আজ বাংলা চলচ্চিত্রের প্রাণপুরুষ হীরালাল সেনের জন্মদিন
একদিকে কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের অধ্যাপক ফাদার ল্যাফো বিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্য আনিয়েছেন একটি বায়োস্কোপ। অন্যদিকে স্টিফেন্স নামে এক ইংরেজ ভদ্রলোক কলকাতার স্টার থিয়েটার মঞ্চেও বায়োস্কোপ দেখাতে শুরু করেছেন। বায়োস্কোপের আগমন সম্পর্কে কলকাতায় ছাড়া হয়েছে হ্যান্ডবিল। বলা হচ্ছে, “পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য! বায়েস্কোপ! আসুন! দেখুন! যাহা কেহ কখনও কল্পনাও করেন নাই, তাহাই সম্ভব হইয়াছে। ছবির মানুষ, জীব-জন্তু জীবন্ত প্রাণীর ন্যায় হাঁটিয়া ছুটিয়া বেড়াইতেছে…।”
অন্যান্যদের মতো বায়োস্কোপ দেখে বিস্মিত হলেন হীরালাল সেনও (Hiralal Sen)। বিশদে জানার জন্য নিজেই চলে গেলেন স্টিফেন্স সাহেবের কাছে। কিন্তু ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে হীরালালের সামনে মুখ খুললেন না সাহেব। তাতে অবশ্য দমে গেলেন না হীরালাল। বিদেশ থেকে বায়েস্কোপের যন্ত্রপাতি জোগাড় করে এনে তা দেখাতে শুরু করে দিলেন। এবং কালক্রমে হয়ে উঠলেন বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রাণপুরুষ (Father of Indian Cinema)।

সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ফার্সি ভাষাও শিখেছিলেন হীরালাল। তাঁর সৃষ্টিশীল কর্মজীবন কবে থেকে শুরু হয়েছিল, তা কোনো গবেষণায় তেমন জানা যায় না। ১৯০১ আর ১৯০৪-এর মধ্যে ক্লাসিক থিয়েটারের পক্ষে তিনি অনেকগুলি ছবি নির্মাণ করেন, ‘ভ্রমর’, ‘হরিরাজ’, ‘বুদ্ধদেব’ ইত্যাদি। তাঁর কর্মকাণ্ড ব্যাপ্ত ছিল ১৯১৩ সাল অবধি। এই সময়ের মধ্যে চল্লিশটিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন হীরালাল। বেশিরভাগ ছবিতেই ফ্রেমবন্দি করেন অমরেন্দ্রনাথ দত্তের কলকাতা ক্লাসিক থিয়েটারে মঞ্চস্থ বিভিন্ন দৃশ্য। সেই যুগে ব্যবহারযোগ্য ফিল্ম আনা হত বিদেশ থেকে। ১৯০৩-এ তৈরি করেন ‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’ (Alibaba and the Forty Thieves), যার ভিত ছিল ক্লাসিক থিয়েটারে অভিনীত ওই নামেরই একটি নাটক। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপন ও সংবাদমূলক চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন হীরালাল। ভারতীয়দের মধ্যে বিজ্ঞাপনে ফিল্ম ব্যবহার করায় তিনিই ছিলেন প্রথম। হীরালালের তৈরি তথ্যচিত্র ‘Anti-Partition Demonstration and Swadeshi movement at the Town Hall, Calcutta on 22nd September 1905’ ভারতের প্রথম রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হিসাবে গণ্য হয়। পাশাপাশি ‘জবাকুসুম হেয়ার অয়েল’ এবং ‘এডওয়ার্ডস টনিক’-এর ওপর বিজ্ঞাপনী ছবি বানিয়েছিলেন। ভারতীয়দের মধ্যে তিনিই প্রথম বিজ্ঞাপনের ছবি বানিয়েছিলেন।
তবে হীরালাল সেনকে নিয়ে আজ পর্যন্ত তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য কাজ হয়নি। অথচ ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রসঙ্গ এলেই হীরালাল সেনের নাম আসবে সবার প্রথমে। সত্যিই কি সবার প্রথমে তাঁর নাম আসে? না। ভারতীয় তথা বাংলা চলচ্চিত্রের ‘গডফাদার’ মানা হয় দাদাসাহেব ফালকে-কে। খানিকটা হলেও আড়ালে থেকে যান হীরালাল। অ্যাকাডেমিক স্তরেও খুব বেশি সিলেবাসভিত্তিক আলোচনা তাঁকে নিয়ে হয় না।

