গ্রাম থেকে সরাসরি দেখতে পাবেন কাঞ্চনজঙ্ঘা
‘ইচ্ছে গাঁও’ নামটা শুনলে মনে হয়, সরাসরি কোনও বাংলা কবিতা থেকে উঠে এসেছে। যেন এক রূপকথার রাজ্য। তবে কথাটি আসলে লেপচা ভাষার। আদিতে যা ছিল ‘ইচে গাঁও’। লোকের মুখে মুখে তা ‘ইচ্ছে গাঁও’ হয়ে উঠেছে। কালিম্পং জেলার এই গ্রাম থেকে দেখা যায় বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ – কাঞ্চনজঙ্ঘা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে জায়গাটি ৫৮০০ ফুট উঁচুতে। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে মোটামুটি ৯০ কিলোমিটার দূরে। কলকাতা থেকে আকাশপথ এবং রেলপথে সহজেই পৌঁছনো যায়।

তিস্তা নদী পেরিয়ে আঁকাবাঁকা পথ চলে গিয়েছে কালিম্পংয়ের দিকে। কালিম্পং শহর পার করে যদি চলে যান পেডংয়ের অভিমুখে, চোখে পড়বে নানা রঙের বৌদ্ধ পতাকা। রামধুরায় দেখবেন অসাধারণ মায়াবী বাড়িগুলোর ব্যালকনি থেকে রঙিন ফুলেরা উঁকি মারছে। অল্প কিছুটা এগোলেই সামনে রয়েছে সাইনবোর্ড – ‘Welcome to Icche Gaon’। সরু রাস্তা দিয়ে ঢুকে পড়বেন কল্পলোকের ঠিকানায়। চারদিকে পাইন এবং বার্চের জঙ্গল। যতই এগোবেন, গ্রামটির আদিম সৌন্দর্য আপনার সামনে ফুটে উঠবে।

লেপচা ভাষায় ‘ইচে গাঁও’ মানে ‘সবার ওপরে যে গ্রাম রয়েছে’। গভীর অরণ্যের মাঝখানে নিস্তব্ধ এই গ্রাম নিরিবিলি ছুটি কাটানোর আদর্শ জায়গা। কমবেশি ৩০টি পরিবারের বাস। প্রত্যেকটি বাড়ি পাথরের সিঁড়ি দিয়ে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। কোনও বাড়ি উঁচুতে, কোনওটা নিচুতে। মহিলারা বসে এক বাড়ি থেকে অন্যবাড়িতে যোগাযোগ করেন। আঙিনায় থাকে বিরল প্রজাতির সব অর্কিড। গ্রামের সৌন্দর্য তাতে অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছে। সমগ্র গ্রামকে এক হলুদ আভায় ভরিয়ে রাখে চারদিকের সরষে খেত।

বাঁকা চাঁদের মতো ঘন অরণ্য ঘিরে আছে গ্রামটিকে। পাইন, বার্চ গাছ, পাখিদের গান, সূর্যের আলো, ঠান্ডা হাওয়া – সব মিলিয়ে স্বর্গীয় পরিবেশ। অক্টোবর মাসে যেন রঙের মেলা শুরু হয় বনে – সাদা, কমলা, মেরুন, সোনালি হলুদ। নানা রকমের ফুল ফোটে। মস, ফার্ন, ছত্রাক, অর্কিড – বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ। চুটকি, পান্না কোকিল, কাঠঠোকরা, ওরিওল, সানবার্ড, ফিঞ্চ, বুনো মাছরাঙা – কত রকমের পাখি! ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার এবং পাখিপ্রেমীদের খুবই পছন্দ হবে।
আরও পড়ুন: ফেলে আসা স্বর্ণযুগের সাক্ষী ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি
তবে সবথেকে বেশি আকর্ষণ করে পাহাড়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে দেখতে পাবেন কাঞ্চনজঙ্ঘার রাজকীয় রূপ। সারা দিন ধরে আলো যেভাবে বদলাবে, কাঞ্চনজঙ্ঘার রংও পালটাতে থাকবে। যেন এক কুহকের দুনিয়া। কোনও বাড়ির জানলায় বসে গোটা দিন ধরে তাকিয়ে দেখতে পারেন সেই অপরূপ দৃশ্য। মেঘের দল আপনাকে ছুঁয়ে যাবে।

সন্ধেবেলা মনে হবে জোনাকিদের রাজত্বে ঢুকে দিয়েছেন আপনি। দার্জিলিং, তিনচুলে, রভাংলার থেকে মায়াবী আলো এসে ইচ্ছে গাঁওয়ের প্রতিটি কোণ উদ্ভাসিত করে দেয়। ঠান্ডার মোকাবিলা করতে গরমাগরম মোমো আর চিকেন পকৌড়া যে কোনও হোমস্টে-তেই পেয়ে যাবেন। স্থানীয় বাসিন্দারা খুবই আন্তরিক। মনে হবে নিজের বাড়িতেই আছেন।

পাহাড়ে চড়তে যদি ইচ্ছে হয়, স্থানীয় গাইডদের সাহায্য নিন। সবচেয়ে উঁচু পয়েন্টে চলে যেতে পারেন। তারপর ডান দিকে একটু হাঁটলেই গাছপালার ফাঁক দিয়ে তিস্তা নদী চোখে পড়বে। এই রাস্তা চলে গিয়েছে সিরেলি গাঁও এবং ড্যামসাং কেল্লার ধ্বংসাবশেষের দিকে। ১৬৯০ সাল নাগাদ দুর্গটি বানানো হয়েছিল। লেপচা রাজা গ্যাবো আচুকের শেষ বাসস্থান এটি। ১৮৬৪-৬৫ সালে ইঙ্গ-ভুটান যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যায় এই কেল্লা। সিরেলি গাঁও থেকে মাত্র দু’কিলোমিটার দূরে রামিতে দারা ভিউপয়েন্ট। যেতে পারেন সেখানেও।

ইচ্ছে গাঁও যেতে চাইলে বর্ষা ছাড়া বছরের অন্য যে কোনও সময় বেছে নিন। কাঞ্চনজঙ্ঘার সবচেয়ে স্পষ্ট ভিউ পাবেন অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি। শীতকালে ইচ্ছে গাঁওয়ের তাপমাত্রা থাকে ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে।
যদি গ্রামের ভিতর থাকতে ইচ্ছে না করে, কালিম্পং শহরে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের নিজস্ব হিলটপ ট্যুরিজম প্রপার্টি (পূর্বতন হিল টপ ট্যুরিস্ট লজ)। থাকা এবং খাওয়ার দারুণ বন্দোবস্ত। ইচ্ছে গাঁও থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার দূরে। রাস্তার দু’পাশে প্রকৃতির মোহময় শোভা দেখতে দেখতে ৪৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবেন। বুকিং এবং অন্যান্য তথ্যের জন্য যোগাযোগ করুন –
West Bengal Tourism Development Corporation Ltd.
Udayachal Tourist Lodge
DG Block (1st floor), Sec II, Salt Lake, Kolkata – 700091
Phone: 033 2358 5189
Email: visitwestbengal@yahoo.co.in, mdwbtdc@gmail.com, dgmrwbtdc@gmail.com
Website: https://www.wbtdcl.com/