হুগলি নদীর ধারে ব্রিটিশ যুগের স্মৃতি

পায়ে হেঁটে জানুন কলকাতার ইতিহাস

ফোর্ট উইলিয়াম

গতবারের দারুণ আকর্ষণীয় সফরের শেষে আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম এসপ্ল্যানেডের কাছাকাছি। সেখান থেকেই আজ নতুন দিকে যাত্রা শুরু করব। পায়ে হেঁটে কলকাতা ভ্রমণের ষষ্ঠ পর্বে আমরা চলতে থাকব হুগলি নদীর পূর্ব তীর বরাবর। এই নদীর জন্যই ইউরোপীয় বণিকদের কাছে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল মহানগর। ব্রিটিশরা প্রথম কলকাতায় পা রাখার সময় হুগলি যে ধারায় প্রবাহিত হত, এখন তার থেকে প্রায় ৫০ মিটার পশ্চিমে সরে গিয়েছে। আগে যেসব বিখ্যাত স্থাপত্য গড়ে উঠেছিল গঙ্গার ধারে, এখন স্থলভাগের বেশ খানিকটা ভিতরে সেগুলি অবস্থিত। 

আজকের যাত্রা আপনি শুরু করতে পারেন এসপ্ল্যানেড, কার্জন পার্ক অথবা পার্ক স্ট্রিট-চৌরঙ্গি ক্রসিং থেকে। অর্থাৎ কলকাতার ঠিক মধ্যভাগে। রেড রোড পেরিয়ে দুই বিশ্বযুদ্ধের ‘গৌরবময় মৃত্যু’-র স্মৃতিস্তম্ভের কাছে আমাদের প্রথম গন্তব্য।

ফোর্ট উইলিয়াম

এখনকার জিপিও-র জায়গাতে ছিল পুরোনো ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ। ১৭৫৬ সালে সিরাজ-উদ-দৌলা কলকাতা আক্রমণ করলে দুর্গের ভয়াবহ ক্ষতি হয়। তারপর পলাশির যুদ্ধ। নতুন ফোর্ট উইলিয়াম নির্মাণ সমাপ্ত হয় ১৭৭২ সালে। সেটিই আপনি দেখতে পারবেন, তবে ভারতীয় সেনা কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে। যদি প্রবেশাধিকার পান, সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। ফোর্ট উইলিয়াম জাদুঘর অবশ্যই দেখবেন। পুরোনো ফোর্ট উইলিয়ামের নানা সামগ্রী ছাড়াও তাক লাগিয়ে দেবে বিভিন্ন সময়ের যুদ্ধাস্ত্রের বিপুল সম্ভার। ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরল ফটোগ্রাফগুলিও মুগ্ধ করার মতো। 

এছাড়া দেখবেন কিচেনার হাউজ, ফ্ল্যাগস্টাফ হাউজ, সেন্ট পিটার’স চার্চ। বিখ্যাত এক কামান রয়েছে, ১৭৫৭ সাল থেকে প্রতিদিন দুপুর ১টায় গর্জন করে সময়ের জানান দেয়। ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে আপনায় কল্পনায় ভেসে উঠবে সেই দিনগুলো, যখন নেপাল, আফগানিস্তান, আসাম, বার্মার যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর ভিত্তিভূমি ছিল ফোর্ট উইলিয়াম।

ইডেন গার্ডেনস

ইডেন গার্ডেনস স্টেডিয়াম ছাড়া কলকাতার কথা ভাবা যায়? এখন যেটি ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল, তা এক সময় ছিল ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব। স্থাপিত হয়েছিল ১৮২৫ সালে। প্রথম দিকে তাঁদের খেলা হত ফোর্ট উইলিয়ামের খুব কাছের এক মাঠে। কিন্তু ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বারংবার অভিযোগে সরে যেতে হল।১৮৫৪ সালে লর্ড অকল্যান্ড নতুন মাঠের ব্যবস্থা করেন, সেখানেই এখন স্টেডিয়াম। অনেক পরে ক্লাবটি চলে যায় গুরুসূদয় দত্ত রোডে ক্যালকাটা ক্রিকেট অ্যান্ড ফুটবল ক্লাবের চত্বরে।

১৮৪১ সালে কলকাতা ময়দানের উত্তর-পশ্চিম কোণে বাগান হিসেবে যাত্রা শুরু করে ইডেন গার্ডেনস। নাম রাখা হয় লর্ড অকল্যান্ডের দুই বোন এমিলি এবং ফ্যানি ইডেনের নামে। ১৮৬৪-তে চালু হল ভারতের সবচেয়ে পুরোনো স্টেডিয়াম। জমিটি ছাড়া এখন আর সেদিনে কিছুই অবশিষ্ট নেই। 

