রাজা শশাঙ্কের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ
শশাঙ্ক, ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত বাংলার প্রথম নৃপতি। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে বঙ্গদেশের ছোটো ছোটো রাজ্যকে একত্রিত করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন গৌড় রাজ্য। সেই দিক থেকে তিনি বাংলার প্রথম সম্রাটও বটে। সিংহাসনে আরোহণ করে বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন তিনি। গবেষকরা বলে থাকেন, মোটামুটি ৫৯০ থেকে ৬২৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি রাজ্যত্ব করেছিলেন। শশাঙ্কের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ। অর্থাৎ, কর্ণসুবর্ণ হয়ে উঠেছিল স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ বাংলার প্রথম রাজধানী। এখনকার মুর্শিদাবাদ জেলার কানসোনা গ্রামই প্রাচীন যুগের কর্ণসুবর্ণ। আশ্চর্যের ব্যাপার এই, স্বাধীন বাংলার প্রথম রাজধানী যেমন মুর্শিদাবাদে, তেমনি, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের রাজধানীও ছিল এই জেলাতেই। বাংলার নবাবরা অবশ্য খাতায় কলমে মুঘলদের অধীনেই ছিলেন। তবে বাস্তবে স্বাধীনভাবেই প্রশাসনিক কাজকর্ম চালাতেন তাঁরা।
চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন-সাং কর্ণসুবর্ণ নগরীকে ‘কিলোনসুফলন’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এখানে জনবসতি ছিল যথেষ্ট। বাসিন্দারা প্রচুর ধনের অধিকারী ছিলেন। জায়গাটা স্যাঁতস্যাতে হলেও শীত আর গরম কোনোটাই খুব বেশি ছিল না, তাই আবহাওয়া ছিল বেশ আরামদায়ক। এখানে চাষবাস নিয়মিতই হত, তাই সমস্ত অঞ্চল ছিল শস্যশ্যামলা। একাধিক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল এখানে। কর্ণসুবর্ণের পাশেই ছিল বিখ্যাত রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার। এছাড়া নগরের ভিতর বেশ কিছু বৌদ্ধ মঠ ছিল। যাঁরা বৌদ্ধ নন, তাঁদেরও ছিল অনেক মন্দির। এখানকার শিক্ষা এবং সংস্কৃতি চর্চার প্রশংসা করেছেন হিউএন-সাং। আরো বেশ কিছু লিপি এবং গ্রন্থে কর্ণসুবর্ণের অল্পবিস্তর বর্ণনা আছে।

মুর্শিদাবাদের রাঙামাটি গ্রামের রাজবাড়িডাঙায় খননকার্য চালিয়ে এক প্রাচীন বৌদ্ধ মঠের ধ্বংসস্তূপ পাওয়া গেছে। গবেষকরা বলেন, এটাই ছিল রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার। তার কাছেই প্রতাপপুর গ্রামের রাক্ষসীডাঙা ঢিবিতে খননকার্য চালিয়েও পাওয়া গেছে প্রাচীন ইটের ভাঙাচোরা স্থাপত্য। স্থানীয় মানুষেরা একে রাজা কর্ণের প্রাসাদ বলে ডেকে থাকেন। লোকমুখে প্রচারিত, দুর্যোধন মহাভারতের যুগে কর্ণকে অঙ্গরাজ্য দান করেছিলেন, তখন থেকে কর্ণসুবর্ণ ছিল অঙ্গের রাজধানী।
গুপ্তযুগের পর এবং পাল যুগের আগে কর্ণসুবর্ণ হয়ে উঠেছিল পূর্বভারতের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু। শশাঙ্কের রাজধানীকে দখল করতে চেয়েছিলেন থানেশ্বরের সম্রাট হর্ষবর্ধন, কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মন এবং আরও বেশ কিছু শাসক। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মানবদেব কয়েক মাস গৌড় শাসন করেছিলেন। তারপর এক সময়ে হর্ষবর্ধন আর ভাস্করবর্মন গৌড় দখল করে নিয়েছিলেন। ভাস্করবর্মন কর্ণসুবর্ণকে নিজের অধীনে নিয়ে এসেছিলেন। একের পর এক রাজা কর্ণসুবর্ণ দখল করে নিচ্ছেন, এভাবেই বাংলায় শুরু হয় অরাজকতা, যাকে মাৎসন্যায় বলা হয়।