিজেদের শিল্প নির্দেশকই বলতাম। প্রোডাকশন ডিজাইনার আসলে পরিচালকের চোখ হয়ে কাজ করেন। পরিচালক আমাদের বলেন, তাঁরা সেটে কী চান। স্ক্রিনের জন্য আমাদের তা সৃষ্টি করতে হয়। আমরা সবার আগে সেটে আসি, সবার শেষে যাই।  আমরা কেবল সেট ডিজাইনার নই। ক্রেডিটে আমাদের নাম শুধু উল্লেখ করা হয় মাত্র। সিনেমার অন্যান্য স্তম্ভ – যেমন ক্যামেরাপার্সন, অ্যাকশন ডিরেকটররাও খুবই উপেক্ষিত থেকে যান। 

‘পদ্মাবত’-এর সেট

অমিত আক্ষেপ করে বলেন, একালের কলকাতার ছেলেমেয়েদের অনেকেই শিল্প নিয়ে পড়াশোনা করলেও জানে না, প্রোডাকশন ডিজাইনার হিসেবেও কেরিয়ার তৈরি করা যায়। “আর্ট কলেজে এই নিয়ে জানানোও হয় না। আমি চাই, আরও প্রচুর নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়ে কলকাতার কমফোর্ট জোন ছেড়ে আমার মতো মুম্বাই আসুক। সংগ্রাম করুক। বলিউডে জায়গা করে নিক। দুঃখের কথা, বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে এখন সংগ্রাম মানেই জানে না। ভুল করলে দাদা আমাদের কতবার মেরেছেন, আমরা তার সংখ্যা মনে রাখিনি। এখন সাবধানে কথা বলতে হয়, যাতে কেউ মন খারাপ না করে। আমি বিশ্বাস করি, শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম এবং ভালোবাসা ছাড়া কিছু শেখা যায় না। কিন্তু এখন ছেলেমেয়েরা প্রথমেই জিজ্ঞেস করে, ‘বেতন কত?’ আমি কাউকেই বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে বলছি না। কিন্তু টাকা কখনও একমাত্র আকর্ষণ হতে পারে না”, বললেন তিনি। 

মেঘলা গুলজারের সঙ্গে অমিত রায় 

কাজ শুরু করার সময় যে ভালোবাসা ছিল, এতগুলো ব্লকবাস্টার ছবির পরেও একই রকম আবেগ অনুভব করেন অমিত। দর্শকের কথাও মাথায় রাখতে হয়। “যেমন ধরা যাক ‘পদ্মাবত’ ছবির সেট। স্ক্রিপ্টে শুধু হাভেলির কথা বলা আছে। সেই হাভেলি কেমন দেখতে, দর্শকরা কীভাবে সন্তুষ্ট হবেন, তা আমাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। নানা ব্যাপারে কলকাতার থিম পুজো ডিজাইনারদের সঙ্গে আমাদের মিল রয়েছে। জনতার রুচি এবং বাজারের চাহিদা মেনে আমাদের কাজ করতে হয়। কত অল্প বাজেটে কলকাতার আর্ট ডিজাইনাররা অসাধারণ সব থিম তৈরি করেন।”

পছন্দের ছবির কথা জিজ্ঞেস করতে অমিত বললেন ‘হাওয়াইজাদা’ (২০১৫) এবং তামিল কল্পবিজ্ঞান অ্যাকশন ছবি ‘২৪’ (২০১৬)-এর কথা। অন্য ধরনের কাজ করার সুযোগ ছিল এই দুটি ছবিতে। তালিকায় ‘পদ্মাবত’-এর নামও তিনি রেখেছেন। তবে, পছন্দের তালিকা যে আরও বড়ো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। 
 

Developed by DXDasia