প্রথমে বাগানের নাম ছিল ‘অকল্যান্ড সার্কাস গার্ডেন, পরে ‘ইডেন গার্ডেনস’ নাম রাখা হয়, সম্ভবত বাইবেলে বর্ণিত স্বর্গোদ্যান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। শোনা যায়, হুগলি নদীর ধারে অনেকটা এলাকা জুড়ে ছিল মার বাগান। তখনকার জমিদার বাবু রাজচন্দ্র দাস এই বাগান দান করেন লর্ড অকল্যান্ড এবং এমিলি ইডেনের হাতে। জমিদারের মেয়েকে এক দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচিয়ে তুলেছিলেন এঁরা। সেই মার বাগান এখন ইডেন গার্ডেনস।

প্রিন্সেপ ঘাট

হুগলি নদীর ধারে প্রিন্সেপ ঘাট গড়ে ওঠে ১৮৪১ সালে। তখন নাম ছিল ‘কুলি ঘাট’। ডাব্লু ফিটজেরাল্ড ১৮৪৩ সালে এখানে যোগ করেন অপরূপ প্যালাডিয়ান পোর্চ। তখন বিখ্যাত পণ্ডিত জেমস প্রিন্সেপকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নাম রাখা হয় প্রিন্সেপ ঘাট।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পূর্ত দপ্তর ২০০১ সালে প্রিন্সেপ ঘাটের সংস্কার করে। তারপর থেকে রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়। এক সময় ব্রিটিশ রাজপরিবার গঙ্গা থেকে প্রিন্সেপ ঘাট জেটিতেই অবতরণ করতেন। আবার এখান থেকেই জাহাজে উঠতেন। ২০১২তে প্রিন্সেপ ঘাট ও বাবুঘাটের মাঝখানে পর্যন্ত ২ কিলোমিটার নদীর তীর সুন্দরভাবে সাজানো হয়। আগে যেখানে স্ট্র্যান্ড ছিল। পুরোনো দিনের কলকাতার ছবি এবং ফটোগ্রাফে দেখা যায়। সেই স্ট্র্যান্ড থেকেই নাম হয়েছিল স্ট্র্যান্ড রোডের।


গোয়ালিয়র মনুমেন্ট এবং উট্রাম ঘাট

ব্রিটিশ বাহিনীর গোয়ালিয়র অভিযানে যেসব ইংরেজ ও ভারতীয় সৈন্য মারা যান, তাঁদের স্মৃতিতেই গড়ে উঠেছে গোয়ালিয়র মনুমেন্ট। নিজের চোখে দেখলে বুঝতে পারবেন, ব্রিটিশরা কেন এটিকে মজা করে ডাকতেন ‘ঢাকনাওয়ালা মরিচের কৌটো’। গভর্নর জেনারেল লর্ড এলেনবরো ১৮৫০ সাল নাগাদ এটির উদ্বোধন করেন। এই মনুমেন্টকে ‘Ellenborough’s Folly’ নামেও ডাকা হয়। কথাটির মাধ্যমে তাঁর বোকামিকে ইঙ্গিত করা হয় নাকি এই সৌধের কোনো ব্যবহারিক উপযোগিতা নেই বলে ব্যঙ্গ করা হয়, তা স্পষ্ট নয়।

গোয়ালিয়র মনুমেন্টের একেবারে নিচের তলায় প্রবেশদ্বারে একটি ফলক রয়েছে, দেখতে ভুলবেন না। সেখানে লেখা, “This Monument has been restored in 1990 by The UB Group, 1 Vittal Mallya Road. Bangalore – 560001, under the supervision of the Calcutta Chapter of INTACH, the Indian National Trust for Art and Cultural Heritage,”

আরেকটু এগোলেই সামনে পড়বে উট্রাম ঘাট। ১৮৫৭ সালে লখনৌতে বিদ্রোহ দমনে বীরত্ব দেখান ব্রিটিশ সেনাপতি স্যার জেমস উট্রাম। ১৮৩৮-এর আফগান যুদ্ধেও তাঁর পারদর্শিতা উল্লেখ করার মতো। উনিশ শতকের শেষে তৈরি এই ঘাট পূর্ব ভারতের সঙ্গে ব্রহ্মদেশের নৌ-পরিবহনে প্রধান বন্দর হিসেবে কাজ করত।

পরের সপ্তাহেও আমরা হুগলি নদীর ধার বরাবর হাঁটব। ঘুরে দেখব আরও কয়েকটি বিখ্যাত ঘাট। 

 

Developed by DXDasia