সেলিম, নাসিমদের সংগৃহীত শোলায় ডাকের সাজ করেন মালাকাররা, দুর্গাপুজোর নেপথ্যে ঐক্যের গল্প

কৃত্রিম প্লাস্টিক বা ফাইবারের সাজের ভিড়ে কি হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন শোলার সাজ?

উত্তর কলকাতার সাবেকি সাজের দুর্গা 

দুর্গা প্রতিমার মাথায় উঠবে শোলার মুকুট। তাই সাপখোপ ছিনেজোঁকের ভয় না করে এক বুক জলে নেমে শোলা সংগ্রহের কাজ করে চলেন আবদুল মজিদ, শেখ জুবেদ, নুর আমিনরা। আর সেই শোলার ওপরে দক্ষ হাতে কারুকাজ করেন আরতি মালাকার, গৌরব মালাকাররা। কী অপূর্ব এ মেলবন্ধন! উৎসবের রোশনাই অথবা জীবিকার তাগিদ, অচিরেই মিলিয়ে দিচ্ছে হিন্দু-মুসলিম দুটি ভিন্ন ধর্মের মানুষদের।

শোলা শিল্প (Shola Shilpo) বাংলার বহু প্রাচীন একটি শিল্প মাধ্যম। যতদূর জানা যায়, প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো এই শিল্প। মূলত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এই শিল্প সৃষ্টির ইতিহাস। এই শোলা শিল্পকে কেন্দ্র করে বাংলার দুটি জেলা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। জড়িয়ে রয়েছে দুই ভিন্ন ধর্মের মানুষ। একদিকে কাঁচামালের জোগান দিচ্ছেন পূর্ব মেদিনীপুর (Purba Medinipur) জেলার মুসলিম কর্মীরা, অন্যদিকে শোলা কেটে বাহারি সাজ বানাচ্ছেন বনকাপাসির হিন্দু শিল্পীরা।

কথিত আছে, শিব-পার্বতী যখন মাথায় সাদা মুকুট পরার ইচ্ছে প্রকাশ করেন তখন তাঁদের ইচ্ছাপূরণের জন্য জলাশয়ে জন্ম নেয় শোলা নামের এক ধরনের উদ্ভিদ। মাথার মুকুট তো আর ভারী সাদা পাথরের হতে পারে না, তাই অত্যন্ত হালকা এই শোলা গাছের কাঠ থেকেই মুকুট, চাঁদমালা এবং অন্যান্য সাজসজ্জা, গয়নাগাটি তৈরি হওয়ার রেওয়াজ ছিল।

বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানান অনুষঙ্গে এসেছে বদল। ছোটো ছোটো দোকানের জায়গা নিয়েছে বড়ো শপিং মল। সাবেকি ঘরানার মণ্ডপ বদলে এখন থিম পুজোর চল। তবুও হাত পা গুটিয়ে বসে নেই শিল্পীরা। শোলাশিল্পী গৌরব মালাকার বঙ্গদর্শনকে জানান, “গত দু’বছরের তুলনায় এবছরের বাজার অনেকটাই আলোর মুখ দেখেছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে শোলা-কাঠি হাতে পেয়েছি আমরা। গতবছর অর্ডার না আসায় অনেক মাল বেঁচে গিয়েছিল। সেগুলোকেও কাজে লাগানো হচ্ছে নতুন করে।”

অন্যদিকে পূর্ব মেদিনীপুরের কর্মী মহলেও প্রস্তুতি তুঙ্গে। “কয়েক বছর আগেও ডাকের সাজ বলতে মানুষ শোলার সাজের সাবেকিয়ানাকেই বুঝতো, যা এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবুও যেটুকু কাজের বরাত জুটছে আমরা জান লড়িয়ে দিচ্ছি”, বললেন পূর্ব মেদিনীপুরের শেখ নাসিম। তিন পুরুষ ধরে তাঁরা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। ছোটো থেকে বাবা কাকাদের দেখেছেন ইদ, মহরমের চেয়ে দুর্গাপুজো নিয়ে বেশি তৎপর থাকতে। প্রজন্মের হাত ঘুরে সেই দায়িত্ব এখন নাসিমদের কাঁধে।

কথিত আছে, শিব-পার্বতী যখন মাথায় সাদা মুকুট পরার ইচ্ছে প্রকাশ করেন তখন তাঁদের ইচ্ছাপূরণের জন্য জলাশয়ে জন্ম নেয় শোলা নামের এক ধরনের উদ্ভিদ। মাথার মুকুট তো আর ভারী সাদা পাথরের হতে পারে না, তাই অত্যন্ত হালকা এই শোলা গাছের কাঠ থেকেই মুকুট, চাঁদমালা এবং অন্যান্য সাজসজ্জা, গয়নাগাটি তৈরি হওয়ার রেওয়াজ ছিল। হালকা নরম কাঠের মতো শোলার ওপরে এই সূক্ষ্ম কাজে মালাকাররা অত্যন্ত দক্ষ বহুযুগ ধরে। পাশাপাশি পূর্ব মেদিনীপুরের ভোগপুর এবং নন্দাইগাজনের গ্রামগুলির বহু মুসলিম পরিবারেরও রুজি রোজগারের ব্যবস্থা করে আসছে এই শোলা শিল্প।

