ছুটি কাটান বাংলার ঐতিহ্যবাহী সব রাজবাড়িতে

ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে ‘হেরিটেজ হোটেল’

ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি

কলকাতার আরেক নাম ‘প্রাসাদের শহর’। এই ডাকনাম যথার্থ। তা বলে সারা বাংলায় ছড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক প্রাসাদগুলো ভুললে চলবে না। পশ্চিমবঙ্গকেই বলা যেতে পারে ‘প্রাসাদের রাজ্য’। যদিও কলকাতার অনেকেই খোঁজখবর রাখেন না। জেলায় জেলায় বেশ কিছু পুরোনো অট্টালিকায় এখন চালু হয়েছে হেরিটেজ হোটেল এবং রিসর্ট। উইকএন্ডে গিয়ে চুটিয়ে ছুটি উপভোগ করা যায়।  পশ্চিমবঙ্গে ‘রাজবাড়ি হোটেল’-এর আকর্ষণ ক্রমেই বাড়ছে পর্যটকদের কাছে। 

সবার আগেই বলা যেতে পারে ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির কথা। মল্ল রাজাদের বাসস্থান। কলকাতা থেকে দূরত্ব মোটামুটি ১৬০ কিলোমিটার। প্রাসাদের একটি অংশে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের উদ্যোগে হেরিটেজ হোটেল তৈরি হয়েছে — ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি ট্যুরিজম প্রোজেক্ট। ঝাড়গ্রাম স্টেশন থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে এই রাজবাড়িতে আজও মল্ল রাজাদের বংশধরেরা থাকেন। তবে অনুমতি নিয়ে কিছু অংশ ঘুরে দেখায় যায়। প্রধান ভবনটি গড়ে তোলা হয় ইতালীয় স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করে৷  সঙ্গে সাজানো-গোছানো লন এবং বাগান। কত ইতিহাস লুকিয়ে আছে রাজবাড়ির আনাচে কানাচে। ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’-এর মতো বেশ কিছু বিখ্যাত সিনেমার শুটিং হয়েছে এখানে।  

আমাদপুর রাজবাড়ি 

পূর্ব বর্ধমানের আমাদপুরে রয়েছে প্রায় ৩৭৫ বছরের পুরোনো হেরিটেজ সম্পত্তি। কলকাতা থেকে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে পৌঁছনো যায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে। দূরত্ব ৯০ কিলোমিটারের মতো। সবচেয়ে কাছের রেলস্টেশন মেমারি প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে। আমাদপুর কিন্তু মেমারির মতো ব্যস্ত শহর নয়। বরং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর নিরিবিলি এক গ্রাম। 

আমাদপুর প্রাসাদের মালিক চৌধুরী পরিবার। তাঁদের পূর্বপুরুষেরা থাকতেন মালদা এবং মুর্শিদাবাদে। ১৭ শতকের মাঝামাঝি মুঘলদের থেকে কৃষ্ণরাম সেনশর্মা লাভ করেন বর্ধমান এবং হুগলির বিস্তীর্ণ এলাকার জমিদারি। ‘চৌধুরী’ উপাধি নিয়ে জমিদারের দায়িত্ব পালন শুরু করেন আমাদপুরে।

তাঁদের প্রাসাদ ইতিমধ্যে সংস্কার করা হয়েছে। উঁচু ছাদ, জমকালো বারান্দা এবং প্রাচীন আসবাব মনে করিয়ে দেয় ফেলে আসা যুগকে। সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের বন্দোবস্ত রয়েছে।

বড়ি কোঠি হেরিটেজ হোটেল

কলকাতা থেকে সড়কপথে ৬ ঘণ্টার মধ্যে চলে যেতে পারেন মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জে, বড়ি কোঠি হেরিটেজ হোটেলে। ভাগীরথী নদীর পাশে দুধোরিয়া রাজ পরিবারের বিশাল প্রাসাদ। ১৮ শতকের শেষে গ্রিক, রোমান, ফরাসি রীতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল। হেরিটেজ সুইট, রয়্যাল হেরিটেজ সুইট, মহারাজা হেরিটেজ সুইটে পর্যটকদের জন্য বিলাসবহুল থাকার ব্যবস্থা৷  ‘শেহেরওয়ালি ঐতিহ্য’ বা মুর্শিদাবাদের জৈন পরম্পরার স্বাদ পাবেন এখানে।

