ভবানী পাঠক এবং তাঁর বিদ্রোহী দলের ঘাঁটি ছিল এই মন্দির
দেবী চৌধুরানির কথা বললে উত্তরবঙ্গের দিকেই চলে যায় আমাদের চোখ। উত্তরবঙ্গে বেশ কয়েকটি দেবী চৌধুরানির মন্দির রয়েছে। জলপাইগুড়ি জেলায় শিকারপুর চা বাগানের মন্দিরটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। পাশাপাশি, গোশালা মোড়ে এবং পাতলিভাষা অঞ্চলের কালীর বাড়ি এলাকাতেও দেখা যায় দেবী চৌধুরানির মন্দির। তবে দক্ষিণবঙ্গের একটি মন্দিরের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে দেবী চৌধুরানির নাম। খানিকটা লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে গেছে সেটি। পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরে সিটি সেন্টারের অম্বুজা আবাসন এলাকায় তার অবস্থান। স্থানীয় মানুষ একে ভবানী পাঠক আর দেবী চৌধুরানির মন্দির বলেই চেনেন।

এই মন্দিরে পূজিতা হন মা কালী। জায়গাটা বেশ গা ছমছমে। লোকমুখে শোনা যায়, মন্দিরটি পাল-সেন যুগে তৈরি হয়েছিল। ভবানী পাঠক এবং তাঁর বিদ্রোহী দলের ঘাঁটি ছিল এটি। এই মন্দিরের পুজোতে দেবী চৌধুরানিও অংশ নিতেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা উপন্যাসের গুণে তাঁকে আমরা সবাই চিনি। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘দেবী’, আর ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘ডাকাত’ আখ্যা দিয়েছিল। এই মন্দিরে পুজো দিয়ে ব্রিটিশ সরকারি কর্মচারীদের সংগৃহীত খাজনা লুঠ করতে বেরোতেন ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানি। তারপর গরিবদের বিলিয়ে দিতেন সেই লুঠ করা অর্থ এবং জিনিসপত্র। দেশের সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তাঁরা। মন্দিরের প্রবেশপথে এবং মায়ের বেদিতে এখনও খোদাই করা আছে দেশপ্রেমের মন্ত্র, “জয় ভারতবর্ষম্”। পুরোনো রীতি মেনে শ্যামাপূজার আগের দিন ভূত চতুর্দশীর রাতে এখানে বাৎসরিক কালীপুজো হয়। প্রচুর ভক্তের সমাগম হয় সেদিন।
আরও পড়ুন
মঙ্গলকাব্যের স্মৃতি ঘেরা ইছাই ঘোষের দেউল
ইংরেজদের বিরুদ্ধে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানি যে বিদ্রোহ পরিচালনা করেছিলেন, তার মূল কেন্দ্র ছিল উত্তরবঙ্গ, বিশেষ করে তখনকার রংপুর, বগুরা, দিনাজপুর, কোচবিহার, ময়মনসিংহের বিস্তীর্ণ এলাকা। তাহলে দুর্গাপুরের এই মন্দিরের সঙ্গে দেবী চৌধুরানির নাম কীভাবে জড়িয়ে গেল? আসলে দেবী চৌধুরানি বা প্রফুল্লর বাপের বাড়ি ছিল বর্ধমান। স্বামীর মৃত্যু হলে প্রফুল্ল তাঁর বাপের বাড়িতেই ফিরে এসেছিলেন।

মন্দিরের পাশে একটি গোপন সুড়ঙ্গ আছে। তার খোলা মুখটি এখনও দেখা যায়। গবেষকরা বলেন, মুঘল যুগের শেষ দিকে বানানো হয়েছিল এই সুড়ঙ্গ। ইংরেজ আমলে বিদ্রোহীরা আত্মগোপনের জন্য সুড়ঙ্গটি ব্যবহার করতেন। আবার জল সরবরাহের কাজেও এই সুড়ঙ্গ ব্যবহার করা হত। মন্দিরের পেছনে একটি মজে যাওয়া সরোবর আছে। তার নাম ইছাই সরোবর। এক সময়ে এখানে টলটলে জল ছিল। এই সরোবরের মাছ দিয়ে মা কালীর ভোগ রাঁধা হত। এখন মন্দিরে কেবল নিরামিশ ভোগই দেওয়া হয়।
তথ্যঋণ – bardhaman.com, kolkata24x7