প্রয়াত শোলা শিল্পী মধুমঙ্গল মালাকারের নির্মিত শোলার দুর্গা মূর্তি 

রাজ্য জুড়ে যখন ডেঙ্গু সতর্কতা, ঠিক তখন পূর্ব মেদিনীপুরের ভোগপুর গ্রামের শেখ আবদুল মজিদ, শেখ জুবেদ, নুর আমিন, শেখ সুকুরুদ্দি, সামসুর আলম, শেখ রফিক, শেখ সেলিম সহ বহু শিল্পীরা জীবনের বাজি রেখে পুকুরে বা ডোবায় একবুক জলে নেমে শোলা সংগ্রহ করে আনছেন। দুর্গাপুজো নিয়ে তথাকথিত ধর্মের ধ্বজা ধরার অবকাশ কি মিলছে এখানে? ওই অঞ্চলের শোলা সংগ্রহকারীরা জানাচ্ছেন, এই কাজের জন্য তাঁদের যেতে হয় পটাশপুর, সবং, ভগবানপুর, পিংলা, নারায়ণগড়, দাঁতন, এগরা, কাঁথি, খেজুরি বা ময়নাতে। কেউ কেউ আবার ওড়িশাতে গিয়েও শোলা সংগ্রহ করে আনেন। বর্ষার শেষদিকে, মূলত, ভাদ্র থেকে আশ্বিন মাসের শেষ পর্যন্ত চলতে থাকে শোলা সংগ্রহের কাজ। তারপর তাকে মাপ করে কেটে বান্ডিল বানিয়ে শুকিয়ে রাখতে হয়। কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে সেই শুকনো শোলা কেনেন মালাকার শিল্পীরা।

মুসলিম সংগ্রহকারীদের মধ্যে অনেকেরই আক্ষেপ, আগের মতো এখন আর ভালো শোলা মেলে না। এখন জলাভূমিগুলি পরিষ্কার করে কোথাও মাছচাষ হচ্ছে, কোথাও বা পদ্মচাষ হচ্ছে। তাছাড়া এত বেশি কীটনাশক ও নানা ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে যে আগের মতো শোলা গাছ জন্মাচ্ছে না। পাশাপাশি বর্তমান সময়ে পুকুর বুজিয়ে হাইরাইজ তৈরির মাত্রাও অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। সামগ্রিকভাবে হারাতে বসেছে বাংলার লোক ঐতিহ্য।

তাই পুঁজিহীন, বিপণনের সুযোগহীন এই বাজারে তাঁদের ব্যবসার হাল ভালো নয়। শোলাশিল্পী আরতি মালাকার জানান, “বর্তমান বাজারে শোলার ব্যবসায় আমাদের লাভ খুবই সামান্য। আসলে শোলার বদলে এখন প্লাস্টিক, ফাইবার এবং নানা অন্য জিনিসের সামগ্রী বাজারে চলে এসেছে। তাই উপযুক্ত সরকারি সহায়তা না পেলে হয়তো শীঘ্রই হারিয়ে যাবে বাংলার শোলাশিল্প।”

তবুও শেষ চেষ্টাটুকু ছাড়তে নারাজ সকলেই। পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো আঁকড়ে ধরেছেন হাতে পাওয়া কাজগুলিকে। শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে। অসাধারণ দক্ষতায় সাজিয়ে তুলছেন তাঁরা প্রতিমাকে। কিন্তু মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমার কারুকাজ দেখে যাঁরা প্রশংসা করবেন তাঁরা কি আদেও জানতে পারবেন শোলা সংগ্রহ আর শোলার কারুকাজ করে পেটের চাহিদা মিটছে না এঁদের কারুরই? হিন্দু-মুসলিম, অভাবের নিরিখে এঁরা সবাই সমান।

বাগবাজার সার্বজনীন

বর্তমানে কৃত্রিম প্লাস্টিক বা ফাইবারের সাজের ভিড়ে শোলার সাজের প্রাধান্য কমেছে ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে যায়নি। হারাতে দেয়নি বাঙালিই। বাগবাজার সার্বজনীন, একডালিয়া এভারগ্রিন, সিংহী পার্ক, কলেজ স্কোয়ার, সিমলা স্পোর্টিং ক্লাবের মতো ঐতিহ্যবাহী পুজো কমিটিগুলো এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে বাংলার সাবেকিয়ানা। পাশাপাশি সারা বাংলার বনেদি বাড়ির পুজোগুলিতেও দেখা যায় ডাকের সাজের আভিজাত্য। তাই প্রতিযোগিতার বাজারে ভবিষ্যৎ নিয়ে খানিক অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও সময়ের স্রোতে শোলার মতো করে দিব্যি ভেসে চলেছেন মুসলিম সংগ্রাহক এবং হিন্দু শিল্পীরা। তাই যান্ত্রিকতার ভিড়ে হাঁপিয়ে উঠতে উঠতে যখন কোনো মণ্ডপে ডাকের সাজের প্রতিমা দেখতে পাওয়া যায়, থমকে দাঁড়াতে হয় দর্শকদের। নিমেষে একটা অন্যরকম ভালোলাগা ঘিরে ধরে। শোলার সাজের শুভ্রতা নাকি বাঙালির শিকড়ের টান; কীসের মোহে এ মুগ্ধতা? হিসেব কষা হয় না আর। কেবল ভালোলাগার এই রেশটুকু জিইয়ে রাখতে তড়িঘড়ি মুঠোফোনের একটা ক্লিকেই বন্দি হন সাবেকি সাজের দেবী দুর্গা।

প্রতিমার ছবি সৌজন্যে – অরুণ পাল

Developed by DXDasia