এহেন সিনে-নক্ষত্রের জীবনকাহিনি বাংলায় প্রথম সেলুলয়েডে বন্দি করছেন ‘এগারো’ খ্যাত পরিচালক অরুণ রায়। তাঁর কথায় এটি “তথ্যচিত্র নয়, বায়োপিক”। এর আগে ‘এগারো’ ছাড়াও ‘চোলাই’ নামের ছবি বানিয়েছেন অরুণবাবু। ‘এগারো’ মুক্তি পেলেও ‘চোলাই’ ছবিটি “রাজনৈতিক কারণে” মুক্তি পায়নি। ‘হীরালাল’ অরুণ সেনের তৃতীয় ছবি। কিন্তু ছবির বিষয় হিসেবে কেন হীরালাল সেন-কেই বেছে নিলেন তিনি? পরিচালক জানাচ্ছেন, “আমরা বাঙালিরা কীভাবে হীরালাল সেনকে পুরোপুরি ভুলে গেলাম, তার কোনও উত্তর আমার কাছে নেই। বলতে পারেন, সেই উত্তর খুঁজতেই ছবিটি বানানো। পাশাপাশি বাঙালিদের মনে করিয়ে দেওয়া, দাদাসাহেব ফালকে নন, ভারতের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা একজন বাঙালি। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সমস্ত তথ্য এই ছবিতে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।”
অনেক অজানা তথ্য পরিবেশিত হবে এই ছবিতে। তৎকালীন কলকাতার সেট বানিয়ে নির্মিত হয়েছে ছবি। শুটিং হয়েছে কলকাতার লাহাবাড়ি, বেলগাছিয়া রাজবাড়ি, টিটাগড় জুটমিল, মুর্শিদাবাদ-সহ বেশ কিছু জায়গায়।
ছবিতে হীরালালের চরিত্রে অর্থাৎ প্রধান ভূমিকায় দেখা যাবে তরুণ অভিনেতা কিঞ্জল নন্দ-কে। শুনতে একটু অবাক লাগলেও পেশা হিসাবে ডাক্তারি এবং অভিনয় দুটোকেই বেছে নিয়েছেন কিঞ্জল। তিনি মনে করেন, দুটোই আসলে শিল্পের এপিঠ ওপিঠ। মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করে যাওয়াই আসলে পেশাদারিত্বের পরিচয়। বর্তমানে নিযুক্ত রয়েছেন টাটা মেডিক্যাল সেন্টারে। পাশাপাশি প্রায় ১৫ বছর ধরে থিয়েটার করে চলেছেন। এটিই কিঞ্জলের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি। বঙ্গদর্শনকে তিনি জানিয়েছেন, “এখানে হীরালালের শৈশব থেকে একেবারে শেষ বয়স অবধি জার্নিটা দেখানো হয়েছে। উনি বিজ্ঞাপন বা তথ্যচিত্র যেগুলি প্রথম বানিয়েছিলেন, সেগুলিকেই এক্সপ্লোর করা হয়েছে। প্রায় দুশো ছবি বানিয়েছিলেন হীরালালবাবু। সবই পুড়ে যায়। মানে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এসবই আমাদের ছবিতে উঠে এসেছে। দাদাসাহেব ফালকে হীরালালের ঠিক কতদিন পর এসেছিলেন সেগুলিও উঠে এসেছে।”
দেখুন ‘হীরালাল’ ছবির ট্রেলার
রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি একটি ছবি বানায় ১৯১৩ সালে। এরপর ভয়ঙ্কর দুর্গতি এবং অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হন হীরালাল। এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ কোম্পানির জামশেদজি ফ্রেমজি ম্যাডান তাঁকে অনেকটা পেছনে ফেলে এগিয়ে যান। কিছু বছর পরেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হন হীরালাল। এবং মৃত্যুর কিছুদিন আগে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তাঁর তৈরি সমস্ত ছবি নষ্ট হয়ে যায়। ভারতীয় চলচ্চিত্রের দর্শক অরুণ রায়ের ‘হীরালাল’ ছবিকে তাই সাদরে গ্রহণ করে।

হীরালাল সেনের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কিংবদন্তিরা, যেমন গিরিশ ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অমরেন্দ্রনাথ দত্তরা থেকেছেন এ ছবিতে। গিরিশ ঘোষের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন খরাজ মুখোপাধ্যায়। এছাড়াও দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছেন শংকর চক্রবর্তী এবং শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়। রয়েছেন থিয়েটার-এর বেশ কয়েকজন অভিনেতা, যেমন তন্বিষ্ঠা বিশ্বাস, অর্ণ মুখোপাধ্যায়, অনুষ্কা চক্রবর্তী প্রমুখ। ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন ময়ূখ-মৈনাক, শিল্প নির্দেশক তপন শেঠ, চিত্রগ্রহণে গোপী ভগৎ। চিত্রনাট্য লিখেছেন পরিচালক স্বয়ং।
আরও পড়ুন: বাংলা চলচ্চিত্রের প্রাণপুরুষ হীরালাল সেন
ছবিটি প্রথম প্রদর্শিত হয় ২০১৮ সালে আয়োজিত ২৪তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ কম্পিটিশন সেকশন-এ। কিন্তু তারপরও ছবি মুক্তি পেতে এতদিন সময় লেগেছিল কেন? পরিচালক জানিয়েছেন, “স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনেক ঝুঁকি থাকে। ঝুঁকি নিয়েই এই ছবিটি বানানো। সিনেমাহলে রিলিজ করার তাড়া সেই অর্থে ছিল না। তাই সমস্ত জটিলতা কাটার পর মুক্তি পেতে সময় এগিয়ে যায়। মানুষ ছবিটা দেখতে পাচ্ছেন এটা ভেবেই ভালো লাগছে।” আজ হীরালাল সেনের ১৫৬ তম জন্মদিন। গত বছর অর্থাৎ জন্মের ১৫৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর হীরালালকে নিয়ে তৈরি সিনেমা দর্শকমহলে নতুন করে জায়গা করে নেয়।