মহিষাদল রাজবাড়ি

সড়কপথে কলকাতা থেকে মাত্র ৩ ঘণ্টার মধ্যে মহিষাদল রাজবাড়ি যাওয়া যায়। দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারের মতো। আসলে মহিষাদলে একাধিক রাজবাড়ি রয়েছে। একটির নাম ‘ফুল বাগ’।  যেটি এখন হোটেল। মহিষাদলের জমিদার পরিবারের ইতিহাস জানতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে সম্রাট আকবরের যুগে। কল্যাণ রায়চৌধুরী প্রথম ‘রাজা’ উপাধি নিয়ে মহিষাদল এবং চারপাশের এলাকা শাসন করতে থাকেন। ১৬ শতকের মাঝামাঝি সময়ে খাজনা না দিতে পারার অভিযোগে চৌধুরী পরিবারের হাত থেকে জমিদারি চলে যায়। নতুন জমিদার হন জনার্দন উপাধ্যায়৷ তিনি ছিলেন মুঘল রাজসভার উচ্চপদস্থ কর্মচারী৷ উত্তর প্রদেশ থেকে আসেন বাংলায়। 

অনেক পরে উপাধ্যায় বংশের কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকায় জমিদারি চলে যায় গর্গ পরিবারের হাতে। ফুল বাগ প্রাসাদ গড়ে ওঠে ১৯২৬ সালে। ঘরে ঘরে ছড়িয়ে আছে রাজকীয় জীবনযাত্রার চিহ্ন৷ বেশি সংখ্যক পর্যটকের জন্য থাকার ব্যবস্থা নেই৷ দু’টি ঘরে ৮ জন থাকতে পারেন। তবে কয়েকদিন কাটালে জমকালো অভিজ্ঞতা হবে, কোনোদিন তা ভোলার নয়।

বাওয়ালি রাজবাড়ি 

দক্ষিণ ২৪ পরগনার ছোট্ট গ্রাম বাওয়ালি। কলকাতা থেকে দু’ঘণ্টায় পৌঁছনো যায়৷ মণ্ডল বংশের জমিদারেররা এখানে শাসন করতেন। আজ সেই পরিবারের কেউ প্রাসাদে থাকেন না। বাওয়ালি রাজবাড়িতে কলকাতার ব্যবসায়ী অজয় রাওলা গড়ে তুলেছেন হেরিটেজ রিসর্ট৷ থাকা-খাওয়ার আধুনিক বিলাসবহুল বন্দোবস্ত। বিশাল অট্টালিকা এবং উন্মুক্ত লন দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়।

ইটাচুনা রাজবাড়ি 

ইটাচুনা রাজবাড়িও কলকাতার খুব কাছে। আড়াই ঘণ্টায় পৌঁছনো যায়। হুগলি জেলায় চুঁচুড়া মহকুমায় এই জায়গাটি ‘বর্গিডাঙা’ নামেও পরিচিত। ১৭৬৬ সালে কুন্দন পরিবার তৈরি করে প্রাসাদ। তাঁরা আদতে মহারাষ্ট্রের লোক। নবাবি আমলে বাংলা আক্রমণ করেন মারাঠা বর্গিরা। তাঁদের মধ্যেই কুন্দনরা ছিলেন৷ পরে কুণ্ডু পদবি গ্রহণ করেন।

সম্প্রতি বাংলা ও হিন্দি সিনেমার শুটিং স্পট হিসেবে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে ইটাচুনা রাজবাড়ি৷ ‘লুটেরা’, ‘পরান যায় জ্বলিয়া রে’, ‘রাজমহল’ প্রভৃতি ছবিতে দেখা গিয়েছে এই প্রাসাদ। লাল-হলুদ অট্টালিকা আর চারপাশের মাটির কুটির — সব নিয়ে এক মন ভালো করা পরিবেশ। ২০০ বছরের পুরোনো ভবনে রয়েছে ৫টি উঠোন। প্রাচীন বাক্সপেটরা, অলংকৃত কাঠের সাজসজ্জা, পুরোনো জিনিসপত্র আপনাকে দেবে নস্টালজিয়ার ছোঁয়া। ঘরগুলোর নাম রাখা হয়েছে আটপৌরে বাঙালি পরিচয়ে — বড়ো বৌদি, ছোটো বৌদি, ঠাকুমা, বড়ো পিসি, কাকাবাবু, জ্যাঠামশাই।

এইসব গন্তব্য এবং তাদের প্রধান আকর্ষণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করুন — 
West Bengal Tourism Development Corporation Ltd
DG Block, Sector-II, Salt Lake
Kolkata 700091
Phone: (033) 2358 5189, Fax: 2359 8292
Email: visitwestbengal@yahoo.co.in, mdwbtdc@gmail.com, dgmrwbtdc@gmail.com
 

Developed by DXDasia